বৈভব সূর্যবংশী। ছবি: পিটিআই।
গ্রুপ পর্বে সানরাইজ়ার্স হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে শূন্য রানে আউট হওয়ার পর দ্বিতীয় ম্যাচে শতরান করেছিল বৈভব সূর্যবংশী। তাই এলিমিনেটরে নামার আগে হায়দরাবাদের অধিনায়ক প্যাট কামিন্স জানিয়েছিলেন, বৈভবের বিরুদ্ধে এ, বি, সি— সব পরিকল্পনা করে রেখেছেন তাঁরা। সেই সব পরিকল্পনা ভেস্তে দিল বৈভব। হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে ২৯ বলে ৯৭ রানের ইনিংস খেলেছে সে। তার ব্যাটে ভর করেই ২০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৪৩ রান করেছে রাজস্থান রয়্যালস।
বৈভবের বিরুদ্ধে হায়দরাবাদের তিনটি পরিকল্পনাই দেখা গিয়েছে। শুরুতে কামিন্স নিজে বৈভবের বিরুদ্ধে ইয়র্কারের পরিকল্পনা করেন। তা কাজে লাগেনি। সামনের পা সরিয়ে মিড অফ ও সামনে কয়েকটি বড় শট খেলে বৈভব। রাউন্ড দ্য উইকেটে এসে বৈভবের অফ স্টাম্প লক্ষ্য করে লেংথে বল করা শুরু করেন তিনি। তা-ও কাজে আসেনি। কভার ও মিড অফে ছক্কা খান কামিন্স।
সঙ্গে সঙ্গে প্ল্যান বি অনুযায়ী বল করা শুরু করে হায়দরাবাদ। কামিন্স-সহ সাকিব হুসেন, প্রফুল্ল হিঙ্গে, ঈশান মালিঙ্গারা বৈভবকে দ্রুত গতিতে বাউন্সার করা শুরু করেন। কিন্তু তাতেও বৈভবকে আটকানো যায়নি। একের পর এক পুল শট মারতে শুরু করে সে। স্কয়্যার লেগ, মিড উইকেট ও লং লেগে কয়েকটি ছক্কা মারে সে।
বাধ্য হয়ে তৃতীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী বল করা শুরু করেন কামিন্সেরা। বলের গতি কমিয়ে কাটার দেওয়া শুরু করেন তাঁরা। সেই বলও বৈভব দেখে বড় শট মারা শুরু করে। কোনও ভাবেই তাকে আটকানো যায়নি। ছক্কা মেরে দ্রুততম শতরান করতে গিয়ে থার্ডম্যানে ক্যাচ দিয়ে ফেরে বৈভব। সেই বলটাই ঠিক মতো ব্যাট লাগাতে পারেনি সে। ফলে হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন কামিন্সেরা।
আর একটু হলেই ক্রিস গেলের দ্রুততম শতরানের রেকর্ড ভেঙে যেত। ২০১৩ সালে রয়্যাল চ্যালেঞ্জর্স বেঙ্গালুরুর হয়ে রাইজ়িং পুণে সুপারজায়ান্টসের বিরুদ্ধে ৩০ বলে শতরান করেছিলেন তিনি। যে বলে বৈভব আউট হল, সেটি আর একটু হলেই ছক্কা হয়ে যেত। কিন্তু হল না। ফলে রক্ষা পেল গেলের রেকর্ড। কিন্তু ২৯ বলে ৫ চার ও ১২ ছক্কার ইনিংসে বৈভব যে ঝড় তুলল, তার প্রশংসা করল গোটা স্টেডিয়াম। মুগ্ধ ক্রিকেটপ্রেমীরা।
বৈভবের ইনিংস দেখে সমাজমাধ্যমে নিজের কথা জানিয়েছেন সচিন তেন্ডুলকর। তিনি লেখেন, “বৈভবের ব্যাট চালানো অসাধারণ। যেটা দেখে আরও ভাল লাগে, তা হল, কত সুন্দর ভাবে সামনের পা সরিয়ে বল মারার জন্য ও জায়গা তৈরি করে। এটা ওকে শট মারার স্বাধীনত দেয়। ও যা করছি তা অবিশ্বাস্য।”
আইপিএলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দ্রুততম শতরানের রেকর্ড রয়েছে বৈভবের দখলে। গত বছর ৩৫ বলে শতরান করেছিল সে। এ বার করেছে ৩৬ বলে শতরান। কিন্তু কয়েক দিন আগেই বৈভব জানিয়েছিল, তার লক্ষ্য ২৫ বলে শতরান। তেমনটাই খেলছিল রাজস্থান রয়্যালসের ক্রিকেটার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হল না। আউট হয়ে মাথায় হাত দিল বৈভব। তার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, অল্পের জন্য রেকর্ড হাতছাড়া হওয়ায় কতটা হতাশ হয়েছে সে।
গেলের শতরানের রেকর্ড ভাঙতে না পারলেও এই ম্যাচে জোড়া রেকর্ড গড়েছে বৈভব। তার মধ্যে একটি গেলের রেকর্ড ভেঙে। আইপিএলের এক মরসুমে সবচেয়ে বেশি ছক্কা মারার রেকর্ড গড়েছে বৈভব। ২০১২ সালে গেল মেরেছিলেন ৫৯ ছক্কা। সেটিই ছিল এত দিন রেকর্ড। ১৪ বছর পর সেই রেকর্ড ভাঙল। এই মরসুমে বৈভবের ছক্কার সংখ্যা ৬৫। যদি হায়দরাবাদকে হারিয়ে রাজস্থান দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে ওঠে তা হলে বৈভবের ছক্কার সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি আইপিএলের নকআউটে দ্রুততম অর্ধশতরানও করল বৈভব। ২০১৪ সালে ওয়ানখেডেতে ১৬ বলে অর্ধশতরান করেছিলেন সুরেশ রায়না। সেই নজির ছুঁয়ে ফেলল বৈভব। অর্থাৎ, মাত্র ১৬ বলে জোড়া রেকর্ড গড়ে ফেলল বিহারের ছেলে। তৃতীয় রেকর্ড অবশ্য হাতছাড়া হল তার।
অবশ্য ইনিংসের বিরতিতে বৈভব জানিয়েছে, শতরানের কথা ভেবে সে খেলেনি। বৈভব বলেছে, “আমি শতরানের কথা এক বারও ভাবিনি। শুধু নিজের শট খেলছিলাম। দলের জন্য রান করতে চেয়েছিলাম। সেটা করেছি।” যে বলে সে আউট হয়েছে, সেই শট মারার আগে ফিল্ডারকে দেখতে গিয়ে ভুল করেছে বলে স্বীকার করে নিয়েছে বৈভব। সে বলেছে, “আমি ফিল্ডার দেখতে গিয়ে ভুল করলাম। যদি থার্ডম্যান বা পয়েন্টের উপর দিয়ে মারার চেষ্টা করতাম তা হলে ভাল হত। কিন্তু উইকেটের অনেক সোজাসুজি চলে গেল। তাই আউট হয়ে গেলাম।”
বৈভব যে শুরু দিয়েছিল, তাতে অন্তত ২৬০-২৬৫ রান হওয়ার উচিত ছিল রাজস্থানের। কিন্তু শেষ দিকে কয়েকটি উইকেট পড়ে যাওয়ায় রান তোলার গতি কমে যায়। বৈভবেরও সেটা মনে হয়েছে। সে বলেছে, “আমি আউট হওয়ার পরেও মনে হয়েছিল, ১৫০ রানের বেশি হবে। কিন্তু তা হল না। যা করেছি, সেই রানের মধ্যে ওদের আটকানোর চেষ্টা করব।”