Bengali researcher Shubham Banerjee and Donald Trump

ক্লিন্টন যুগে চেষ্টা শুরু, বাঙালি তরুণের নেতৃত্বে ট্রাম্প আমলে এল সাফল্য! ‘লালকাঠ’ রক্ষায় ২৮ বছর পর দিশা আমেরিকায়

১৯৯৮ সাল থেকে আমেরিকার সরকার চেষ্টা করছিল উপগ্রহের মাধ্যমে ম্যাপিং করে লালকাঠের জঙ্গল নিয়ে প্রকৃত তথ্য পেতে। প্রথম বার ২০১০ সালে পদক্ষেপ করে তারা। কিন্তু উদ্দেশ্য সাধিত হয়নি।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:০৫
Shubham Banerjee

শুভম বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।

৩৩ বছর কাটল না। তার আগেই কথা রাখা গেল ২৮ বছরের মাথায়। কথা দেওয়া হয়েছিল হোয়াইট হাউসকে। এর আগে কথা দিয়েও কথা রাখা যায়নি। কিন্তু এ বার গেল। ২৮ বছর পরে। কথা রাখার নেতৃত্ব দিলেন এক বাঙালি তরুণ।

Advertisement

প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলবর্তী অঞ্চলে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কলোরাডো বা অরেগন জুড়ে রয়েছে লালকাঠের জঙ্গল। যার পোশাকি নাম ‘কোস্ট রেডউড’। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের চেয়ারে তখন বিল ক্লিন্টন। ১৯৯৮ সাল থেকে আমেরিকার সরকার চেষ্টা করছিল, উপগ্রহের মাধ্যমে ‘ম্যাপিং’ করে লালকাঠের জঙ্গল নিয়ে প্রকৃত তথ্য পেতে। প্রথম বার ২০১০ সালে পদক্ষেপ করে তারা। কিন্তু উদ্দেশ্য সাধিত হয়নি। ২০১৬ সালের পরিকল্পনায় ফের ধাক্কা। অবশেষে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এসে ষোলকলা পূর্ণ হল। ১৭ মাস ধরে চলা গবেষণার তথ্যপঞ্জি গ্রহণ করল মার্কিন প্রশাসন। তার পরে তা আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশিতও হল ব্রিটেনের জার্নালে। আর গোটা গবেষণার নেতৃত্ব দিলেন শুভম বন্দ্যোপাধ্যায়। যাঁর বাড়ি হুগলির চণ্ডীতলা থানা এলাকার বাকসায়। পড়াশোনা বাংলা মাধ্যমে।

শুভমদের গবেষণা শুরু হয়েছিল জো বাইডেনের শাসনকালে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দেয় শুভমের নেতৃত্বাধীন গবেষকদের দলটি। ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে আরও খুঁটিনাটি তথ্য সংযোজনের কাজ। সম্প্রতি গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে। তবে গোপন রাখা হয়েছে বহু তথ্য। কেন গোপন? শুভমের কথায়, ‘‘সার্বিক ধারণা পাওয়ার জন্য প্রকাশিত গবেষণাপত্রে যা যা থাকা দরকার, সেগুলোই রয়েছে। কিন্তু আমেরিকার সরকার যে কারণে এই তথ্যপঞ্জি পেতে উদ্‌গ্রীব ছিল, সেই নির্দিষ্ট তথ্য জনসমক্ষে আনা হয়নি।’’ কারণ কী? শুভমের বক্তব্য, মার্কিন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য লালকাঠের বৃক্ষচ্ছেদন রুখে দেওয়া। পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য প্রকাশিত হলে তা ধাক্কা খাবে। উপমা দিয়ে শুভম বলেন, ‘‘ওখানেও তো বীরাপ্পনেরা রয়েছে। যারা লালকাঠ পাচার করে দেয় মেক্সিকোতে।’’ লালকাঠ মহার্ঘ। তার বাণিজ্যিকমূল্য বিপুল। তা রক্ষা করতে আমেরিকার মাথাব্যথার শেষ ছিল না।

Shubham Banerjee

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বৃত্ত সম্পূর্ণ হল বাঙালি গবেষক শুভম বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ছবি: সংগৃহীত।

২০২৪ সাল থেকে দফায় দফায় জঙ্গলে ঘুরে লালকাঠের জরিপ করেছিলেন শুভমেরা। প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে ১২টি জঙ্গলে নমুনা সংগ্রহ করতে গিয়ে শুভমেরা খোঁজ পেয়েছেন এমন কয়েকটি লালকাঠের, যে গাছগুলির বয়স আনুমানিক ২০০০ বছর বা তারও বেশি। শুভম ছিলেন ওই গবেষণা প্রকল্পের মুখ্য ভূমিকায়। তাঁর সহযোগী ছিলেন দুই মার্কিন তরুণ এমিলি ফ্রান্সিস এবং কলিন।

ভারতে এই ধরনের গবেষণার সুযোগ কি রয়েছে? শুভমের বক্তব্য, রয়েছে। কিন্তু হচ্ছে না। তাঁর কথায়, ‘‘শাল, সেগুন, মেহগনির ম্যাপিং খুব সামান্য থাকলেও সার্বিক ভাবে নেই। সিঙ্গালিলা, নেওড়াভ্যালির মতো জায়গাগুলিতে রডডেনড্রন নিয়েও ম্যাপিংয়ের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এখনও সে ভাবে কোনও কাজ হয়নি।’’

শুভম মাধ্যমিক পাশ বাকসা বিএন বিদ্যালয় থেকে। জনাই ট্রেনিং হাই স্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক। তার পরে উত্তরপাড়া রাজা প্যারীমোহন কলেজ থেকে প্রাণিবিদ্যায় অনার্স এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে এমএসসি পাশ করেন তিনি। কলকাতাস্থিত ভারতীয় বিজ্ঞান শিক্ষা এবং গবেষণা (আইআইএসইআর) থেকে পিএইচডি করেন। সেখানে বিষয় ছিল তরাই তৃণভূমির গাণিতিক মডেল তৈরি। ভারতীয় উপমহাদেশের তরাই বনাঞ্চলে গত কয়েক দশকের প্রাকৃতিক পরিবর্তনকে স্যাটেলাইট ছবি ও গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছেন শুভম। তার পর বাতলেছেন ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা। আপাতত হুগলির বাড়িতেই রয়েছেন তিনি। পরবর্তী গন্তব্য? ফের সেই প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল অঞ্চল। লালকাঠ রক্ষার স্বার্থে এ বার কুয়াশার ম্যাপিং করাতে চায় মার্কিন প্রশাসন। সেই কাজের লক্ষ্যে ফেব্রুয়ারির শেষে ফের আমেরিকা যাবেন শুভম। আপাতত তারই প্রস্তুতি চলছে চণ্ডীতলার বাসকায় বসে।

Advertisement
আরও পড়ুন