নতুনগ্রামের কাঠের পুতুল। নিজস্ব চিত্র।
ছিমছাম ঘর হোক বা ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাটের ডায়েনিং স্পেস, পূর্বস্থলীর নতুনগ্রামের ছোট্ট কাঠের পুতুল রাখলে ঘরের শোভাই বদলে যায়। এ বার সেই শিল্পকর্ম আদায় করে নিল স্বীকৃতি। দেশ-বিদেশে সমাদৃত পূর্বস্থলী ২ ব্লকের নতুনগ্রামে তৈরি কাঠের পুতুল এ বার জিআই (জিওগ্রাফিক্যাল আইডেন্টিফিকেশন) তকমা অর্জন করেছে। জেলা প্রশাসনের এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘নতুনগ্রামের কাঠের পুতুল জিআই তকমা পেয়েছে। এই সংক্রান্ত একটি শংসাপত্র আমাদের হাতে এসেছে। এ বার এই শিল্পকর্মের বাজার আরও বাড়বে।’’ খুশি শিল্পীরাও।
দক্ষিণ দামোদরের সীতাভোগ-মিহিদানা, পূর্বস্থলীর তাঁতের জামদানি শাড়ি আগেই জিআই তকমা পেয়েছে। কোনও পণ্য এই মর্যাদা পাবে কি না তা ঠিক করে কেন্দ্রের ‘ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অব ইন্ডিয়ার’ অন্তর্গত সংস্থা ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন রেজিস্ট্রি’। ব্যান্ডেল-কাটোয়া লাইনের পাটুলি স্টেশনে নেমে কিছুটা পথ হাঁটলেই পড়বে নতুনগ্রাম, যাকে সবাই পুতুলের গ্রাম নামে ডাকেন। গ্রামে গেলে দেখা যাবে, অনেকের বাড়ির বারন্দা, উঠোন-সহ নানা জায়গায় রেখেছেন নানা আকার ও ছাঁচের কাঠের পুতুল। অনেকে আবার খরিদ্দার টানতে পুতুল সাজিয়ে রাখেন বাড়ির সামনেও। এই গ্রামে তৈরি পুতুলগুলির মধ্যে বেশি সমাদৃত কাঠের পেঁচা।
শিল্পীরা জানিয়েছেন, কলকাতায় হস্তশিল্প মেলা, দিল্লিতে প্রগতি ময়দানের মেলা-সহ সারা বছর অজস্র মেলায় তাঁরা কাঠের পুতুল বিক্রি করেন। অনেকে অনলাইনে বরাত দেন। ভাল আয়ও হয়। দুর্গাপুজোয় রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে কাঠের পুতুল দিয়ে মণ্ডপ সাজানো হয়। সেই কাজে ডাক পান নতুনগ্রামের শিল্পীরা। তাঁদের তৈরি কাঠের ছোট ছোট রথের চাহিদা রয়েছে পুরীতেও। পাশেই কাটোয়ার অগ্রদ্বীপেও বাস করেন পুতুলের কারিগরেরা।
১৯৬৬-এ কাঠ দিয়ে দশ মাথার রাবণের পুতুল তৈরি করে রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার পেয়েছিলেন নতুনগ্রামেরই শম্ভুনাথ ভাস্কর। তার পরে নতুনগ্রামের নাম দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। তাঁর ছেলে দিলীপ ভাস্কর বলেন, ‘‘দারুণ খবর। জিআই তকমা পেলে কী ধরনের লোগো হবে তা-ও ঠিক করা হয়েছে। আশা করছি দেশ-বিদেশে গ্রামের পুতুলের চাহিদা আরও বাড়বে।’’ তিনি জানান, প্রথমে গাছের ডাল কেটে পুতুল তৈরি হত। পরে যন্ত্রে কাঠ চিরে পুতুল বানানো শুরু করেন শিল্পীরা। তাতে পুতুলের আকার ও সৌন্দর্য, উভয়ই বেড়েছে। বাড়ি, সরকারি, বেসরকারি কার্যালয়-সহ অজস্র প্রতিষ্ঠানে শোভা পায় নতুনগ্রামের পুতুল। তবে এই কাজে শিল্পীদের আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। শিল্পীদের দাবি, তাঁদের তৈরি কাঠের পুতুলের নকশা নকল করে বেশ কিছু এলাকায় পুতুল তৈরি করা হচ্ছিল। তাঁরা প্রতিবাদ করলে জেলা প্রশাসনের কর্তারা পদক্ষেপের আশ্বাস দেন। ২০২২-এ জেলা প্রশাসন নতুনগ্রামের কাঠের পুতুলের জন্য জিআই স্বীকৃতি আদায়ে উদ্যোগী হয়। পূর্বস্থলী ২ ব্লকের এই গ্রাম নিয়ে বই প্রকাশ করতে চলেছেন কালনা শহরের পুলক মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘‘নতুনগ্রামের ইতিহাস দু’শো বছরের বেশি পুরানো। বইয়ে শিল্পীদের কাজের ধরণ-সহ নানা বিষয় তুলে ধরেছি।’’
পূর্বস্থলী উত্তরের বিজেপি বিধায়ক গোপাল চট্টোপাধ্যায় জানান, জিআই তকমা মেলায় নতুনগ্রামের শিল্পীদের তৈরি কাঠের পুতুল আরও জনপ্রিয় হবে। পরিকাঠামো নিয়ে সমস্যা থাকলে সরকার শিল্পীদের পাশে থাকবে।