—প্রতীকী চিত্র।
লণ্ঠনও চলতে পারে। কিন্তু, তারকা আর নয়।
বিধানসভা ভোটের আগে বারাসত কেন্দ্রের হাওয়া এমনই। সেখানে রাস্তায়, চায়ের দোকানে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে ভোটে স্থানীয় প্রার্থীর দাবি, যিনি বারাসত শহরের মানুষের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে থাকতে পারবেন। অভিযোগ, দীর্ঘ দেড় দশক এই কেন্দ্রের বিধায়ক, চিত্রতারকা চিরঞ্জিতচক্রবর্তী তারকা হয়েই রয়ে গিয়েছেন স্থানীয়দের কাছে। যার প্রভাব বারাসতের দৈনন্দিন জীবনের উপরেও পড়েছে বলে মনে করছেন এলাকাবাসীরা। অন্য দিকে, চিরঞ্জিত নিজেও আর বারাসতে ফিরতে চান না বলে জানিয়েছেন। এই অবস্থায়শাসকদল তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব কী সিদ্ধান্ত নেন, সে দিকেই চেয়ে রয়েছেন বাসিন্দারা।
বিধানসভার শেষ অধিবেশনে বিদায়ী বিধায়ক চিরঞ্জিত ঘোষণা করেছেন, তিনি আর ভোটে দাঁড়াতে আগ্রহী নন। তবে, এমন ঘোষণা অতীতেও তাঁকে করতে শোনা গিয়েছে। কিন্তু দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুরোধে ফিরে এসেছেন, পরে এমনটাও জানিয়েছেন। এ বারও চিরঞ্জিত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলনেত্রীর উপরেই ছেড়েছেন। এ দিকে, তাঁর এই ঘোষণার পরেই বারাসতের তৃণমূলপ্রার্থী কে হবেন, সে নিয়ে শুরু হয়েছে জল্পনা। এমনকি, বারাসতের প্রার্থী বাছাই নিয়ে বিস্তর গুঞ্জন রয়েছে দলের মধ্যেই।
স্থানীয় মানুষজনের যুক্তি, বিধায়কের করণীয় কাজকর্ম হয়েছে। কিন্তু বিধায়ক নিজে সুদূর কলকাতা থেকে কালেভদ্রে আসায় স্থানীয় নেতৃত্বের উপরে তাঁর ততটা নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ফলে, অন্য এলাকার নেতারা বারাসতের রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছেন।যার জেরে বারাসতের স্থানীয় রাজনীতি একাধিক নেতার গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
অভিযোগ, এই গোষ্ঠী রাজনীতি প্রভাব ফেলেছে উন্নয়নের কাজে। বারাসত শহর সম্পূর্ণ রূপে জঞ্জালমুক্ত হয়নি, জল জমার সমস্যা রয়ে গিয়েছে, শহর জুড়ে টোটো-অটোরদৌরাত্ম্য বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে। এমনকি, কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিধায়কের তরফে বড়সড় উদ্যোগের অভাবে সরকারের ঘর থেকে বারাসতের জন্য বড় প্রকল্পের কাজের টাকাও আনা যায়নি বলে প্রচার করছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। তাই অন্তত স্থানীয় কাউকেই এ বারের ভোটে প্রার্থী হিসাবে দেখতে চাইছেন বারাসতের বাসিন্দারা। একই দাবি স্থানীয় তৃণমূল নেতা-কর্মীদের একাংশেরও।
বিরোধীদের মতে, বিধায়ক স্থানীয় মানুষ হলে এলাকায় তাঁর নিয়ন্ত্রণ থাকত। কিন্তু চিরঞ্জিত তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েক জনের উপরে কার্যত সব দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন। সেই তালিকায় শীর্ষে ছিলেন বারাসত পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান অশনি মুখোপাধ্যায়। গত লোকসভা নির্বাচনে বারাসত শহরে ফল খারাপ হয়েছিল তৃণমূলের। কয়েক মাস আগে অশনিও অপসারিত হয়েছেন পুর চেয়ারম্যানের পদ থেকে।
এ সবের জেরে বারাসতে এ বার প্রবল ভাবে ভূমিপুত্রের হাওয়া উঠেছে। বিজেপি, সিপিএমের মতো বিরোধী দলও এ বার স্থানীয় কাউকেই প্রার্থী করতে চাইছে বলে খবর।
এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল শিবির থেকে একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম উঠে আসছে। অবশ্য তাঁদের মধ্যে এক জন ছাড়া কেউই বারাসতের ভূমিপুত্র নন। বাকিরা বারাসতকেন্দ্রিক রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জড়িত।
যেমন, এক নেত্রীর চিকিৎসক-পুত্রের ছবি সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে ঘুরতে দেখা গিয়েছে। নাম উঠে আসছে বর্তমানে রাজারহাটের বাসিন্দা এক ডাকাবুকো নেতা এবং এক প্রাক্তন মন্ত্রীরও। আবার, এর পাশাপাশি চিরঞ্জিতের স্বচ্ছ ভাবমূর্তিও চর্চায় রয়েছে বলে খবর।
চিরঞ্জিত নিজেও রাজনীতির ময়দানে তাঁর এই তারকা হয়েই থেকে যাওয়ার বিষয়টি মেনে নিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁর দাবি, কেন্দ্র থেকে তাঁর এই দূরত্বই তাঁকে সাহায্য করেছে নিজের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি বজায় রাখতে। আর সেই কারণেই তিনি বার বার ফিরে এসেছেন বারাসতে। চিরঞ্জিত বলেন, ‘‘আমার যা বয়স, যা শারীরিক ক্ষমতা, তাতে আমি মনে করছি, আর আমার ফেরা উচিত নয়। আমি দলকে, নেত্রীকে সে কথা জানিয়েছি। তা-ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তিনিই নেবেন। রাজনীতি কখনও আমার পেশা ছিল না। আমি অন্য কাজ করি। এটা অনেক বছর ধরেই আমি দলকে জানিয়েছি। তবে আমি দূরে থাকলেও খোঁজ নিয়ে দেখুন, বিধায়কের তাঁর কেন্দ্রের জন্য যা যা করণীয়, সেই কাজ হয়েছে কিনা।’’
কিন্তু শুধুমাত্র ভাবমূর্তির কারণে এ বারও যদি দল না ছাড়ে, তবে পরবর্তী সময়ে কি নিয়মিত বারাসতে দেখা পাওয়া যাবে?
চিরঞ্জিতের সহাস্য মন্তব্য, ‘‘আমার ভাবমূর্তিই আমার সব চেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। আগে দলের সিদ্ধান্ত জানি। পরেরটা পরে ভাবা যাবে।’’