WB Assembly Elections 2026

হিংসার স্মৃতি বুকে নিয়ে ভোটে নীরব ওঁরা

খেড়ুয়া লালবাবা আশ্রমের কাছে ২০০৯ সালের ১৫ জুন গুলিতে খুন হন ধান্যরুখী গ্রামের সিপিএম নেতা ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়। তার পরে রোষের আগুনে পুড়েছিল এলাকা।

জয়দীপ চক্রবর্তী
শেষ আপডেট: ০১ মে ২০২৬ ০৯:২৭

মঙ্গলকোট ও বুদবুদ: রাজনীতি করতে গিয়ে খেসারত দিতে হয়েছে তাঁদের। কেউ স্বজন হারিয়েছেন, কেউ সয়েছেন নির্যাতন। সে সময় পেরিয়ে এলেও, স্মৃতি এখনও তাড়া করে বেড়ায়। তাঁদের অনেকেরই আক্ষেপ, যে দলের হয়ে কাজ করতে গিয়ে এই পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে, তারা এখন আর তেমন যোগাযোগ রাখে না। তাই এই ভোটের তপ্ত আবহাওয়া থেকেও নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছেন তাঁরা।

বাম জমানার শেষ লগ্নে রাজনৈতিক হিংসায় তপ্ত হয়েছিল মঙ্গলকোট। ২০১০-এর শেষ দিকে খেড়ুয়া গ্রামে খুন হন পূর্ণিমা মাঝি। তাঁর ছেলে মাখন মাঝি তখন তৃণমূলের সক্রিয় কর্মী। অভিযোগ, তাঁকে খুন করতেই বাড়ির উঠোনে বোমা ছোড়া হয়। সেই আঘাতে মৃত্যু হয় পূর্ণিমার। ২০১১ সালের গোড়ায় নৃশংস ভাবে খুন করা হয় এলাকার আর এক তৃণমূল কর্মী দিলীপ ঘোষকে। দু’জনের পরিবারেরই দাবি, তাঁরা এখন আর রাজনীতিতে নেই। মাখনের আক্ষেপ, ‘‘দলের তরফে তেমন যোগাযোগ রাখা হয় না। চাকরির আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। দল ক্ষমতায় এলেও, তা আর মেলেনি। এখন চাষবাস করি। রাজনীতিতে আর নেই।’’

খেড়ুয়া লালবাবা আশ্রমের কাছে ২০০৯ সালের ১৫ জুন গুলিতে খুন হন ধান্যরুখী গ্রামের সিপিএম নেতা ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়। তার পরে রোষের আগুনে পুড়েছিল এলাকা। বাম-বিরোধীদের এলাকাছাড়া হতে হয়েছিল। তৃণমূলের রাজ্য নেতারা এসেও গ্রামে ঢুকতে পারেননি। মাসখানেক পরে গ্রামে ঢুকতে গেলে, তৎকালীন কংগ্রেস নেতা মানস ভুঁইয়াকে তাড়া খেয়ে খেতজমি ধরে দৌড়ে এলাকা ছাড়তে হয়েছিল। ফাল্গুনীর বাড়ি এখন তালাবন্ধ। পড়শিদের দাবি, তাঁর পরিবার আর রাজনীতিতে নেই। এখন এখানে থাকেনও না তাঁরা। মাঝে-মধ্যে আসেন। গ্রামের পঞ্চায়েত সদস্য বিপত্তারণ ঘোষ বলেন, ‘‘গ্রামে শান্তি রয়েছে। সবাই মিলেমিশে আছেন।’’

ফাল্গুনী খুনে বিকাশ চৌধুরী, দেবকুমার ধাড়া-সহ মঙ্গলকোটের তৎকালীন তৃণমূল নেতা-কর্মীদের অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ হয়। পরে তাঁরা বেকসুর খালাস হন আদালতে। দেবকুমার জানান, খুনের ঘটনার পরেই তাঁর বাড়িতে হামলা হয়। বাড়িঘর সব পুড়িয়ে দেওয়া হয়। শিশুকন্যা-সহ পরিবারকে নিয়ে রাতে অজয় পেরিয়ে বীরভূমে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। তাঁর দাবি, ‘‘ফাল্গুনীবাবুর মতো নেতাকে খুনের কথা ভাবার বুকের পাটাই আমাদের ছিল না। শুনেছিলাম, জেলা পরিষদের বিদ্যুৎ কর্মাধ্যক্ষ হিসাবে উনি বেআইনি ট্রান্সফর্মার কারবারিদের রোষে পড়েছিলেন। আফশোসের বিষয়, তাঁর প্রকৃত খুনিরা ধরা পড়ল না।’’ দেবকুমারের অভিযোগ, তখন সন্ত্রাসের শিকার হলেও, দল পরে আর মূল্য দেয়নি। এখন তিনি তৃণমূলে নিষ্ক্রিয়।

হিংসার স্মৃতি নিয়ে দিন কাটছে বুদবুদের দেবশালার বক্সী পরিবারেরও। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে দেবশালা পঞ্চায়েতের প্রধান শ্যামল বক্সীকে আউশগ্রামের গেঁড়াই থেকে মোটরবাইকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন তাঁর ছেলে, তৃণমূল নেতা চঞ্চল বক্সী। রাস্তায় গুলিতে খুন হন চঞ্চল। অভিযোগ ওঠে দলেরই একাংশের বিরুদ্ধে। ঘটনার পরে নিহতের বাড়িতে এসেছিলেন অনুব্রত মণ্ডল-সহ তৃণমূলের নেতারা। দু’জন ‘সুপারি কিলার’-সহ বেশ কয়েক জন গ্রেফতার হন। অভিযুক্তেরা এখন জামিনে মুক্ত। শ্যামল এখনও দলের পঞ্চায়েত সদস্য রয়েছেন। তবে তিনি জানান, দলের কাজকর্মে আর বিশেষ থাকেন না। ভোটের প্রচার থেকে অনেকটাই দূরে তিনি ও তাঁর পরিবার। তাঁর কথায়, ‘‘আউশগ্রামের বিদায়ী বিধায়ক অভেদানন্দ থান্দার (এ বার টিকিট পাননি) মাঝে মাঝে যোগাযোগ করতেন। এ ছাড়া, আর কারও সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নেই। ওই ঘটনার পরে আমাদের পরিবারের কাছে সবই অন্ধকার হয়ে গিয়েছে।’’

বাড়ির উঠোনে খাঁচার টিয়া দেখিয়ে শ্যামল বলেন, ‘‘হাতে করে ছোট্ট পাখিটাকে ঘরে এনেছিল চঞ্চল। রোজ আদর করে বাড়ি থেকে বেরোত।’’ চঞ্চল যখন মারা যান, তখন তাঁর ছেলের বয়স ১৭ দিন। বারান্দায় ছড়িয়ে থাকা খেলনার দিকে তাকিয়ে শ্যামলের আক্ষেপ, ‘‘নাতিটা বড় হচ্ছে। আশপাশের গ্রামের লোকও খুব ভালবাসে। শুধু চঞ্চলই দেখে গেল না!’’

পূর্ব বর্ধমান জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান তথা মঙ্গলকোটের প্রার্থী অপূর্ব চৌধুরী যদিও বলেন, ‘‘নিহত কর্মীদের পরিবারের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে। তাঁরা কেউ দলের বাইরে নেই।’’

আরও পড়ুন