মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।
দলনেত্রী যাই-ই বলুন, বিধানসভা ভোটের ফলাফল মেনে নিয়েছেন তৃণমূলের পরাজিত প্রার্থীরা! হাতেগোনা কয়েক জন ছাড়া আদালতে ভোটের ফল চ্যালেঞ্জ করলেন না অধিকাংশই। ভোট নিয়ে তৃণমূলের ১০টিও মামলা দায়ের হল না। কলকাতা হাই কোর্টের তথ্য বলছে, সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা ভোটের ফলকে চ্যালেঞ্জ করে তৃণমূলের মাত্র আটটি ইলেকশন পিটিশন দায়ের হয়েছে। তার মধ্যে একটি রয়েছে স্বয়ং তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। অর্থাৎ, নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও তৃণমূলের পরাজিতেরা হাল ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের ২০৩ জন পরাজিত প্রার্থী মামলা করতে কোর্টে যাননি। বিপুল আসনে জয়ী হয়ে ক্ষমতা দখল করলেও ছ’টি কেন্দ্রের নির্বাচনের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করেছে বিজেপি। সব মিলিয়ে হাই কোর্টে দুই দলের ১৪টি ইলেকশন পিটিশন দায়ের হয়েছে।
বিধানসভা ভোটে পাহাড়ের তিনটি আসন বাদ দিলে ২৯১ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল তৃণমূল। ৮০টি আসনে তারা জয়ী হয়। অর্থাৎ, ২১১ আসনের মধ্যে আটটি আসনের জন্য মামলা করেছেন তৃণমূল প্রার্থীরা। ভোটে ভরাডুবি মেনে নেননি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। তিনি বলেছিলেন, ‘‘১০০টিরও বেশি আসনে ভোট লুট হয়েছে। এই নির্বাচন কমিশন হল বিজেপি কমিশন। এটা কী ধরনের জয়! এটা ইমমরাল ভিক্ট্রি। মরাল ভিক্ট্রি নয়। পুরোটাই বেআইনি। জোর করে জিতেছে। লুট, লুট, লুট।’’ মমতা জানিয়েছিলেন, নির্বাচনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যাবেন। নিয়ম মোতাবেক, ফল ঘোষণার ৪৫ দিনের মধ্যে নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা করা যায়। গত শুক্রবার সেই সময়সীমা শেষ হয়েছে। ভোটে প্রার্থী হিসাবে যিনি হেরে গিয়েছেন তাঁকেই মামলা করতে হয়। তাঁর হয়ে দল বা অন্য কেউ মামলা করতে পারেন না। সব পরাজিত প্রার্থীই যে মামলা করবেন তেমন নয়। তবে মমতার ওই দাবির পরে তৃণমূলের পরাজিত প্রার্থীদের বড় অংশ নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ করবে বলে অনেকে মনে করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল মাত্র আট জন প্রার্থী মামলা করেছেন। মমতা ১০০ আসনে কারচুপির কথা বললেও, বাকি প্রার্থীরা কেন মামলা করতে এগিয়ে এলেন না? তৃণমূলের এক বিধায়ক বলেন, ‘‘দলনেত্রী মুখে যাই-ই বলুন, সেই অনুযায়ী কাজ করা যায় না। ইলেকশন পিটিশন করতে গেলে যথেষ্ট প্রমাণ থাকা দরকার। এত প্রার্থী কি প্রমাণ সংগ্রহ করে রেখেছেন? কিছু ক্ষেত্রে অনিয়ম থাকলেও, সর্বোপরি জনতা রায় মাথা পেতে নেওয়াই ভাল।’’ এই সময় দলকে পাশে পাওয়া যাবে না বলে মনে করছেন অনেক প্রার্থী।
তৃণমূলের নদিয়া জেলার এক পরাজিত প্রার্থীর কথায়, ‘‘দলনেত্রী ১০০ আসনে ভোট লুটের কথা বলেছেন। কিন্তু কোন কোন আসন তা স্পষ্ট করে জানাননি। যদি সত্যিই কারচুপি হয় তবে তাঁর উচিত ছিল ওই ১০০ জনকে একজোট করে মামলা করানোর। যত দূর জানি এমন কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তা ছাড়া বর্তমান অবস্থায় কেউ ব্যক্তিগত ভাবে মামলা করতে রাজি নন। কারণ, দল পাশে থাকবে না।’’ মামলা না করার কারণ হিসাবে, তৃণমূলের অন্দরে বিদ্রোহের বিষয়টি উঠে আসছে। আবার একাধিক প্রার্থী দলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছেন বলেও খবর।
বিধানসভা ভোটের ফল পর্যালোচনা করা দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৫০টি আসনে বিজেপি এবং তৃণমূলের ভোটের পার্থক্য খুবই কম। ৩০টি আসন এমন রয়েছে যেখানে ১০ হাজারেরও কম ভোটে পরাজিত হয়েছেন ঘাসফুলের প্রার্থীরা।
তৃণমূলের হয়ে প্রথম মামলাটি করেন পাণ্ডবেশ্বরের প্রার্থী নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। তিনি বিজেপি বিধায়ক জিতেন্দ্র তিওয়ারির কাছে ১৩৯৮ ভোটে হেরে যান। নরেন্দ্রনাথের বক্তব্য, কারচুপি না হলে ওই আসনে তিনিই জিততেন।
ভবানীপুর কেন্দ্রে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে যান মমতা। সেখানে ১৫,১০৫ ভোটে জয়ী হন বিজেপি প্রার্থী। তৃণমূলনেত্রীর অভিযোগ, তাঁকে গণনাকেন্দ্রের ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কেন্দ্রীয় বাহিনীর সাহায্যে একতরফা ভাবে বিজেপি গণনা করেছে। যদিও আগেই ওই অভিযোগ খারিজ করে দেয় নির্বাচন কমিশন। তারা জানায়, মমতা যে গণনাকেন্দ্রের ভিতরে ছিলেন, সিসিটিভি ফুটেজে তা দেখা গিয়েছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মামলাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ বিজেপি। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে নন্দীগ্রামে পরাজিত হয়েও মামলা করেছিলেন মমতা। ১৯৫৬ ভোটে শুভেন্দু কাছে তিনি হেরে যান। তখনও গণনায় কারচুপির অভিযোগ তুলেছিলেন মমতা। ওই মামলার ভবিষ্যৎ এখনও ঝুলেই রয়েছে। শুরুতেই সেই মামলার শুনানি মুখ থুবড়ে পড়ে। বিচারপতি কৌশিক চন্দের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে ওই মামলা থেকে সরে যাওয়ার পক্ষে সওয়াল করেন তৃণমূলনেত্রীর আইনজীবীরা। মামলা থেকে সরে গিয়েছিলেন বিচারপতি চন্দ। আদালত তৃণমূল প্রার্থীকে পাঁচ লক্ষ টাকা জরিমানা করেছিলেন।
মমতা, নরেন্দ্রনাথেরা পাশাপাশি, হাই কোর্টে ইলেকশন পিটিশন করেছেন গোপীবল্লভপুরের তৃণমূল প্রার্থী অজিত মাহাতো, বিনপুরের প্রার্থী প্রাক্তন মন্ত্রী বিরবাহা হাঁসদা, ঝাড়গ্রামের প্রার্থী মঙ্গল সোরেন এবং মানবাজারের প্রার্থী সন্ধ্যা রানি টুডু। বিজেপির কাছে ৩১৬ ভোটে হেরে যান রাজারহাট-নিউটাউনের তৃণমূল প্রার্থী তাপস চট্টোপাধ্যায়। তিনিও হাই কোর্টে মামলা করেছেন। পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুরের তৃণমূল প্রার্থী পীযূষকান্তি পন্ডাও মামলা করেছেন। অন্য দিকে, ৪০১ ভোটে হেরেও মামলা করতে রাজি হননি সাতগাছিয়ার তৃণমূল প্রার্থী সোমাশ্রী বেতাল। এ ছাড়া জাঙ্গিপাড়া থেকে ৮৬২ ভোটে পরাজিত স্নেহাশিস চক্রবর্তী, রায়নায় ৮৩৪ ভোটে পরাজিত মন্দিরা দোলুই, ১৬৫১ ভোটে পরাজিত কাশীপুর-বেলগাছিয়ার অতীন ঘোষেরা মামলা করেননি। তৃণমূল সূত্রে খবর, ভোটের ফল বেরোনোর পরে কারচুপির অভিযোগ তুলে অনেক পরাজিতকেই রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও)-এর দফতরে চিঠি লিখতে বলেছিলেন মমতা। সেই তালিকায় ছিলেন জাঙ্গিপাড়ার তৃণমূল প্রার্থী তথা প্রাক্তন মন্ত্রী স্নেহাশিসও। হাতেগোনা কয়েক জন সিইও দফতরে ই-মেইল করেছিলেন। স্নেহাশিস কোনও অভিযোগ করেননি। তিনি জানান, রাজনীতি থেকে সন্ন্যাস নেবেন।
তৃণমূলের পাশাপাশি, বিজেপির ছ’জন প্রার্থী ইলেকশন পিটিশন করেছেন। বর্ধমান উত্তরের বিজেপি প্রার্থী সঞ্জয় দাস, স্বরূপনগরের তারক সাহা, মধ্যমগ্রামের অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়, কুলতলির মাধবী হালদার, হাসনের নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সিতাই আসনের আশুতোষ বর্মা। এই সংক্রান্ত মামলার সঙ্গে যুক্ত আইনজীবীরা মনে করছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইলেকশন পিটিশনের কোনও সুরাহা হয় না। ভোট আসে ভোট যায় ওই মামলার নিষ্পত্তি সংখ্যা খুবই কম। ২০২১ সালেও মামলা দায়ের হয়েছিল। ওই বছরও বিধানসভা নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ করে আটটি মামলা দায়ের হয়। এখনও পর্যন্ত বেশিরভাগ মামলা বিচারাধীন রয়েছে।