Abhishek Banerjee

পশ্চিম মেদিনীপুরে বিজেপির দু’জন বিধায়কই তৃণমূলে যোগ দিতে চেয়েছিলেন জানিয়ে না নেওয়ার ব্যাখ্যা অভিষেকের

২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে ঘাটালে তৃণমূল প্রার্থী তথা সাংসদ দেবের হয়ে প্রচারে গিয়ে অভিষেক দাবি করেছিলেন, কয়েক মাস আগে বিজেপির বিধায়ক হিরণ তৃণমূলে ফিরতে চেয়েছিলেন। ঘাটাল কেন্দ্রে লোকসভা ভোটে বিজেপির প্রার্থী ছিলেন হিরণ।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:৫৯
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।

পশ্চিম মেদিনীপুরে ১৫টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে দু’টি মাত্র বিজেপির। সেই দুই বিধায়কই তৃণমূলে যোগ দিতে চেয়েছিলেন বলে দাবি করলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার পশ্চিম মেদিনীপুরের কলেজ মাঠে ‘রণসংকল্প সভা’য় অভিষেক প্রথমে ওই দুই বিধায়কের নাম না করলেও পরে খড়্গপুরের বিজেপি বিধায়ক হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের নাম করেন। সেই সঙ্গে জানিয়ে দেন, ওই দুই বিধায়কের জন্য তৃণমূলের দরজা বন্ধ। কারণ, সিপিএমের ‘হার্মাদ’ এখন বিজেপির ‘জল্লাদ’ হয়ে উঠলেও তাঁদের কোনও ভাবেই তৃণমূলের ‘সম্পদ’ হতে দেবেন না।

Advertisement

অভিষেক শুক্রবার বলেন, ‘‘নাম বলব না, পশ্চিম মেদিনীপুরে বিজেপির দু’জন বিধায়ক। সেই দু’জনই তৃণমূলে আসতে চেয়েছেন। আপনাদের দাবিতে মান্যতা দিয়ে দরজা বন্ধ করে রেখেছি।’’ অভিষেক সরাসরি বলেননি। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের অর্থ, ‘আপনাদের’ বলতে তিনি তৃণমূল কর্মীদেরই বুঝিয়েছেন। কারণ, তৃণমূলের কর্মীরা ভোটের সময় বিজেপির বিরুদ্ধে ময়দানে নেমেছিলেন। তাঁরা দল বদলালে সেই কর্মীদের অমর্যাদা করা হয়। অভিষেকের জানান, সিপিএম আমলে কী ভাবে পশ্চিম মেদিনীপুরে ‘হিংসা’-র শিকার হয়েছিলেন তৃণমূল কর্মীরা। তাঁর কথায়, ‘‘যাঁদের বয়স ৪৫-৫০ বছর, তাঁরা জানেন, বেনাচাপড়া, শীতল কপাটের (ঘাটালের বিজেপি বিধায়ক) ইতিহাস।’’

পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুর ব্লকের বেনাচাপড়ায় ২০০২ সালের সেপ্টেম্বরে ন’জন তৃণমূল কর্মী নিখোঁজ হন। ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে স্থানীয় তৃণমূল কর্মী শ্যামল আচার্য তাঁর বাবা অজয় আচার্য-সহ ন’জনের বিষয়ে নিখোঁজ ডায়েরি দায়ের করেন। প্রথমে রাজ্য পুলিশ ও পরে সিআইডি তদন্ত শুরু করে। সেই তদন্তে নেমে বেনাচাপড়ায় কঙ্কাল উদ্ধার হয়। ওই ঘটনায় নাম জড়ায় বাম জমানার মন্ত্রী সুশান্ত ঘোষের। তিনি গ্রেফতার হন এবং পরে জামিন পান। সিপিএমের যে বাহিনীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগ উঠত, তৃণমূলের দাবি, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শীতল। সেই শীতল সিপিএম ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন। পরে তিনি বিজেপি-তে যোগ দেন।

পশ্চিম মেদিনীপুরে দাঁড়িয়ে সেই বেনাচাপড়ার কঙ্কালকাণ্ডের কথা মনে করিয়ে তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ বলেন, ‘‘সিপিএমের হার্মাদেরা আজ বিজেপির জল্লাদ হয়েছে। তারা তৃণমূলের সম্পদ হবে না। আমরা যত দিন রয়েছি, হবে না।’’ এর পরেই তিনি তৃণমূলে যোগ দিতে ‘ইচ্ছুক’ দুই বিজেপি বিধায়কের মধ্যে এক জনের নাম প্রকাশ্যে আনেন। তিনি বলেন, ‘‘অজিত মাইতি (তৃণমূলের পশ্চিম মেদিনীপুরের সমন্বয়ক)-র সঙ্গে হিরণ আমার দফতরে এসেছিল। দেখেছেন তো! আপনাদের দাবিতে মান্যতা দিয়ে নিইনি। আপনাদের দাবি, আশার সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি।’’

এর আগে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে ঘাটালে তৃণমূল প্রার্থী দেবের হয়ে প্রচারে গিয়ে অভিষেক একই দাবি করেছিলেন। সেই কেন্দ্রে লোকসভা ভোটে বিজেপির প্রার্থী হয়েছিলেন হিরণ। তাঁকে কটাক্ষ করে অভিষেক বলেছিলেন, কয়েক মাস আগে হিরণ তৃণমূলে ফিরতে চেয়েছিলেন। হিরণ অভিষেকের সেই দাবি উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি পাল্টা দাবি করেছিলেন, অভিষেকই তাঁকে বার বার ফোন করে ডেকেছিলেন। তাই তিনি অভিষেকের দফতরে গিয়েছিলেন। দলকে পুরো বিষয়টি জানিয়ে তিনি গিয়েছিলেন বলেও দাবি করেছিলেন হিরণ।

শুক্রবার আবার সেই প্রসঙ্গই টেনে আনেন অভিষেক। তার পর তিনি ব্যাখ্যা করেন, কেন খড়্গপুরের বিধায়ক হিরণ এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে বিজেপির আর এক বিধায়ককে (ঘাটাল কেন্দ্র) দলে নেবেন না। অভিষেক এক এক করে মনে করিয়ে দেন ওই এলাকায় সিপিএম ছেড়ে বিজেপি-তে যোগদানকারীদের নাম। দুই দলের মধ্যে ‘যোগ’-এর অভিযোগও তোলেন তিনি। বলেন, ‘‘আজ বিজেপি-তে কারা রয়েছে? শালবনির দেবাশিস রায়, যে সুশান্ত ঘোষের অফিস দেখাশোনা করত, সে আজ বিজেপির বুথ সভাপতি। কেশপুরের তন্ময় ঘোষ ছিলেন সিপিএমের ব্লক সভাপতি। তিনি এখন বিজেপির জেলা কমিটির সদস্য। তন্ময় ঘোষের ভাই সুবীর ঘোষ, যে দাদাকে টপকে যায়। তড়িৎ খাটুয়া, বেনাচাপড়া হত্যাকাণ্ডের অন্যতম অভিযুক্ত, এখন বিজেপি নেতা। মহাদেব প্রামাণিক সিপিএমের প্রাক্তন যুব নেতা, বেনাচাপড়া খুনের অন্যতম অভিযুক্ত, এখন বিজেপির কার্যকর্তা।’’

এর পরে অভিষেক বলেন, ‘‘চন্দ্রকোণায় সুকান্ত দলুই, ঘাটালের বিধায়ক শীতল কপাট নিজেই রয়েছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক সন্ত্রাস, হত্যার এফআইআর হয়েছে। মেদিনীপুরের সুকুর আলি। নাম মনে আছে? তার ছেলে হাসরাফ আলি, মেদিনীপুর শহরের নেতা। গড়বেতার তপন ঘোষ, সুশান্তের ডান হাত এখন বিজেপি-কে মদত দেয়। মেদিনীপুরে এই হল বিজেপির চেহারা।’’

অভিষেকের মতে, ‘‘মেদিনীপুরে যদি কোনও বুথে, কোনও বিধানসভায় বিজেপির কোনও নেতা লিড পায়, তা হলে সিপিএমের এই হার্মাদদের অক্সিজেন দেওয়া হবে।’’ তৃণমূল ‘সেনাপতি’র আরও দাবি, সিপিএমের ‘হার্মাদ’-দের উপর নির্ভর করেই বিজেপির ‘গদ্দার’ (শুভেন্দু অধিকারী) এখানে ‘মডেল’ তৈরি করছে।

অন্যান্য ‘রণসংকল্প’ সভার মতো পশ্চিম মেদিনীপুরের সভাতেও অভিষেক তিন জনকে মঞ্চে তুলে আনেন, যাঁরা নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত এসআইআরের খসড়া তালিকায় ‘মৃত’। তার পরেই তিনি অন্যান্য দিনের মতো আঙুল তোলেন কমিশনের দিকে। তিনি বলেন, ‘‘কমিশনের গায়ে জ্বালা হচ্ছে। অভিষেক নিজের সভায় কী করে এঁদের উপস্থিত করছে? আরও এক জনকে হাজির করতাম, তিনি অন্তঃসত্ত্বা। তাঁর আজ সন্তান হবে।’’ এর পরেই অভিষেক আঙুল তোলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের দিকে। তিনি দাবি করেন, তাঁদের নির্দেশেই এ সব হচ্ছে। সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করতে তৃণমূলকর্মীদের সক্রিয় হতে বলেন তিনি। খসড়া তালিকায় কোনও ভুল বা আপত্তি থাকলে তা সংশোধন করার আবেদনের মেয়াদ বৃদ্ধি করে ১৯ জানুয়ারি করেছে কমিশন। ওই দিন পর্যন্ত তৃণমূল কর্মীদের সজাগ থাকতে বলেছেন অভিষেক। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল ভোটারদের চিহ্নিত করে বিজেপি নেতারা ইআরও-র কাছে ফর্ম জমা দিতে গিয়েছিলেন, যাতে তালিকা থেকে তাঁদের নাম বাদ যায়। সে দিকেও নজর দিতে বলেছেন দলীয় কর্মীদের।

Advertisement
আরও পড়ুন