বরুণ বিশ্বাসের খুনে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের দিকে আঙুল তুলে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দ্বারস্থ পরিবার। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
১৪ বছর পর আবার আলোচনায় উত্তর ২৪ পরগনার সুটিয়া গণধর্ষণ এবং সেই মামলার অন্যতম সাক্ষী বরুণ বিশ্বাসের হত্যার ঘটনা। বরুণের খুনের পুনর্তদন্তের দাবি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দ্বারস্থ হল বিশ্বাস পরিবার। বরুণের দাদা-দিদির দাবি, ভাইয়ের খুনের প্রকৃত তদন্ত হয়নি। মূলচক্রীদের আড়াল করা হয়েছিল। তাঁদের আঙুল রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় (বালু) মল্লিকের দিকে।
শনিবার সল্টলেকে বিজেপির দলীয় কার্যালয়ে গিয়েছিলেন বরুণের দাদা অসিত বিশ্বাস এবং দিদি প্রমীলা রায়। মুখ্যমন্ত্রীর ‘জনতার দরবার’-এ শুভেন্দুর সঙ্গে কথা বলেন তাঁরা। প্রমীলা জানান, মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের যথেষ্ট সময় দিয়েছেন। ধৈর্য ধরে তাঁদের সমস্ত অভিযোগ শুনেছেন। প্রমীলা জানান, ভাইয়ের খুনের পর তাঁরা প্রতিনিয়ত পুলিশের হুমকি পেয়েছেন। যে পরিবারের সদস্য খুন হলেন, সেই পরিবারই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে। বরুণের দিদির আঙুল তৎকালীন তৃণমূল বিধায়ক জ্যোতিপ্রিয়ের দিকে। তাঁর আশা, এ বার বিচার মিলবে। মুখ্যমন্ত্রী সেই আশ্বাস দিয়েছেন।
একই কথা বলছেন বরুণের দাদা অসিত। আনন্দবাজার ডট কম-কে তিনি বলেন, ‘‘আজ আমি আর আমার বোন প্রমীলা রায় মুখ্যমন্ত্রীর কাছে গিয়েছিলাম। তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে গোটা বিষয়টি শুনেছেন। ১৪ বছর আগেকার ঘটনা। আমরা জানিয়েছি যে, সঠিক তদন্ত হয়নি। ভাইয়ের খুনে মূল অভিযুক্ত জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। গত ১৪ বছরে সিআইডি অনেক তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করেছে। ঠিকঠাক তদন্ত হয়নি। মুখ্যমন্ত্রীও সেটা মেনে নিয়েছেন।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন একটি তদন্ত কমিটি গড়া হবে। তিনি আমাদের জানিয়েছেন তথ্যপ্রমাণ দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে। আমরা জানিয়েছি, তদন্তে সব রকম সহযোগিতা করব। মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাসে মনে হচ্ছে, এ বার বিচার হবে।’’
২০১২ সালের ৫ জুলাই উত্তর ২৪ পরগনার গোবরডাঙা স্টেশনের কাছে দুষ্কৃতীদের গুলিতে খুন হন কলকাতার মিত্র ইনস্টিটউশনের (মেন) বাংলার শিক্ষক বরুণ। ৩৮ বছরের শিক্ষক সুটিয়ায় নারী নির্যাতন এবং গণধর্ষণের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। এলাকায় প্রতিবাদের মুখ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। নানা দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। পরিবারের দাবি, সেই কারণে পরিকল্পিত ভাবে বরুণকে খুন করা হয়।
বিশ্বাস পরিবারের দাবি, সুটিয়া গণধর্ষণ এবং বরুণের খুনের নেপথ্যে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা দীর্ঘদিন আইনের আওতার বাইরে। প্রাক্তন মন্ত্রী, হাবড়ার প্রাক্তন বিধায়ক জ্যোতিপ্রিয়ের নাম একাধিক বার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু তাতে কর্ণপাত করেননি তদন্তকারীরা। যদিও ওই অভিযোগ নিয়ে আদালতে কোনও চূড়ান্ত রায়ও হয়নি।
এখন বরুণের দাদার অভিযোগ, সিআইডি তদন্তের সময় তাঁরা অনেক তথ্যপ্রমাণ দিয়েছেন। কিন্তু তা গ্রাহ্য করা হয়নি। অসিত বলেন, ‘‘২০১২ সালের ২৫ জুলাই ভবানী ভবনে গিয়েছিলাম। সেখানে তদন্তকারী পুলিশ আধিকারিক আমাদের কিছু কল ডিটেলস্ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে দমদম সেন্ট্রাল জেলে বন্দি গাইগাটার দুষ্কৃতী সুশান্ত চৌধুরীই ভাইকে খুন করেছেন। আমাদের বক্তব্য, হতেই পারে তিনি-ই খুনি। কিন্তু তিনি কার লোক ছিলেন? তাঁকে বা তাঁদের পরিচালনা করতেন কারা? তখন ওই পুলিশ আধিকারিক আমাদেরই হুমকি দেন।’’
বরুণের পরিবারের দাবি, জ্যোতিপ্রিয়-ঘনিষ্ঠ অপরাধীদের তোলাবাজির সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বরুণ। চাষের জমি দখল, ইটভাটা তৈরি, সেচের জন্য বরাদ্দ কোটি কোটি টাকা সিন্ডিকেটের হাতে চলে যাওয়া— এই সমস্ত কিছুর বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন স্কুলশিক্ষক বরুণ। তাই তাঁকে খুন করা হয়েছে। এ বিষয়ে জ্যোতিপ্রিয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও জবাব মেলেনি।
রাজ্যে পালাবাদলের পরে আবার পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছে বরুণের পরিবার। গত ১৩ জুন বনগাঁ পুলিশ জেলার সুপারকে লিখিত আকারে তাদের অভিযোগ জানানো হয়। সেই অভিযোগপত্রের প্রতিলিপি মুখ্যমন্ত্রীর হাতে তুলে দিয়েছেন বলে জানান অসিত।