FIFA World Cup 2026

বিশ্বকাপে কাঠগড়ায় জলপানের বিরতি! প্রবল সমালোচিত ফিফা, শুধুই কি বিজ্ঞাপনের কথা ভেবে এই সিদ্ধান্ত? উঠছে প্রশ্ন

চলতি ফুটবল বিশ্বকাপে সামর্থকরা যা চেয়েছেন সেটাই দেখতে পেয়েছেন। দুর্দান্ত গোল থেকে কৌশলে টেক্কা দেওয়া, তরুণ প্রতিভার উত্থান থেকে নাটকের পর নাটক। শুধু সমস্যা একটি জিনিস নিয়ে— জলপানের বিরতি।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬ ২০:১৫
sports

মদ্রিচদের জলপানের বিরতি। ছবি: রয়টার্স।

চলতি ফুটবল বিশ্বকাপে সামর্থকরা যা চেয়েছেন সেটাই দেখতে পেয়েছেন। দুর্দান্ত গোল থেকে কৌশলে টেক্কা দেওয়া, তরুণ প্রতিভার উত্থান থেকে নাটকের পর নাটক। ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এক সপ্তাহ কাটলেও কোনও কিছুরই খামতি থাকেনি। শুধু সমস্যা একটি জিনিস নিয়ে— জলপানের বিরতি।

Advertisement

ফিফার নতুন এই সিদ্ধান্ত ঘিরে গোটা বিশ্ব দ্বিধাবিভক্ত। কেউ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ কঠোর সমালোচনা করেছেন। তবে বেশিরভাগ সমর্থকদের কাছেই এই নতুন সিদ্ধান্ত যথেষ্ট বিরক্তির। যাঁরা ফুটবল দেখেন এবং যাঁরা ফুটবল খেলেন, সকলের কাছেই বিষয়টি বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফিফার নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দুই অর্ধের ২২তম মিনিটে জল পানের বিরতি দেবেন রেফারি। তিন মিনিটের এই বিরতিতে ফুটবলারেরা শুধুই জলপান করেন না। তাঁরা বিশ্রাম করেন, আবার কোচেরা বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। আমেরিকার প্রচণ্ড গরম সামলাতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছিল ফিফা। কিন্তু বিষয়টা এতটা সহজ নয়।

বিতর্ক তৈরি হয়েছিল প্রথম দিন থেকেই। সম্প্রচারকারী সংস্থাগুলিকে ফিফা অনুমতি দিয়েছিল জলপানের বিরতির সময় বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন চালানোর। সম্প্রচারস্বত্ব কিনতে যে খরচ হয়েছে তার কিছুটা উঠে আসবে ওই বিজ্ঞাপন থেকেই। ফলে আগে ৪৫ মিনিট ধরে দুই অর্ধের যে একটানা ফুটবল দেখতে সমর্থকরা অভ্যস্ত ছিলেন, হঠাৎই তাতে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। এখন ২২ মিনিট পরেই জলপানের বিরতি থাকছে। ফলে দুই অর্ধের বদলে ফুটবল ম্যাচ হয়ে গেছে চারটি কোয়ার্টারের। সমর্থকদের দাবি, এটাই ছিল ফিফার উদ্দেশ্য।

আদৌ কি জলপানের বিরতির দরকার রয়েছে?

ফুটবল ছন্দের খেলা। যে কোন মুহূর্তে ম্যাচের রং বদলে যেতে পারে। টানটান ফুটবল চলতে চলতে হঠাৎ করে যদি খেলা থামিয়ে জলপানের বিরতি দেওয়া হয়, তা হলে যে কোনও দলের বা ফুটবলারের ছন্দ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এমনকি সমর্থকদেরও মেজাজ নষ্ট হতে পারে। জার্মানি বনাম কুরাসাও ম্যাচে সেই জিনিসটা ভাল বোঝা গিয়েছে। জার্মানি গোল করে এগিয়ে যাওয়ার পর কুরাসাও সবে সমতা ফিরিয়েছিল। সেই সময় রেফারি জলপানের বিরতি দেন। কুরাসাও যে ছন্দ তৈরি করেছিল, সেটা তারা ধরে রাখতে পারেনি। প্রথমার্ধেই আরও দু’টি গোল দেয় জার্মানি। পরে ম্যাচটি তারা জেতে ৭-১ গোলে। অনেকেই বলছেন, জলপানের বিরতি কুরাসাওয়ের যাবতীয় ছন্দ নষ্ট করে দিয়েছিল।

নেদারল্যান্ডসের ডিফেন্ডার ভার্জিল ফান ডাইক বলেছেন, “আমার মনে হয় জলপানের বিরতিটা বেশ মজার ব্যাপার। বিশ্বকাপের প্রায় সব ম্যাচই আমি দেখেছি। কিন্তু প্রত্যেক বার জলপানের বিরতির সময় বিজ্ঞাপন দেখানোটা আমার পছন্দ নয়। যাঁরা নিরপেক্ষ দর্শক হিসেবে টিভি দেখতে বসেন, তাঁদের কাছে ব্যাপারটা যথেষ্ট বিরক্তির। যদি সত্যি গরম থাকে, তা হলে জলপানের বিরতি দেওয়া হোক। কিন্তু সেটা ম্যাচ ধরে ধরে দেখা উচিত। সব ম্যাচে দেওয়া উচিত নয়।”

যে দেশে বিশ্বকাপ হচ্ছে, সেই আমেরিকার কোচ পর্যন্ত বিষয়টির বিরোধিতা করেছেন। মোরিসিয়ো পোচেত্তিনো বলেছেন, “আমার বিষয়টা একেবারেই পছন্দ নয়। যেখানে পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ সেখানে জলপানের বিরতি দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু যেখানে খুব একটা গরম নেই, সেখানে জলপানের বিরতিরও দরকার নেই।” উল্লেখ্য, আমেরিকায় এমন অনেক স্টেডিয়ামে খেলা হচ্ছে, যেখানে চাইলেই ছাদ ঢাকা দেওয়া যায় এবং অত্যাধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা রয়েছে। অনেক স্টেডিয়ামে ছাদ ঢেকেই খেলার আয়োজন করা হচ্ছে। সেই সব মাঠে জলপানের বিরতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

কিছু কিছু দল এর সুবিধাও পাচ্ছে। মরক্কোর বিরুদ্ধে প্রথম ২০ মিনিটে নাজেহাল হয়ে গিয়েছিল ব্রাজ়িল। জলপানের বিরতি দেওয়া হয়েছিল একেবারে নিখুঁত সময়ে। ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলোত্তি সেই সময় ফুটবলারদের কিছু পরামর্শ দেন। এর পরেই ব্রাজিলের খেলার ধরন বদলে যায়। ধীরে ধীরে তারা ম্যাচের দখল নিতে শুরু করে এবং গোল করে দেয়। আনচেলোত্তি পরে বলেন, “ওই সময় বিভিন্ন সমস্যার কথা ফুটবলারদের বলতে পারি। কৌশলগত বদল আনতে পারি, যা পরে কাজে লাগতে পারে। কোচেদের কাছে এই সময়টা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।” সাধারণত, কোনও ফুটবলার চোট পেলে বা অন্য কোনও কারণে খেলা বন্ধ থাকলে তখনই কোচেরা ফুটবলারদের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সুযোগ পেতেন। এখন প্রতি ম্যাচেই বিরতি বাদে অন্তত ৬ মিনিট তাঁরা ফুটবলারদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।

শুধুই কি বিজ্ঞাপন খোঁজার ফিকির?

খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা কৌশলগত বদলের বিষয়টি বাদ দিলে, যে প্রশ্নটা সব থেকে বেশি উঠে আসছে তা হল, ফিফার এই সিদ্ধান্ত কি শুধুই সম্প্রচারকারী সংস্থাগুলিকে বিজ্ঞাপনের সময় দেওয়ার একটি উপায়? ফিফা নিয়ম করেছে, জলপানের বিরতি শেষ হওয়ার অন্তত ৩০ সেকেন্ড আগে ম্যাচের সরাসরি সম্প্রচারে ফিরতে হবে। তা সত্ত্বেও অন্তত পক্ষে দু’মিনিট থাকে বিজ্ঞাপন দেখানোর, যা লক্ষ লক্ষ টাকা কামানোর পক্ষে যথেষ্ট। অনেকে আবার এই নিয়মটিও মানছেন না। যেমন, আমেরিকার একটি সম্প্রচারকারী সংস্থা মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে খেলা শুরু হয়ে যাওয়ার ১০ সেকেন্ড পর সম্প্রচার শুরু করেছে। ইংল্যান্ডের প্রাক্তন স্ট্রাইকার ইয়ান রাইট বলেছেন, “আমার মনে হয়, এই বিরতি শুধুমাত্র বিজ্ঞাপন দেওয়ার একটা উপায়। খেলোয়াড়দের কোনও লাভ হচ্ছে না।”

Advertisement
আরও পড়ুন