মন্দার পর্বত। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
নতুন বছরে বেড়ানোর নতুন ঠিকানা চাই? তা-ও হতে হবে কাছেপিঠে। ঘুরে আসা যাবে সপ্তাহান্তেই। তা হলে চলুন এমন এক জায়গায়, যে স্থানে জড়িয়ে রয়েছে পুরাণকথা। রয়েছে এমন এক পর্বত, যে পাহাড়ের কথা ছোট থেকেই মা-ঠাকুরমাদের মুখে শুনেছেন।
ঘুরে নিন কাহালগাঁও আর মন্দারপর্বত। বিহারের এই দুই স্থানে ঘুরে আসা মোটেই সময় সাপেক্ষ ব্যাপার নয়। রাতের ট্রেনে চাপলে ভোরেই পৌঁছোতে পারেন কাহালগাঁও। হাতে তিনটি দিন সময় থাকলে কাহালগাঁও-মন্দারপর্বত দুই জায়গা খুব ভাল করেই ঘোরা যাবে। তবে ২ দিনেই ঘুরে নিতে পারেন পুরাণে বর্ণিত মন্দার পর্বত, যা নাকি দেবাসুরের সমুদ্রমন্থনে দণ্ড হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। দড়ি হয়েছিলেন, স্বয়ং বাসুকী নাগ।
গঙ্গাবক্ষে নৌ বিহারের সময় ঘুরে নিতে পারেন এমন তিনটি দ্বীপে। ছবি:সংগৃহীত।
শুরুটা অবশ্য করতে পারেন হাওড়া থেকে। প্রথম গন্তব্য কাহালগাঁও। মন্দার পর্বত পৌঁছনোর আগে একটা দিন ঘুরে নিতে পারেন সেখানেই। ভোরের দিকে পৌঁছলে কিছু ক্ষণ কাহালগাঁও স্টেশনে অপেক্ষা করে নিন। চাইলে স্টেশনের কাছাকাছি কোনও হোটেলে ঘর বুকিং করে খানিক জিরিয়েও নিতে পারেন। ভোরের আলো ফুটলে সোজা চলুন গঙ্গার ধারে। দূরত্ব বেশি নয়, হেঁটেই পৌঁছোতে পারেন সেখানে।
গঙ্গার মধ্যে তিন দ্বীপের অবস্থান। সেই দ্বীপই এই স্থানকে পর্যটন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু করেছে। কুয়াশামাখা সকাল, কনকনে ঠান্ডা দোসর হবে এখানে। গঙ্গাবক্ষে শীতের দিনে রোদের পরশ মেখে নৌকোয় ভেসে বেড়ানোর আনন্দই আলাদা। নৌকা করে ঘুরে নিতে পারেন প্রতিটি দ্বীপের মন্দিরগুলি। দ্বীপগুলি বড়ই ছোট, তবে জলপথে যাত্রা করাটা বেশ রোমাঞ্চকর। বিশেষত ভোরে এলে অদ্ভুত প্রশান্তি মিলবে। এক দিকে সূর্যোদয় হচ্ছে, অন্য দিকে, মন্দির থেকে প্রার্থনা-ভজনের সুর ভেসে আসছে। এ এক অদ্ভুত সমন্বয়।
দূর থেকে দ্বীপগুলিকে ঠিক যতটা ছোট দেখায়, ততটাও ছোট নয়। বরং পাথুরে দ্বীপের বালুচরে দিব্যি ঘুরে বেড়ানো যায়। অনেকটা সময় সেখানে ঘুরিয়ে কাটিয়েও দেওয়া যায়। তিনটি দ্বীপে রয়েছে মন্দির এবং আশ্রম।
সেগুলি দেখা হলে ঘুরে নিন চলুন বটেশ্বরের শিব মন্দিরের উদ্দেশ্য। গাড়ি করে ঘোরার পরিকল্পনা না থাকলে টোটো করেই ঘুরে নিন বটেশ্বর ধাম এবং বিক্রমশীলা বিহার। বটেশ্বর ধামে রয়েছে একাধিক গুহা। স্থানটি শান্ত এবং সুন্দরও। এই স্থান ঘিরেও শিব-পার্বতীর কাহিনি প্রচলিত। বটেশ্বরের মন্দির ঘুরে চলে যেতে পারেন বিক্রমশীলা।
বিক্রমশীলা মহাবিহার ছিল প্রাচীন ভারতে শিক্ষার অন্যতম পীঠস্থান। শোনা যায়, রাজা ধর্মপালের উৎসাহে তা প্রতিষ্ঠা হয়। এটি শুধু ধর্মচর্চার ক্ষেত্র ছিল না বরং তা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়। শোনা যায়, এখানকার আচার্য ছিলেন অতীশ দীপঙ্কর। এখানে রয়েছে বিক্রমশীলা মহাবিহারের ধ্বংসাবশেষ। জায়গাটি পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ দ্বারা সংরক্ষিত।
চাইলে একটি রাত কাহালগাঁওতে থেকে যেতেই পারেন, স্টেশনের কাছে ছোট-বড় নানা হোটেল আছে। কাহালগাঁও থেকে সেই দিন বিকালে বা পরের দিন সকালে ট্রেনে অথবা বাসে কিংবা গাড়ি ভাড়া করে চলুন ভাগলপুর। সেখান থেকে মন্দার পর্বতের দূরত্ব ৫০ কিলোমিটারের মতো।
পুরাণে বর্ণিত মন্দার পর্বতে পুণ্যার্থীরা ভিড় করলেও, নিশ্চিন্তেই এই স্থান ঘোরা যায়। জায়গাটি দৃশ্যতই সুন্দর। সেখানে সমুদ্র নেই বটে, রয়েছে জলাশয়। তার উপরেই লক্ষ্মী-নারায়ণ মন্দির। লোকমুখে শোনা যায়, সমুদ্র মন্থনে উত্থিত অমৃত কলস থেকে এক বিন্দু না কি এই জলাশয়েও পড়েছিল। এই পুষ্করিণীর নাম পাপহারিনী। বিশ্বাস, এখানে স্নান করলে চর্মরোগ সেরে যায়, পাপস্খলন হয়।
শান্ত পরিবেশ। মন্দির দর্শন করে যেতে পারেন মন্দির পর্বতের দিকে। নামে পাহাড় বা পর্বত বলা হলেও, তা আসলে একটি বড়সড়ি টিলা। উপরে ওঠার জন্য বাঁধাই করা পথ রয়েছে। জিরিয়ে নেওয়ার জন্য মাঝেমধ্যে বিশ্রামস্থলও পাবেন।
মন্দার পর্বতের সামনে মন্দির। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
মন্দার পর্বতে ওঠার সময় কোথাও কোথাও পাবেন ছোট গুহা। দেখা মিলবে প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শনের। একেবারে উপরে রয়েছে জৈন মন্দির। বিশ্বাস, এখানে দ্বাদশ তীর্থঙ্কর বাসুপূজ্য নির্বাণ লাভ করেছিলেন। পাহাড়ে হেঁটে উঠতে না চাইলে রোপওয়ে রয়েছে।
কী ভাবে যাবেন?
হাওড়া থেকে রাত সাড়ে ন’টায় ছাড়ে হাওড়া-জামালপুর এক্সপ্রেস। পরের দিন ভোর সাড়ে চারটেয় ট্রেনটি কাহালগাঁও পৌঁছয়। এ ছাড়া হাওড়া-গয়া এক্সপ্রেস-সহ একাধিক ট্রেন ধরতে পারেন। আবার কাহালগাঁও বাদ দিতে চাইলে হাওড়া থেকে সরাসরি ভাগলপুর পৌঁছোতে পারেন। বন্দেভারত এক্সপ্রেস ছাড়াও একাধিক ট্রেন রয়েছে যেগুলি রাতে ছাড়, সকালে ভাগলপুর পৌঁছোয়। হাতে দু’দিন সময় থাকলে কাহালগাঁও বাদ দিয়ে মন্দার পর্বতের পরিকল্পনা সাজাতে পারেন। আবার ভাগলপুর থেকে মন্দার পর্বত ঘুরে সেই রাতেই ফেরার ট্রেন ধরতে পারেন। জামালপুর-হাওড়া এক্সপ্রেস রাত ৯টা ৪১ মিনিটে ভাগলপুর ছেড়ে পরদিন ভোর ৫টা ৩৫ মিনিটে হাওড়া পৌঁছয়। কলকাতা থেকে বা যে কোনও শহর থেকে গাড়িতেও যাওয়া যায়। শিয়ালদহ থেকে কাহালগাঁও এবং ভাগলপুর যাওয়ার একাধিক ট্রেন পাবেন। মন্দার পর্বত যেতে হলে হাওড়া থেকে সরাসরি মন্দার হিল স্টেশনে যাওয়ার ট্রেন ধরতে পারেন। এখান থেকে মন্দার পর্বত ৪-৫ কিলোমিটার।
কোথায় থাকবেন?
কাহালগাঁওয়ে স্টেশনের আশপাশেই ছোট-মাঝারি হোটেল মিলবে। ভাগলপুরে থাকার জন্য একাধিক হোটেল রয়েছে।