অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।
বিধায়কদের সই জাল কাণ্ডে কলকাতা হাই কোর্টে স্বস্তি পেলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর রক্ষাকবচের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হল। বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ জানিয়েছেন, ১৭ জুলাই পর্যন্ত রক্ষাকবচ থাকবে সাংসদের। তবে তদন্তে সহযোগিতার নির্দেশ কিন্তু বহালই থাকছে।
শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা নির্বাচিত করে বিধানসভায় তৃণমূলের পরিষদীয় দলের তরফে যে চিঠি দেওয়া হয়েছিল, তাতে কয়েক জন বিধায়কের সইতে ‘অসঙ্গতি’ পাওয়া গিয়েছে বলে অভিযোগ। সেই তদন্তভার রাজ্য সরকার তুলে দিয়েছে সিআইডি-র হাতে। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসাবে ওই চিঠিতে অভিষেকের স্বাক্ষর ছিল। যে বৈঠকে বিধায়কদের সই সংগ্রহ করা হয়েছিল, সেটা হয়েছিল কালীঘাটে তৃণমূলনেত্রী মমতার বাড়ি সংলগ্ন দলীয় কার্যালয়ে। তদন্তকারীরা মমতার বাড়ি লাগোয়া ওই কার্যালয়ে যান। সই-কাণ্ডের তদন্তের সূত্র ধরে গত ৩০ মে প্রথম অভিষেকের কালীঘাটের বাড়িতে যায় সিআইডি।
অভিষেককে সই জাল কাণ্ডে ভবানী ভবনে হাজিরা দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি নির্দিষ্ট সময়ে হাজিরা দেননি। সূত্রের খবর, তিনি তদন্তকারী সংস্থার কাছে সময় চেয়েছিলেন। তার পরে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন। রক্ষাকবচের আবেদন জানান। বিচারপতি কৌশিক চন্দের বেঞ্চে সেই আবেদনের শুনানি হয়।
তার আগে সই জাল কাণ্ডে অভিষেকের রক্ষাকবচ সংক্রান্ত মামলার দ্রুত শুনানির আর্জি খারিজ করে দিয়েছিল হাই কোর্টের বিচারপতি চৈতালী চট্টোপাধ্যায় দাসের বেঞ্চ। বলা হয়, ১০ জুন অভিষেকের মামলার শুনানি হবে। কিন্তু ওই দিন শুনানির তালিকায় মামলাটির উল্লেখ ছিল না। সে কারণে দ্রুত শুনানির আর্জি জানান কল্যাণ। তার পরের দিন, ১১ জুন মামলাটি শুনবেন বলে জানিয়েছিলেন বিচারপতি চন্দ। পরের দিন বিচারপতির রায়ে স্বস্তি পান অভিষেক। বিচারপতি জানান, পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত অভিষেকের বিরুদ্ধে সিআইডি কোনও কঠোর পদক্ষেপ করতে পারবে না। আদালত জানিয়েছিল, তদন্তকারী সংস্থার সঙ্গে তাঁকে সহযোগিতা করতে হবে। ওই দিনই অভিষেককে সিআইডির দফতরে হাজিরা দেওয়ারও নির্দেশ দেয় হাই কোর্ট। কিন্তু তখন তিনি দিল্লিতে ছিলেন। আদালতের নির্দেশ পেয়ে সন্ধ্যার মধ্যে কলকাতা ফিরে ভবানী ভবনে যান তিনি।
তবে ওই দিন হাই কোর্টের শুনানিতে নাটকীয় এক ঘটনা ঘটে। অভিষেকের বিরুদ্ধে ‘ঔদ্ধত্যের’ অভিযোগ এনে শুনানির আগে রক্ষাকবচ মামলা থেকে সরে দাঁড়ান কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে তাঁর বিস্ফোরক মন্তব্য, ‘‘ওর জন্যই দলটা শেষ হয়ে গিয়েছে!’’ ওই মামলায় অভিষেকের হয়ে আদালতে সওয়াল করেন অয়ন ভট্টাচার্য। শুধু কল্যাণ নন, কল্যাণের ছেলে শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অন্য জুনিয়র আইনজীবীরাও মামলা থেকে সরে দাঁড়ান। যদিও দু’দিন পরে অভিষেককে ‘সন্তানসম’ বলেন কল্যাণ। অভিষেকও জানান, কল্যাণের অধিকার আছে তাঁকে চারটে ‘কটু’ কথা বলার।
কী এই সই-কাণ্ড?
বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা, উপদলনেতা এবং মুখ্যসচেতক কে হবেন, এ নিয়ে পরিষদীয় নিয়মের জটিলতায় পড়তে হয়েছে প্রাক্তন শাসকদলকে। ৪ মে ভোটের ফলঘোষণার পরে ৬ মে মমতা কালীঘাটের বাড়িতে জয়ী বিধায়কদের বৈঠকে ডেকেছিলেন। সে দিনই দলের প্রস্তাবে বিধায়কেরা হাত তুলে সায় দেন, পরিষদীয় দলের নেতা, উপ দলনেতা এবং মুখ্যসচেতক কে হবেন, তা ঠিক করুন দলনেত্রী মমতা। তার পর শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় ও অসীমা পাত্রকে উপদলনেতা এবং ফিরহাদ হাকিমকে মুখ্যসচেতক করার কথা জানানো হয় তৃণমূলের তরফে। সেই মর্মে দলের তরফে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠানো হয় বিধানসভায়। কিন্তু তা গৃহীত হয়নি।
তার কারণ, পরিষদীয়দলের নেতা বা অন্য পদাধিকারীর নির্বাচন পরিষদীয়দলের বৈঠকেই করতে হয়। তৃণমূলের ক্ষেত্রে তা হয়নি বলে অভিযোগ। ৬ মে বৈঠক থেকে বেরিয়ে একাধিক বিধায়ক সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, পরিষদীয় দলের নেতা বা অন্যান্য পদাধিকারী কে হবেন, তা ঠিক করার ভার দেওয়া হয়েছে মমতাকে। বিধানসভা অভিষেকের চিঠি প্রত্যাখ্যান করলে ১৯ মে কালীঘাটে ফের যে বৈঠক হয়, সেখানে পরিষদীয় দলের সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর করানো হয় বিধায়কদের। একাধিক বিধায়ক জানিয়েছিলেন, সেই সই তাঁদের করানো হয়েছিল ৬ মে তারিখের কার্যবিবরণীতে। এখানেই মূল জটিলতা তৈরি হয় বলে খবর।