IPL 2026

১৩ বলে অর্ধশতরান! রেকর্ডের হ্যাটট্রিক গড়ে চেন্নাইকে জেতালেন স্কুলশিক্ষকের সন্তান উর্বিল, আবার হার লখনউয়ের

বৈভব সূর্যবংশী, আয়ুষ মাত্রেদের মাঝে আরও এক নতুন তারকার জন্ম দেখল আইপিএলে। রেকর্ডের হ্যাটট্রিক গড়ে চেন্নাই সুপার কিংসকে জেতালেন উর্বিল পটেল।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১০ মে ২০২৬ ১৯:৪২
cricket

অর্ধশতরানের পর চিরকুট বার করে দেখাচ্ছেন উর্বিল পটেল। ছবি: পিটিআই।

সঞ্জু স্যামসন আউট হওয়ার পর হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিল লখনউ সুপার জায়ান্টস। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, পরের কয়েকটি ওভারে কী হতে চলেছে। চিপকে উঠল উর্বিল পটেল নামের এক ঝড়। সেই ঝড়ে তছনছ হয়ে গেল লখনউয়ের জয়ের স্বপ্ন। তাঁর ২৩ বলে ৬৫ রানের ইনিংস জিতিয়ে দিল চেন্নাইকে। রেকর্ডের হ্যাটট্রিক গড়লেন তিনি। লখনউকে ৫ উইকেটে হারিয়ে পয়েন্ট তালিকায় পাঁচ নম্বরে উঠল চেন্নাই। প্লে-অফের লড়াইয়ে ভাল ভাবে রয়েছে তারা। সকলের শেষেই থাকল লখনউ।

Advertisement

মাত্র ১৩ বলে অর্ধশতরান করলেন উর্বিল। আইপিএলের ইতিহাসে তা যুগ্মভাবে দ্রুততম। এর আগে ২০২৩ সালে কলকাতা নাইট রাইডার্সের বিরুদ্ধে ইডেনে ১৩ বলে অর্ধশতরান করেছিলেন রাজস্থান রয়্যালের যশস্বী জয়সওয়াল। সেই রেকর্ড ছুঁলেন উর্বিল।

যে ভাবে উর্বিল শুরু করেছিলেন, তাতে আরও আগে অর্ধশতরান হতে পারত তাঁর। আবেশ খানকে পর পর তিনটি ছক্কা মারেন। পরের ওভারে দিগ্বেশ রাঠীকে আবার তিনটি ছক্কা মারেন তিনি। উর্বিলই আইপিএলের ইতিহাসে একমাত্র ব্যাটার যিনি ইনিংসের প্রথম আট বলের মধ্যে ছ’টি ছক্কা মেরেছেন। মাত্র ৮ বলে ৪১ রান করেন উর্বিল। পরের ৯ রান করতে পাঁচ বল নিয়েছেন তিনি।

১০ বলে উর্বিলের রান ছিল ৪২। সেটিও রেকর্ড। আইপিএলের এর আগে ২০১৫ সালে প্রথম ১০ বলে ৪১ রান করেছিলেন রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর এবি ডিভিলিয়ার্সের। ১৩ বলে অর্ধশতরানের ইনিংসেও যশস্বী ১০ বলে ৪১ রান করেছিলেন। তাঁদের ছাপিয়ে গেলেন উর্বিল।

অর্ধশতরানের পর পকেট থেকে একটি চিরকুট বার করেন উর্বিল। তাতে লেখা, ‘বাবা, এটা তোমার জন্য।’ পেশায় স্কুলশিক্ষক মুকেশ পটেলের স্বপ্ন ছিল ক্রিকেটার হবেন। হতে পারেননি। স্কুল শারীরবিদ্যার শিক্ষক ছিলেন। ছোট থেকেই উর্বিলের খেলার দিকে তাঁর নজর ছিল। ছেলের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন মুকেশ। সেই কারণেই আইপিএলে রেকর্ড গড়ে সেই বাবাকেই তা উৎসর্গ করলেন উর্বিল।

গুজরাতের পালানপুরে জন্ম নেওয়া উর্বিল ছোট থেকেই বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে নজর কাড়তে শুরু করেন। এই শহর বিখ্যাত হিরের জন্য। সেখান থেকে ভারতীয় ক্রিকেটে এক নতুন হিরে উঠে এল। উর্বিলের ঘরোয়া ক্রিকেট শুরু বরোদার হয়ে। ২০১৬-১৭ সালে আঞ্চলিক টি-টোয়েন্টি লিগ খেলে শুরু তাঁর। ২০১৭-১৮ সালে বরোদার হয়েই বিজয় হজারে ট্রফি খেলেন তিনি।

২০১৮-১৯ মরসুমে বরোদা থেকে গুজরাতে চলে যান উর্বিল। ২০২৪ সালে গুজরাতের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় তাঁর। অবশ্য তার আগের বছর ২০২৩ সালে লিস্ট এ ক্রিকেটে ভারতীয় ব্যাটারদের মধ্যে দ্রুততম শতরান করেন তিনি। মাত্র ৪১ বলে ১০০ করেছিলেন এই ডানহাতি ব্যাটার।

২০২৪ সালে সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে ত্রিপুরার বিরুদ্ধে মাত্র ২৮ বলে শতরান করেন উর্বিল। ভারতের ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এটি দ্রুততম শতরান। সেই বছরই উত্তরাখণ্ডের বিরুদ্ধে ৩৬ বলে শতরান করেন তিনি। পরের বছর মুস্তাক আলিতে সার্ভিসেসের বিরুদ্ধে ৩১ বলে শতরান করেছেন তিনি। উর্বিলই একমাত্র ব্যাটার, ঘরোয়া টি-টোয়েন্টিতে যিনি তিন বার ৪০-এর কম বলে শতরান করেছেন।

ঘরোয়া ক্রিকেটে উর্বিলের এই পরিসংখ্যান বুঝিয়ে দিয়েছে, রবিবারের ইনিংস কাকতালীয় নয়। আইপিএলে এর আগে বড় ইনিংস তেমন খেলতে পারেননি উর্বিল। ফলে তাঁর আগে আয়ুষ সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু আয়ুষ চোট পাওয়ার পর দলে ঢুকে তা কাজে লাগালেন উর্বিল। পেশায় স্কুলশিক্ষকের সন্তানের লক্ষ্য, ভারতের টি-টোয়েন্টি দলে সুযোগ। সেই স্বপ্নের পথে তাঁকে কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল এই ইনিংস।

২৮ বলে ৬৫ রান করে আউট হন উর্বিল। নইলে হয়তো আরও একটি শতরান দেখা যেত তাঁর ব্যাট থেকে। তবে তাতে ম্যাচ জিততে সমস্যা হয়নি চেন্নাইয়ের। উর্বিলের পাশাপাশি জয়ের কৃতিত্ব প্রাপ্য দলের দুই ওপেনার সঞ্জু ও রতুরাজ গায়কোয়াড়ের। ২০৪ রান তাড়া করতে নেমে দ্রুতগতিতে রান তোলা শুরু করেন তাঁরা। ১৪ বলে ২৮ রান করে আউট হন সঞ্জু। উর্বিলের ঝোড়ো ব্যাটিংয়ের সময় রুতুরাজের ইনিংসের দিকে কারও নজর পড়েনি। তিনিও অর্ধশতরানের দিকে এগোচ্ছিলেন। কিন্তু ২৮ বলে ৪২ রান করে শাহবাজ় আহমেদের বলে আউট হন তিনি। রান পাননি ডেওয়াল্ড ব্রেভিস।

তার পরেও জিততে সমস্যা হয়নি চেন্নাইয়ের। কারণ, তত ক্ষণে জয়ের জন্য ২৪ বলে দরকার ৩৫ রান। শেষ কয়েকটি ওভারে অনেক চেষ্টা করে লখনউ। কিন্তু লক্ষ্য বেশি না থাকায় সমস্যা হয়নি চেন্নাইয়ের। প্রশান্ত বীর ও শিবম দুবে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন। চার বল বাকি থাকতে ৫ উইকেটে জেতে চেন্নাই।

এর আগে প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ২০৩ রান করে লখনউ। এই ম্যাচে আবার জশ ইংলিসকে ফিরিয়ে আনা হয় লখনউয়ের প্রথম একাদশে। সেই সিদ্ধান্ত কাজে লাগে। মিচেল মার্শের সঙ্গে ওপেন করতে নামেন তিনি। আগের ম্যাচে শতরান করা মার্শ এই ম্যাচে ১০ রানে আউট হন। তিন নম্বরে নেমে রান পাননি নিকোলাস পুরান। ১ রান করেন তিনি। পুরানের দুঃস্বপ্নের মরসুম শেষই হচ্ছে না।

‌অপর প্রান্তে উইকেট পড়লেও এক দিকে বিধ্বংসী ইনিংস খেলছিলেন ইংলিস। দলের সিংহভাগ রান আসছিল তাঁর ব্যাট থেকে। মাত্র ১৭ বলে ৫০ রান করেন তিনি। পাওয়ার প্লে শেষে ৯১ রান করে লখনউ। আইপিএলের ইতিহাসে এটি পাওয়ার প্লে-তে তাদের সর্বাধিক রান। তার মধ্যে ৭৭ রানই আসে ইংলিসের ব্যাট থেকে। ভাল দেখাচ্ছিল তাঁকে। দেখে মনে হচ্ছিল শতরান করবেন।

দশম ওভারে লখনউকে জোড়া ধাক্কা দেন জেমি ওভারটন। ৩৩ বলে ৮৫ রান করে আউট হন ইংলিস। ১০টি চার ও ছ’টি ছক্কা মারেন তিনি। সেই ওভারেই ঋষভ পন্থকে বোল্ড করেন ওভারটন। ১২ বলে ১৫ রান করেন পন্থ। তাঁরও এই মরসুমে ব্যাটে রান আসছে না। আরও একটি ম্যাচে হতাশ করলেন লখনউয়ের অধিনায়ক।

রান পাননি এডেন মার্করাম (৬)। বাউন্ডারি থেকে ডেওয়াল্ড ব্রেভিসের সরাসরি থ্রোয়ে রান আউট হয়ে ফেরেন তিনি। একটা সময় দেখে মনে হচ্ছিল, ১৮০ রান করতেও সমস্যা হবে লখনউয়ের। সেখান থেকে দলকে টানলেন শাহবাজ়। এই মরসুমে বেশি সুযোগ পাননি। কিন্তু বাংলার অলরাউন্ডার দেখিয়ে দিলেন, তাঁকে না খেলিয়ে ভুল করেছে লখনউ।

হিম্মত সিংহের সঙ্গে ৩২ বলে ৫০ রানের জুটি গড়লেন। শেষ বলে ছক্কা মেরে দলের রান ২০০ পার করালেন। ২৫ বলে ৪৩ রানে অপরাজিত শাহবাজ়। তিনটি চার ও তিনটি ছক্কা মারেন তিনি। শাহবাজ়ের সেই ইনিংস কাজে এল না। উর্বিল ঝড়ে আরও এক হারের সাক্ষী থাকল লখনউ।

Advertisement
আরও পড়ুন