Rise and Fall of Sebaashray Project

কোমরে দড়ি, কান ধরে ঘুরছেন জাহাঙ্গির, পার্টি অফিস খুলেছে সিপিএম! ডায়মন্ড হারবার জুড়ে এখন ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’

'মডেল' বলে যা মাথা তুলেছিল, তা ধসে পড়ল উল্কাগতিতে। তৃণমূল ক্ষমতা থেকে সরার পরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতাপ ভূলুণ্ঠিত। সমান্তরাল ভাবে ধসে পড়েছে তাঁর ডায়মন্ড হারবারের সাধের মডেল। কী ছিল, কী হল, কী ভাবে চলত এই ডায়মন্ড হারবার মডেল? সরেজমিনে অনুসন্ধান করল আনন্দবাজার ডট কম। আজ দ্বিতীয় তথা শেষ পর্ব।

Advertisement
শোভন চক্রবর্তী, ডায়মন্ড হারবার
শেষ আপডেট: ২২ জুন ২০২৬ ০৯:৫৯
Diamond Harbour model of Abhishek Banerjee collapsed just after the fall of TMC government: Part II

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

ডায়মন্ড হারবারের মহকুমাশাসকের দফতরের পাশের মাঠে এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে সেবাশ্রয় ক্যাম্পের বিশাল লোহার কাঠামো। রোদে-জলে মরচে পড়েছে তার গায়ে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডায়মন্ড হারবার মডেলের মতোই নিঃসঙ্গ, ভেঙে পড়ার অপেক্ষায়।

Advertisement

২০২৫-এর ২ জানুয়ারি নিজের লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রে ‘সেবাশ্রয়’ নামে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা শিবির চালু করেছিলেন অভিষেক। কেন?

২০২৪-এর লোকসভা ভোটে যাবতীয় পেশিশক্তি ব্যবহার করে ডায়মন্ড হারবারে রেকর্ড ভোটে জিতেছিলেন অভিষেক। ছাপিয়ে গিয়েছিলেন ২০০৪ সালে আরামবাগে অনিল বসুর সেই ‘কুখ্যাত’ ছয় লাখি মার্জিনকেও। অভিষেক বলেছিলেন, ‘‘৭ লক্ষ ১০ হাজার ৯৩০ ভোটে জয়ের পরে আমি তিন মাস ঘুমোতে পারিনি। শুধু ভেবেছি এই ঋণ কী ভাবে শোধ করব!’’ সেই ‘ঋণ শোধের’ প্রকল্পই হল ‘সেবাশ্রয়’। অভিষেক দাবি করেছিলেন, ‘‘এই যে প্রকল্প, তা এত দিন ভারতের কোনও লোকসভা বা বিধানসভায় হয়নি। এখনও পর্যন্ত এমন কর্মযজ্ঞ কেউ করেনি। এটাই প্রথম বার।’’ তৃণমূলের তরফে জানানো হয়েছিল, বিভিন্ন জায়গায় মোট ৭৫ দিনের শিবিরে প্রায় ১২ লক্ষ ৩৫ হাজার ৭৭৩ জনকে পরিষেবা দেওয়া হয়েছে। আর জি কর-পরবর্তী অধ্যায়ে রাজ্যের সরকারি চিকিৎসা পরিকাঠামো যখন প্রশ্নচিহ্নের মুখে, তখন অভিষেকের এই উদ্যোগকে সমান্তরাল প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবেই দেখা হয়েছিল। সরকারি চিকিৎসক থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য আধিকারিকদের তুলে নিয়ে গিয়ে ডায়মন্ড হারবার ভর্তি করে ফেলছিলেন অভিষেক। তৃণমূলের নিজস্ব নেটওয়ার্কে সমাজমাধ্যমে সেই কর্মসূচির প্রচার হয়েছিল প্রবল ঢক্কানিনাদ-সহকারে।

সরিষাহাটে বিজেপির মণ্ডল কার্যালয়ে মহিলাদের ভিড়।

সরিষাহাটে বিজেপির মণ্ডল কার্যালয়ে মহিলাদের ভিড়। —নিজস্ব চিত্র।

দ্বিতীয় দফায় সেবাশ্রয় শিবির শুরু হয়েছিল ২০২৫-এরই ডিসেম্বরে। জানুয়ারিতে শিবির বসেছিল এই মহকুমাশাসকের দফতরের মাঠে। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের মূল ভবনের আদলে তৈরি হয়েছিল সুবিশাল দোতলা শিবির। যে মাঠে বয়স্ক মানুষেরা সকাল-বিকেল হাঁটেন, কচিকাঁচারা খেলাধুলা করে, সেই মাঠের বড় অংশ এ ভাবে দখল হয়ে যাওয়ায় গুঞ্জন উঠেছিল। কিন্তু তখন আপত্তি জানানোর বুকের পাটা কার আছে! সেবাশ্রয়ের বিপুল খরচ কোথা থেকে আসছে, প্রশ্ন তুলেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছিলেন অভিষেক।

‘সেবাশ্রয়’ কর্মসূচিতে বহু গরিব মানুষ চিকিৎসা পেয়েছিলেন সন্দেহ নেই। কিন্তু সকলের অভিজ্ঞতাই যে এক, তা নয়। যেমন বিষ্ণুপুরের বাসিন্দা চিত্তরঞ্জন মান্না। তাঁর কথায়, ‘‘সাড়ে তিন বছরের অস়ুস্থ মেয়েকে নিয়ে গিয়েছিলাম। অভিষেক দেখা করে বলেছিলেন, সব ব্যবস্থা করে দেবেন। ছবি তুলে প্রচারও করেছিল তৃণমূল। কিন্তু কিচ্ছু হয়নি। কালীঘাটে রঙের দোকানের উপরে ওঁর বাড়ির অফিসে গিয়েছি, আমার স্ত্রী গিয়েছেন অন্তত ১৫ বার। পাত্তাই দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত সমাজমাধ্যমের প্রভাবীদের ধরে কিছু টাকা জোগাড় করতে পারি। একটা অপারেশনের পরে মেয়েটার ডান হাতটাই বাদ চলে গিয়েছে।’’

রাজ্যে পালাবদলের পরে ডায়মন্ড হারবারের দিগন্ত থেকে মুছে গিয়েছেন অভিষেকও! মে মাসের ৪ তারিখের আগে ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে যাওয়ার সময় বেহালা পেরোলেই মালুম হত, এ এক অন্য জগৎ। রাস্তার দু’ধারে অভিষেকের ছবি দেওয়া হোর্ডিং, কাটআউট, ফ্লেক্স, ব্যানার। তার এক একটায় অভিষেকের এক এক রকম উপাধি। কোথাও ‘সেনাপতি’, কোথাও ‘বস’, কোথাও ‘যুবরাজ’। সরকার বদলের পরে সে সব ভোজবাজির মতো এক লহমায় উধাও! জায়গায় জায়গায় নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ছবি-সহ হোর্ডিং আর বিজেপির ঝান্ডা জানান দিচ্ছে, জমানা বদলে গিয়েছে। ইতিউতি লাল ঝান্ডাও উড়ছে পতপত করে।

ডায়মন্ড হারবার এসডিও গ্রাউন্ডে সেবাশ্রয়ের জংধরা কাঠামো।

ডায়মন্ড হারবার এসডিও গ্রাউন্ডে সেবাশ্রয়ের জংধরা কাঠামো। —নিজস্ব চিত্র।

ফতেপুর মোড় থেকে মূল রাস্তা ছেড়ে বাঁ দিকে ফলতা যাওয়ার রাস্তায়, গত কয়েক বছর ধরে যার নাম অলিখিত ভাবে হয়ে গিয়েছিল ‘জাহাঙ্গির খান সরণি’, ঢুকেই সিপিএমের পার্টি অফিস। ভর দুপুরে সেখানে কর্মী পরিবেষ্টিত হয়ে বসে শম্ভুনাথ কুর্মি, ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে দ্বিতীয় হওয়া সিপিএম প্রার্থী। ‘‘ফলতার ছবি বদলে গিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও এই অফিস খুলে রাখা মুশকিল ছিল। এখন সে সব নেই। ভয় কেটে গিয়েছে।’’ বললেন শম্ভুনাথ।

ফলতার ‘ত্রাস’ হিসেবে নাম কেনা জাহাঙ্গিরের উত্থানের ইতিহাস চমকে দেওয়ার মতো। তাঁর বাবা আকবর খান ছিলেন ওস্তাগর। সেই পেশাতেই হাতেখড়ি হয়েছিল জাহাঙ্গিরের। তার পর জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পরিষদ জিতেছিল তৃণমূল। জাহাঙ্গির জিতেছিলেন গ্রাম পঞ্চায়েত আসনে। পাঁচ বছর পরের পঞ্চায়েত ভোটে গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান হন তিনি। ২০১৪ সালে অভিষেক ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ হওয়া ইস্তক রকেট গতিতে উত্থান হতে থাকে জাহাঙ্গিরের। ২০১৮ সালে ‘পদোন্নতি’ পেয়ে জাহাঙ্গির হন ফলতা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি। ফলতার বিধায়ক তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-ঘনিষ্ঠ তমোনাশ ঘোষ। অভিষেকের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে প্রবেশ করে জাহাঙ্গির তাঁকে কোণঠাসা করতে শুরু করেন। জাহাঙ্গির তাঁকে চড় মেরেছেন বলেও ঘনিষ্ঠ মহলে অভিযোগ করেছিলেন তমোনাশ।

কোভিডের সময়ে তমোনাশ মারা যান। ফলে ফলতায় জাহাঙ্গিরের সামনে সামান্য যেটুকু বাধা ছিল, সেটাও আর রইল না। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাঁরই লোক শঙ্কর নস্করকে ফলতায় প্রার্থী করেছিল তৃণমূল। ২০২৩ সালে পঞ্চায়েত ভোটের পরে জাহাঙ্গির হন দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলাপরিষদের পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ। সেই সঙ্গে ফলতা ও বজবজে তৃণমূলের সাংগঠনিক দায়িত্বে। জাহাঙ্গির তখন হাতে মাথা কাটেন।

ভোটের ফল প্রকাশের পরে তৃণমূল নেতাদের অত্যাচার, তোলাবাজি নিয়ে মুখ খুলে ছ’বছরের জন্য দল থেকে নিলম্বিত হয়েছেন ঋজু দত্ত। তাঁর কথায়, ‘‘ডায়মন্ড হারবার মডেল দাঁড়িয়ে ছিল ভয়ের উপর। যার নেপথ্যে ছিলেন জাহাঙ্গির খান ও তাঁদের মতো অনেকে। রাজ্যে পালাবদলের পরে ভয় সরে যেতেই মডেলও ভেঙে পড়েছে। এবং তা এতটাই দ্রুত যে, মডেলের রচয়িতার সাহসই হয়নি ফলতা উপনির্বাচনে প্রচারে যাওয়ার।’’

২৯ এপ্রিলের ভোটের আগে পুলিশ পর্যবেক্ষক, উত্তরপ্রদেশের ‘এনকাউন্টার স্পেশ্যালিস্ট’ অজয়পাল শর্মার গাড়ি ঘিরে বিক্ষোভ দেখিয়েছিল জাহাঙ্গির বাহিনী। উঠেছিল ‘জয় বাংলা’, ‘গো ব্যাক’ স্লোগান। নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ‘পুষ্পা’ জাহাঙ্গির স্বয়ং। জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘সিংহম’ অজয়ের হুঁশিয়ারির সামনে মাথা নত করবেন না। সেই জাহাঙ্গির এখন শুধু মাথাই ঝোঁকাচ্ছেন না, কোমরে দড়ি পরিয়ে তাঁকে ফলতার পথে পথে ঘোরাচ্ছে পুলিশ, আর জাহাঙ্গির বার বার কান ধরে স্থানীয়দের কাছে ক্ষমা চাইছেন।

শিরাখোল বাজারে চায়ের দোকানে দেখা হল পেশায় গৃহশিক্ষক সমর হালদারের সঙ্গে। সেই শিরাখোল, যেখানে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির তৎকালীন সভাপতি জেপি নড্ডার কনভয়ে হামলা হয়েছিল। মুকুল রায়ের হাতে আধলা ইট পড়ে এমন ফুলে গিয়েছিল যে, আংটি কেটে বার করতে বউবাজার থেকে গয়নার দোকানের কর্মচারীদের ছুটতে হয়েছিল তাঁর সল্টলেকের বাড়িতে। কাঠের বেঞ্চির ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে সমরবাবু বললেন, ‘‘আরে বসে কথা বলুন। এখন আর কেউ জিজ্ঞেস করতে আসবে না, কোথায় যাবেন, কী করতে এসেছেন!’’ বোঝা গেল, ভয় আউট, ভরসা ইন। সমরবাবুর সঙ্গী বছর ৬৫-র জিয়াদ মোল্লার কথায়, ‘‘অনেক দিন পর এ বার ভোট দিতে পেরেছি।’’ তৃণমূলের এই অবস্থা হল কেন? জিয়াদের জবাব, ‘‘আমরা তো ‘তিনোমূল’ করতাম। আমাদিগেই ভোট দিতে দিত না।’’

সরিষাহাটে ডায়মন্ড হারবার ২ নম্বর মণ্ডলের বিজেপি কার্যালয়ে বসে বছর ২৭-এর আনজিরা বিবি বললেন, ‘‘এটা আগে তৃণমূলের অফিস ছিল। ভোটের পর থেকে বিজেপির।’’ কয়েক হাজার বর্গফুটের অফিস। চলছে এক ডজন বাতানুকূল যন্ত্র। দেওয়ালে সাঁটা বিভিন্ন দেবদেবীর ‘ওয়ালপেপার’। ঠাঁই পেয়েছে গুহার ভিতর ধ্যানমগ্ন নরেন্দ্র মোদীর ছবিও। ল্যাপটপ নিয়ে বসে কাজ করছেন বিজেপি কর্মীরা। চলছে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে নাম নথিভুক্ত করার কাজ। ক্ষমতায় এসেই দখলদারিতে নেমে পড়েছে বিজেপি? মণ্ডল সভাপতি উত্তম বাগ বলছেন, ‘‘এটা বিজেপিরই অফিস। ২০২১ সালে তৃণমূল দখল করেছিল। এ বার ভোটের পরে আমরা খুলেছি। আমাদের নামেই মিটার আছে। ওদের জিনিসপত্র ওদের দিয়ে দিয়েছি।’’

গায়ের জোরে দখল করা দফতরই শুধু হাতছাড়া হয়নি, গত পনেরো বছরে তৈরি করা তৃণমূলের অফিসেও বাতি জ্বালানোর লোক নেই। এমনকি আমতলায় অভিষেকের সাংসদ কার্যালয়েও। সামনের তিনটি শাটারই বন্ধ। গলি দিয়ে ঢুকে পাশের কোলাপসিবল গেটেও তালা। ছাদে লাগানো অভিষেকের ছবিটি অক্ষত থাকলেও সামনের বোর্ড চুরমার। উপরের কালো কাচেও ইট-পাথর পড়ার ক্ষত। উল্টো দিকের অটো স্ট্যান্ডে দাঁড়ানো অটো চালকরা বললেন, ‘‘জমানা বদল গ্যয়া!’’

বাখরাহাট থেকে বজবজ, বজবজ থেকে মহেশতলা— গোটা ডায়মন্ড হারবারেই কষ্ট করে খুঁজতে হচ্ছে তৃণমূলকে। চড়িয়াল সেতু পেরিয়ে রাস্তার পাশে বজবজের বিধায়ক অশোক দেবের যে কার্যালয়। অশোক জিতেছেন, কিন্তু তাঁর বিধায়ক অফিস বন্ধ। দরজায় সাঁটা পোস্টার— ‘এখানে আর কোনও এমএলএ অফিস নেই’।

দেড় মাসেই শুকিয়ে গিয়েছে অভিষেকের ‘সাজানো বাগান’!
(শেষ)

Advertisement
আরও পড়ুন