শশাঙ্ক বিল। —ফাইল চিত্র।
বর্ধমান শহরের শশাঙ্ক বিলকে বাঁচাতে এ বার কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ। প্রায় ৩০০ বিঘার এই জলাভূমিকে বর্ধমান শহরের ‘কিডনি’ বলে অভিহিত করেছেন পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের জেলা সম্পাদক আশুতোষ পাল। তিনি বলেন, ‘‘এই জলাভূমি প্রাকৃতিক উপায়ে শহরের জলকে পরিষ্কার রাখার কাজ করে থাকে। কিন্তু সম্প্রতি ঐতিহ্যবাহী এবং প্রয়োজনীয় জলাভূমি ভরাট করে ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। এতে উদ্বিগ্ন পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ।’’
২০২৪ সালেও শশাঙ্ক বিল ভরাটের চেষ্টা করা হয়েছিল। সে বারও বিজ্ঞান মঞ্চের পক্ষ থেকে জেলাশাসকের দ্বারস্থ হয়ে সেই কাজ বন্ধ করা হয়। কিন্তু সম্প্রতি আবার ভরাটের কাজ শুরু হয়েছে। এ বারেও জেলাশাসকের কাছে গিয়ে ওই কাজ বন্ধ করার আবেদন জানিয়েছেন আশুতোষেরা। তাঁদের অভিযোগ, তলায় তলায় জলাভূমির চরিত্র পরিবর্তন এবং ‘প্ল্যান স্যাংশন’ সংক্রান্ত নথিপত্র তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তন কতখানি যুক্তিযুক্ত এবং বৈধ তা খতিয়ে দেখতে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে হাই কোর্টে মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিজ্ঞান মঞ্চের জেলা সম্পাদকের মতে, শশাঙ্ক বিলে নলখাগড়ার জঙ্গল রয়েছে। পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনা সেখানে। এখানকার জল স্বচ্ছ এবং নির্মল। এ হেন প্রাকৃতিক সম্পদকে ধ্বংস করে আবাসন গড়ে তোলার বিরোধিতা করা হচ্ছে।
শুধু বর্ধমানই নয়, নদীদূষণ প্রতিরোধ, কালনায় গঙ্গা এবং খড়ি নদীর দূষণ প্রতিরোধে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে তারা।
সাংবাদিক বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ। —নিজস্ব চিত্র।
বিজ্ঞানকর্মী অমিতাভ ঘোষের অভিযোগ, আদালতে অসত্য বলে শশাঙ্ক বিলের চরিত্র পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রয়োজনে ডিভিশন বেঞ্চেও যাবেন বিজ্ঞান মঞ্চ। এ নিয়ে রাজ্যের নয়া মন্ত্রী তথা বর্ধমান দক্ষিণের বিধায়ক মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্র বলেন, ‘‘আমার কাছে অভিযোগ এসেছিল। আমি কাজ বন্ধ রাখতে বলেছি।’’ তিনি জানান, সব দিক খতিয়ে দেখা হবে। শশাঙ্ক বিলের পাড়ে নির্মাণ হচ্ছে না বিলের জায়গা বুজিয়ে বহুতল তৈরি করা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখে তার পর সিদ্ধান্ত হবে।
বর্ধমান শহরের আনন্দপল্লি, শ্রীপল্লি, জিটি রোড এবং ২ নম্বর ইছলাবাদের এলাকা জুড়ে বিস্তৃত প্রায় ৩০০ বিঘা জলাশয় বোজানোর কাজ গত দু’সপ্তাহ ধরেই চলছিল বলে দাবি স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশপ্রেমীদের। সপ্তাহ খানেক আগে বিষয়টি জানতে পেরে বিএলআরও দফতরের আধিকারিক এবং পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থলে যান। তাঁরা অভিযোগ করেন, প্রমোটারের লোকজন তাঁদের বাধা দেন। পরে পুলিশ-প্রশাসনের সহায়তায় বিএলআরও আধিকারিক প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিয়ে এলাকায় প্রবেশ করে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন।
ব্রিটিশ আমল থেকে পরিচিত শশাঙ্ক বিল বর্ধমান শহরের প্রাকৃতিক জলধারণ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাঁকা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত এই বিশাল জলাভূমি বর্ষাকালে অতিরিক্ত জল ধারণ করে শহরকে বন্যা ও জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা করে। তবে এই জলাভূমিকে ঘিরে বিতর্কও নতুন নয়। ২০১৪ সালে বর্ধমান পুরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান স্বরূপ দত্ত অভিযোগ করেছিলেন যে, তাঁর সই জাল করে বিভিন্ন সরকারি দফতরে ‘নো অবজেকশন’ সংক্রান্ত নথি জমা দিয়ে জমির চরিত্র পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেই ঘটনায় থানায় অভিযোগ দায়ের হলেও তদন্তের অগ্রগতি প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, জলাভূমির চরিত্র পরিবর্তন করে আবাসন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে সেখানে।