সন্দীপন সাহা এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। —ফাইল চিত্র।
বিধানসভার বিরোধী দলনেতার পদ সংক্রান্ত মামলায় বৃহস্পতিবার দুপুরে কলকাতা হাই কোর্ট কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ না-দেওয়ায় পদে বহাল থেকে গিয়েছিলেন তাঁরা। বিকেল গড়াতে জানা গেল, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর সহযোগী ‘বিদ্রোহী বিধায়ক’ সন্দীপন সাহাকে তৃণমূল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের উপর গত সোমবারই স্থগিতাদেশ দিয়েছে আলিপুর দেওয়ানি আদালত! পাঁচ দফার নির্দেশে বলা হয়েছে—
১. আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত ঋতব্রত-সন্দীপনের বহিষ্কারের নির্দেশ কার্যকর নয়।
২. বহিষ্কারের ভিত্তিতে কোনও পদক্ষেপ করা যাবে না।
৩. সংবাদমাধ্যমে প্রচার করা যাবে না যে, তাঁরা বহিষ্কৃত।
৪. সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ, বিধানসভা বা দলীয় সংগঠনকে বহিষ্কারের তথ্য পাঠানো যাবে না।
৫. তাঁদের আর ‘দলের সদস্য নন’ বলে গণ্য করা যাবে না।
ঋতব্রত-সন্দীপনের দাবি, ১ জুন তৃণমূল তাঁদের বহিষ্কার করার নোটিস দেয়। কিন্তু বহিষ্কারের আগে— কোনও শো কজ় নোটিস দেওয়া হয়নি। কোনও নির্দিষ্ট অভিযোগ জানানো হয়নি। কোনও দলীয় তদন্ত করা হয়নি। নিজেদের বক্তব্য জানানোর সুযোগও দেওয়া হয়নি। তৃণমূল থেকে ‘বহিষ্কৃত’ দুই বিধায়ক আদালতকে জানিয়েছিলেন, তাঁরা কিছু নথি ও স্বাক্ষরের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং সেই বিষয়ে সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ বিধানসভার স্পিকারের কাছে অভিযোগ করেছিলেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশি তদন্তও শুরু হয়।
ঋতব্রত-সন্দীপনের দাবি, ওই অভিযোগ করার পরেই হঠাৎ তাঁদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হয়। তাই বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত প্রতিহিংসামূলক। সেই সঙ্গে আর্জি জানান, বহিষ্কারের নির্দেশ কার্যকর করার উপর স্থগিতাদেশ দেওয়া হোক। তাঁদের বহিষ্কৃত বলে প্রচার বন্ধ করা হোক। মামলার নিষ্পত্তি না-হওয়া পর্যন্ত বর্তমান অবস্থা বজায় রাখা হোক।
আলিপুর আদালতের পর্যবেক্ষণ, বহিষ্কারের আগে শো কজ় নোটিসের উল্লেখ নেই। কোনও নির্দিষ্ট অভিযোগের উল্লেখ নেই। অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার জন্য কোনও শুনানি হয়েছে বলে প্রমাণ নেই। কোনও দলীয় তদন্তের নথিও নেই। বিচারক পর্যবেক্ষণে জানান, তৃণমূল বহিষ্কার করার আগে প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি মানেনি।
নির্দেশ ঘোষণা করতে গিয়ে আলিপুর পাঁচ নম্বর দেওয়ানি আদালতের বিচারক জানান, যদি সত্যিই কোনও শুনানি ছাড়াই বহিষ্কার করা হয়ে থাকে, তা হলে সেই সিদ্ধান্ত আইনি ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে। এ ছাড়া বহিষ্কারের ঘটনাপ্রবাহ সংক্রান্ত সময়কালও সন্দেহ তৈরি করেছে। কারণ, নথি নিয়ে আপত্তি তোলার পরপরই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। আদালত জানিয়েছে, বিধায়করা জন প্রতিনিধিত্বমূলক পদে রয়েছেন। তাঁদের বহিষ্কৃত বলে প্রচার চলতে থাকলে— রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, দলের মধ্যে অবস্থান ক্ষুণ্ণ হবে, জনসমক্ষে সুনাম নষ্ট হবে। এই ক্ষতি পরে পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়।
এ বারের বিধানসভা ভোটে ২৯৪টি আসনের মধ্যে তৃণমূল ৮০টি আসন জিতেছে। নিয়ম অনুযায়ী মোট বিধায়কের এক-দশমাংশ অর্থাৎ ৩০ জনের সমর্থন পেলেই বিরোধী দলনেতার আসন পাওয়া সম্ভব। তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলনেতা হিসাবে বালিগঞ্জের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করেন। ওই প্রস্তাব স্পিকার রথীন্দ্র বসুর কাছে পাঠান তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই প্রস্তাবের কয়েক দিন পরে স্পিকার তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়ক ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা হিসাবে নির্বাচিত করেন। স্পিকারের ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে গিয়েছিলেন শোভনদেব। কিন্তু স্পিকারের সিদ্ধান্তে স্থগিতাদেশের আর্জি খারিজ করে বৃহস্পতিবার হাই কোর্টের বিচারপতি কৃষ্ণ রাও জানিয়েছেন, আগামী ২৮ জুলাই এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে। ওই দিন সব পক্ষকে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি। এর পরেই বৃহস্পতিবার বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার ঘরের সামনে বসে ঋতব্রতের নামফলক।