গোল করে উল্লাস কিলিয়ান এমবাপের। ছবি: রয়টার্স।
ফ্রান্স - ১ (এমবাপে)
প্যারাগুয়ে - ০
বিরক্ত করে যাও! কোচ গুস্তাভো আলফারোর এই একটা মন্ত্রেই প্যারাগুয়ে প্রায় আটকে দিয়েছিল ফ্রান্সকে। ৭০ মিনিট পর্যন্ত গোলের মুখ খুলতে পারেনি এই বিশ্বকাপে একের পর এক প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে এগিয়ে চলা ফ্রান্স। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারল না প্যারাগুয়ে। রক্ষণের একটা ভুলে ম্যাচ হাতছাড়া হল। পেনাল্টি থেকে করা কিলিয়ান এমবাপের একমাত্র গোলে প্যারাগুয়েকে হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল ফ্রান্স। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ মরক্কো।
২৪ ঘণ্টা আগে গত বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে প্রায় আটকে দিয়েছিল কাবো ভার্দে। দেখিয়ে দিয়েছিল লিয়োনেল মেসিদের দুর্বলতা। সেই একই কাজ করল প্যারাগুয়ে। আরও এক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে কী ভাবে আটকানো যায়, তার পথ দেখিয়ে দিল তারা।
গুস্তাভো জানতেন, তাঁদের প্রথম কাজ এমবাপেদের আটকানো। তাই পাঁচ ডিফেন্ডারে দল সাজিয়েছিলেন। তাঁদের সামনে আরও চার ফুটবলার। আক্রমণে একা হুলিয়ান এনসিসো। এই পরিকল্পনা কাজেও লাগে। প্রথমার্ধে ফ্রান্স পাঁচটি শট নিয়েছিল। কিন্তু একটাও নিশানায় নয়। বোঝা যাচ্ছিল, জায়গা পাচ্ছেন না এমবাপেরা।
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
সব রকম চেষ্টা করছিল ফ্রান্স। উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, ব্র্যাডলি বার্কোলারা বার বার প্রান্ত বদল করছিলেন। এমবাপে কখনও মাঝে, কখনও বাঁ প্রান্তে চলে যাচ্ছিলেন। ক্রস ভেসে আসছিল প্যারাগুয়ের বক্সে। কিন্তু অরল্যান্ডো গিলকে পরাস্ত করতে পারছিল না ফ্রান্স। জার্মানি ম্যাচের থেকেও এই ম্যাচে ভাল খেললেন গিল। পেনাল্টি থেকে গোল খাওয়া ছাড়া একটিও ভুল করেননি। বাঁচিয়েছেন অন্তত তিনটি অবধারিত গোল।
মাঝেমধ্যেই চোরাগোপ্তা আঘাত করছিলেন প্যারাগুয়ের ফুটবলারেরা। যে আঘাতে কার্ডও দেখানো যাবে না। অথচ প্রতিপক্ষ বিরক্ত হবে। হলও তাই। মাঠে ধাক্কাধাক্কি, ফাউল সব দেখা গেল। এমবাপেও তাতে জড়িয়ে পড়লেন। বিরতিতে মাঠ ছাড়ার সময়ও সেই গণ্ডগোল থামেনি।
প্রথমার্ধে গোল না হওয়ায় দ্বিতীয়ার্ধে পরিকল্পনা বদলান ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশঁ। বক্সের বাইরে থেকেই শট মারতে শুরু করেন ফুটবলারেরা। মানু কোনে ও আদ্রিয়েন হাবিয়ো অন্তত ছ’টি শট মারেন। একটিই গোলে ছিল। কোনের সেই শট ঝাঁপিয়ে বার করে দেন গিল। প্যারাগুয়ের আট ফুটবলারের রক্ষণ ভাঙতে না পেরে দেশঁর মতো আপাত শান্ত কোচও মেজাজ হারাচ্ছিলেন।
ঠিক সেই সময় ধাক্কা খেল প্যারাগুয়ে। গোটা প্রথমার্ধ জুড়ে একাই স্ট্রাইকারের ভূমিকায় খেলছিলেন এনসিসো। যে কয়েকটি বল পাচ্ছিলেন, চেষ্টা করছিলেন গোলের কাছে নিয়ে যাওয়ার। কিন্তু ফিলাডেলফিয়ার গরমে অত্যধিক ধকল সামলাতে পারলেন না। ফলে ৬০ মিনিটের পর চোটে তাঁকে তুলে নিতে বাধ্য হন গুস্তাভো। রক্ষণের বড় ভরসা আলদারেতেও চোটে উঠে যান। এই জোড়া চোট গুস্তাভোর পরিকল্পনা ঘেঁটে দেয়।
দূর থেকে মারা শটেও গোল হচ্ছে না দেখে বার্কোলাকে তুলে ডেজ়িরে ডুয়েকে নামান দেশঁ। এই পরিকল্পনা কাজে লাগে। ৭০ মিনিটের মাথায় একক দক্ষতায় বল নিয়ে বক্সে ঢোকেন ডুয়ে। প্যারাগুয়ের তিন ডিফেন্ডার তাঁকে আটকাতে গিয়ে ফাউল করে বসেন। প্রথমে রেফারি পেনাল্টি না দিলেও পরে ভার রিপ্লে দেখে সিদ্ধান্ত বদলান। স্পট থেকে গিলকে পরাস্ত করেন এমবাপে।
চলতি বিশ্বকাপে এটি এমবাপের সাত নম্বর গোল। মেসিও কাবো ভার্দের বিরুদ্ধে নিজের সপ্তম গোল করেছেন। দুই তারকা এখন এক জায়গায়। বিশ্বকাপে মোট গোলের নিরিখে মেসির (২০) ঠিক পিছনেই এমবাপে (১৯)। মেসির মতোই দু’টি বিশ্বকাপে সাত বা তার বেশি গোল করার নজির গড়লেন ফরাসি স্ট্রাইকার।
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
ফ্রান্স এগিয়ে যাওয়ার পরেও হাল ছাড়েনি প্যারাগুয়ে। অসম লড়াই হলেও এক ইঞ্চি জমি ছাড়েনি তারা। প্রথমার্ধের উত্তাপ দ্বিতীয়ার্ধে আরও বাড়ে। ধাক্কাধাক্কি করতে গিয়ে কোনে, ওলিসেরা হলুদ কার্ড দেখেন। পরের ম্যাচে কার্ড দেখলে সমস্যায় পড়বেন তাঁরা।
সংযুক্তি সময়ে মেসিকে টপকে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন এমবাপে। কিন্তু পর পর দু’বার গিলের কাছে আটকে যান তিনি। অবধারিত দু’টি গোল বাঁচান গিল। প্যারাগুয়ে হারলেও আরও এক গোলরক্ষক এ বার তারকা হয়ে উঠলেন।
খেলা শেষে ফ্রান্সের ফুটবলারেরা যে ভাবে উল্লাস করছিলেন, তা স্পষ্ট করে দিচ্ছিল, এই ম্যাচ জিতে কতটা স্বস্তি পেয়েছেন তাঁরা। হবে না-ই বা কেন। ২৪ ঘণ্টা আগে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে কাবো ভার্দে যে লড়াই করেছিল, ফ্রান্সের বিরুদ্ধে প্যারাগুয়ের লড়াই তার থেকে কিছু কম নয়। ধারেভারে অনেক পিছিয়ে থাকলেও জেদ, পরিকল্পনা আর জানকবুল লড়াই কী করতে পারে, তা প্রায় দেখিয়ে দিয়েছিল প্যারাগুয়ে। কিন্তু বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল তো একটা সুযোগেই বাজিমাত করে। সেটাই দেখাল ফ্রান্স।
এ বার সামনে মরক্কো। আশরফ হাকিমি, সাইবারিদের সামনে লড়াইটা আরও কঠিন হতে পারে ফ্রান্সের। কারণ, প্যারাগুয়ে না হয় ৯০ মিনিট রক্ষণই করে গেল, মরক্কো তা করবে না। এই ম্যাচের দিকে নিশ্চয় নজর ছিল মরক্কোর। এমবাপেদের ফ্রান্সকেও যে আটকানো সম্ভব তার নীল নকশা কিন্তু মরক্কোকে দিয়ে দিলেন গুস্তাভো।