মঙ্গলবার দুর্গাপুরে রাজ্য বিজেপির কোর কমিটির সঙ্গে হল দলের সর্বভারতীয় সভাপতির বৈঠক। — নিজস্ব চিত্র।
বৃহত্তর নির্বাচনী প্রচারাভিযান শুরুর আগে শেষ বারের মতো সংগঠনের নীচের স্তরে শক্তি সংহত করার বার্তা। তার জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাও। দুর্গাপুরে রাজ্য বিজেপির কোর কমিটির সঙ্গে দলের সর্বভারতীয় সভাপতির বৈঠকে মূল আলোচ্য হয়ে উঠল ‘বুথ স্তরের সমন্বয়’। সঙ্গে কথা হল জেলা স্তরের সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিজেপি যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে, সেই প্রক্রিয়ার ‘পুনর্মূল্যায়ন’ নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে বিজেপি সূত্রে জানা যাচ্ছে।
দু’দিনের সফরে পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন বিজেপির নতুন সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন। সভাপতি পদে বসার পরে এই প্রথম কোনও রাজ্য সফরে তিনি। এবং প্রথম সফরই পশ্চিমবঙ্গে। বিজেপি সূত্রের দাবি, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনকে বিজেপির সর্বভারতীয় নেতৃত্ব কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন, নিতিনের এই সফরই তার প্রমাণ। রাজ্য বিজেপির কোর কমিটির সঙ্গে মঙ্গলবার রাতে নিতিন যে বৈঠক করেছেন, তার আলোচ্যসূচিও পুরোপুরি নির্বাচনকেন্দ্রিকই ছিল।
প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে নিতিন বিশদে আলোচনা করেছেন বলে বিজেপি সূত্রে জানা যাচ্ছে। ‘যোগ্য’ প্রার্থীদের নাম খুঁজে বার করতে রাজ্য জুড়ে বিজেপি ইতিমধ্যেই অন্তত তিনটি সমীক্ষা করিয়েছে। ২৯৪টি বিধানসভা আসনেই সেই সমীক্ষা করানো হয়েছে। তাতে বিভিন্ন আসন থেকে একাধিক প্রার্থীর নাম উঠে এসেছে। সমীক্ষায় উঠে আসা নামগুলির মধ্যে থেকেই মূলত প্রার্থী বাছাই হবে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে যে ৬৫টি আসন বিজেপির হাতে রয়েছে, সেগুলির প্রতিটিতেই যে বর্তমান বিধায়কেরাই টিকিট পাবেন, এমন নিশ্চয়তাও নেই। কিছু বিধায়ক এ বার টিকিট না-ও পেতে পারেন বলে রাজ্য বিজেপির অন্দরে জোরদার গুঞ্জন রয়েছে। নিতিন দুর্গাপুরের বৈঠকে সেই বাছাই প্রক্রিয়ারই ‘পুনর্মূল্যায়ন’ করেছেন বলে বিজেপি সূত্রের দাবি। প্রার্থী বাছাই সংক্রান্ত সমীক্ষার ক্ষেত্রে মাপকাঠি কী হয়েছে, বর্তমান বিধায়কদের আবার টিকিট দেওয়া বা না-দেওয়ার প্রশ্নে কোন কোন বিষয় মাথায় রাখা হয়েছে, সে সব নিয়ে বিজেপি সভাপতি আলোচনা করেছেন। যে প্রক্রিয়ায় ‘মূল্যায়ন’ হয়েছে, তা উপযুক্ত কি না, সে বিষয়ে তিনি রাজ্য নেতৃত্বের মতামত নিয়েছেন বলে খবর।
নিতিনের বৈঠকে হাজির ছিলেন দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, তিন প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার, দিলীপ ঘোষ, রাহুল সিংহ। ছিলেন দুই সংগঠন সম্পাদক এবং পাঁচ সাধারণ সম্পাদক। ছিলেন কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক সুনীল বনসল, মঙ্গল পাণ্ডে, অমিত মালবীয়ও। বৈঠকে আলোচিত বিষয় নিয়ে কেউই বাইরে মুখ খোলেননি। তবে বিজেপি সূত্রে জানা গিয়েছে যে, বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে পুরোদস্তুর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে বুথ স্তরে ‘সমন্বয় বৃদ্ধি’র বার্তা দিয়েছেন দলের নতুন সর্বভারতীয় সভাপতি। গত ডিসেম্বর থেকে মণ্ডল স্তরে পথসভার মধ্যে দিয়ে বিজেপি আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রচার শুরু করে দিয়েছিল। ডিসেম্বর-জানুয়ারি মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও তিনটি জনসভা করেছেন পশ্চিমবঙ্গে। সে সবের পাশাপাশি শমীক, শুভেন্দু, সুকান্তদের মতো প্রথম সারির রাজ্য নেতারা পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রান্তে ঘুরে ঘুরে ‘পরিবর্তন সঙ্কল্প সভা’ শুরু করেছেন। ফেব্রুয়ারি মাসে মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরুর আগেই সেই পর্বও বিজেপি শেষ করে ফেলবে। কারণ তার পরে প্রায় এক মাস ধরে মাইক বাজিয়ে প্রচার করা যাবে না। তাই মার্চ থেকে শুরু হবে বিজেপির বৃহত্তর প্রচারাভিযান। তার আগে হাতে যতটুকু সময় রয়েছে, তাকে বুথ স্তরের ‘সমন্বয় বৃদ্ধি’র কাজে লাগানোর নির্দেশ দিয়েছেন বিজেপির নতুন সভাপতি।
২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত রাজ্য বিজেপিতে সদস্য সংগ্রহ এবং সংগঠন পর্ব চলছিল। তার পরে ‘বুথ সশক্তিকরণ অভিযান’ করে আরও মাস চারেক ধরে সংগঠনের নীচের তলাকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে বিজেপি। এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিএলএ-২ নিয়োগের ক্ষেত্রে বিজেপির তরফ থেকেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নামের তালিকা নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু খাতায়কলমে ৬০-৬৫ হাজার বুথে কমিটি গঠন বা ভোট করানোর মতো লোকবল তৈরি রয়েছে বলে রাজ্য নেতৃত্ব দাবি করলেও, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রতিটি ধাপে তা খতিয়ে দেখার কাজ চালিয়ে গিয়েছেন। অমিত শাহ থেকে বনসল, বার বার বুথ স্তরে শক্তিবৃদ্ধিতে জোর দিয়েছেন। নতুন সভাপতিও পশ্চিমবঙ্গে প্রথম সফরে এসেই বুথ মজবুত করার উপরেই সবচেয়ে জোর দিলেন। বুথে বুথে বিজেপির লোকজন থাকলেও তাঁদের মধ্যে সমন্বয় কতটা, সে বিষয়ে নজর দিতে বলেছেন নিতিন। বুথ স্তরে যাঁরা বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকে নিজের নিজের দায়িত্ব ঠিক মতো পালন করছেন কি না? মাঠে-ময়দানে সকলে ঘুরছেন কি না? নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া বহাল রেখে প্রত্যেকে কাজ করছেন কি না? আগামী এক মাসে সে সব খতিয়ে দেখতে রাজ্য বিজেপি-কে নিতিন নির্দেশ দিয়েছেন বলে খবর।
জেলা ধরে ধরে নিতিন সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির খতিয়ান নিয়েছেন বলে বিজেপি সূত্রের দাবি। নির্বাচনের সময়ে জেলা কমিটিগুলিকে যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে, সে বার্তাও দিয়েছেন। তাই জেলাস্তরের সাংগঠনিক কাঠামোয় কোথাও কোনও খামতি রয়ে গেলে অবিলম্বে তা নিরসনের নির্দেশ দিয়েছেন।