Md Salim Humayun Kabir

কবীর বৈঠকের পর দলের মধ্যে কাঠগড়ায় সেলিম! সিপিএমের দুই বাহিনী তর্ক-সংঘাতে, উঠছে জনসঙ্ঘ-ঘনিষ্ঠতার অতীতও

বুধবার রাত থেকেই সিপিএমের কর্মী-সমর্থকেরা হুমায়ুন-সেলিমের বৈঠক নিয়ে সমাজমাধ্যমে সরব হতে শুরু করেছিলেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তা আরও গতি পায়।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:২২
Controversy within CPM over MD Salim  meeting with Humayun Kabir

(বাঁ দিকে) হুমায়ুন কবীর, মহম্মদ সেলিম (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।

তিন দশক আগে ১৯৯৬ সালে জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রিত্বে যেতে না-দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্কে আলোড়িত হয়েছিল সিপিএম। পরমাণু চুক্তির বিরোধিতা করে ২০০৮ সালে ইউপিএ-১ সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করা নিয়েও সিপিএমে নানাবিধ মতামত ছিল। ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের সঙ্গে বামেদের সমঝোতা নিয়েও কম তর্কবিতর্ক ছিল না দলের অন্দরে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সদ্য গজিয়ে ওঠা আব্বাস সিদ্দিকি, নওশাদ সিদ্দিকিদের পার্টির সঙ্গে সিপিএমের ঘনিষ্ঠতা নিয়েও দলের মধ্যে বিভাজন ছিল প্রকট। কিন্তু প্রবীণ সিপিএম নেতারাও মানছেন, মাত্র একটি বৈঠক ঘিরে এ হেন বিতর্ক সাম্প্রতিক সময়ে দলের মধ্যে দেখা যায়নি, যা শুরু হয়েছে বুধবার রাতে নিউ টাউনের হোটেলে হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বৈঠকের পর।

Advertisement

দলের মধ্যে সেলিমের সতীর্থদের একাংশই তাঁকে কাঠগড়ায় তুলছেন। একান্ত আলোচনায় সরাসরি রাজ্য সম্পাদকের ‘উদ্দেশ্য’ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সিপিএম রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর একাধিক সদস্য। প্রতি বুধবার সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠক হয়। সেই বৈঠক হয়েছে বুধবারও। কিন্তু বাকি নেতাদের অভিযোগ, তাঁরা জানতেও পারেননি সেলিম সন্ধ্যার পরে নিউ টাউনের হোটেলে গিয়ে হুমায়ুনের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সম্পাদকমণ্ডলীর এক প্রবীণ সদস্যের বক্তব্য, ‘‘কেন সম্পাদককেই যেতে হল? কেন তা নিয়ে আগে দলে আলোচনা করা গেল না? কী এমন গোপনীয়তা, যে রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীকে এড়িয়ে হুমায়ুনের সঙ্গে বৈঠক করতে হল?’’

পাল্টা সেলিম অনুগামীদের যুক্তি, দলের মধ্যে কমিটির আমলাতন্ত্রকে যাঁরা টিকিয়ে রাখতে চান, তাঁরাই এ ধরনের কথা বলছেন। কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। একটা বৈঠক হয়েছে মাত্র, রাজনীতিতে যা হতেই পারে। তার জন্য ‘গেল-গেল’ রব তোলার কিছু হয়নি। আধুনিক রাজনীতিতে সব কিছু সকলকে জানিয়ে করা যায় না।

সেলিম বৈঠকের পরে বলেছেন, তিনি হুমায়ুনের ‘মন’ বুঝতে গিয়েছিলেন। সিপিএমের অন্দরে প্রশ্ন উঠছে, হুমায়ুনের মন বুঝতে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করতে হল কেন? যে হুমায়ুন দেড় মাস আগে বাবরি মসজিদের শিলান্যাস করে তাঁর ‘লাইন’ স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যে হুমায়ুন গত লোকসভা ভোটের সময়ে হিন্দুদের ভাগীরথীদের ভাসিয়ে দেওয়ার হুঙ্কার দিয়েছিলেন, যে হুমায়ুন সদ্য বলেছেন বিজেপির সমর্থন নিতেও তাঁর কোনও ছুতমার্গ নেই, তাঁর মন বুঝতে বৈঠকের কী প্রয়োজন হল?

বুধবার রাত থেকেই সিপিএমের কর্মী-সমর্থকেরা হুমায়ুন-সেলিমের বৈঠক নিয়ে সমাজমাধ্যমে সরব হতে শুরু করেছিলেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তা আরও গতি পায়। শুধু কর্মী-সমর্থকেরাই নন, বামেদের সঙ্গে থাকা নাট্য ও সাহিত্যজগতের লোকজনও ‘সাম্প্রদায়িক’ নেতার সঙ্গে সেলিমের বৈঠক নিয়ে সরব। যাঁদের মধ্যে অন্যতম নাট্যকার চন্দন সেন।

সেলিম গেলেন কেন? আনুষ্ঠানিক ভাবে সিপিএম রাজ্য সম্পাদক বৃহস্পতিবার সকালে বলেছেন, ‘‘রাজ্যে কী হচ্ছে, তার উপরে বামপন্থীদের দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। তাই গিয়েছি।’’ তবে তাঁর ঘনিষ্ঠদের মধ্য থেকে দু’রকম ব্যাখ্যা উঠে আসছে। একাংশের বক্তব্য, সেলিম বুঝতে পারেননি বৈঠকের বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসবে। জানাজানি না-হলেই সমস্যা হত না। সিপিএমের এক রাজ্য কমিটির সদস্যের কথায়, ‘‘মালদহ, মুর্শিদাবাদে নানা ধরনের শক্তির সঙ্গে আমাদের কথাবার্তা চলছে। সেগুলি নিয়ে হইচই নেই।’’ অন্য অংশের ব্যাখ্যা, সেলিম যেনতেন প্রকারে চাইছেন সিপিএমকে শূন্যের গেরো থেকে মুক্তি দিতে। তাঁদের বক্তব্য, শূন্যের গেরো কেটে গেলেই এ সব নিয়ে আলোচনা থাকবে না।

আরও একটি প্রসঙ্গের কথা উঠে আসছে সিপিএমের ভিতর থেকে। তাঁদের বক্তব্য, যদি দলকে শূন্যের গেরো কাটাতে হয়, তা হলে তা কাটাতে হবে মালদহ-মুর্শিদাবাদ থেকেই। আলিমুদ্দিনের নেতারাও অবহিত, এই দুই জেলায় বহু এলাকা থেকে অনেক সিপিএম নেতাকে স্থানীয় চাপে বাবরি মসজিদ শিলান্যাসের সময়ে ইট বয়ে নিয়ে যেতে হয়েছিল। সেই বাস্তবতাকে তত্ত্ব দিয়ে আড়াল করলে হবে না।

তবে সিপিএমের অনেকের বক্তব্য, হুমায়ুনের সঙ্গে সেলিমের হোটেল বৈঠকের সব থেকে কুপ্রভাব পড়ছে উদ্বাস্তু অধ্যুষিত অঞ্চলে। সিপিএমের এক নেতার বক্তব্য, গত কয়েক মাসে দল নানা বিষয় নিয়ে মিছিল-মিটিং করেছে। দেখা গিয়েছে, ভেনেজুয়েলার উপর মার্কিন আগ্রাসন নিয়ে মিছিল ডাকলে জড়ো হচ্ছেন ২০ জন। আর বাংলাদেশের দীপু দাস হত্যার প্রতিবাদে মিছিল ডাকলে উপস্থিত হচ্ছেন ২০০ জন। এতেই স্পষ্ট বাস্তব ছবিটা কী। সেখানে এই ধরনের বৈঠক দলকে আরও বিচ্ছিন্ন করবে বলেই অভিমত তাঁদের।

প্রসঙ্গত, হুমায়ুনের সঙ্গে সেলিমের এই সাক্ষাৎকে সমালোচনায় বিদ্ধ করছে বাম শরিক দলগুলিও। তার মধ্যেই যুক্তি-পাল্টা যুক্তিতে বিতর্ক অব্যাহত সিপিএমে। কাঠগড়ায় স্বয়ং রাজ্য সম্পাদক সেলিম। আগামী মাসে সিপিএমের দু’দিনের রাজ্য কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা। সেখানেও এই প্রসঙ্গ উঠতে পারে বলে অভিমত অনেকের।

যদিও সেলিম এ হেন সমালোচনা, আলোচনায় বিচলিত নন। অনেকের মতে, তিনি আর পাঁচ জন সিপিএম নেতার মতো নন বলেই গোটা বিষয়টিকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক মানসিকতা’ থেকে দেখছেন না। আবার অনেকের বক্তব্য, নির্দিষ্ট কয়েক জনকে নিয়ে সেলিম যে ভাবে দলের মধ্যে নিজস্ব ‘দল’ তৈরি করছেন, তা অতীতে কখনও দেখা যায়নি। তবে ‘সংস্কারপন্থী’ সিপিএম নেতাদের দাবি, ‘‘অত নৈতিকতা দিয়ে এখন কিছু হবে না। আগে কয়েকটা আসন জিততে হবে। সেলিম যা করেছেন, বেশ করেছেন। দরকারে আবার করবেন।’’ তৃণমূল স্বাভাবিক ভাবেই সিপিএম-কে কটাক্ষ করেছে। দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ ডুগডুগি বাজিয়ে গান গেয়েছেন, ‘আমার এই ছোট্ট ঝুড়ি, এতে রাম-বাম আছে, দেখে যা নিজের চোখে, কমরেড সেলিম কেমন নাচে!’

বাবরি মসজিদ এবং হুমায়ুনকে জুড়ে সিপিএম নেতাদের একাংশ সরাসরি প্রশ্ন তুলছেন, দল কি তা হলে ধর্মান্ধদের সঙ্গে হাত মেলাবে? পাল্টা ইতিহাস টেনে সেলিমপন্থীরা বলছেন, হিন্দু মহাসভার নেতা ছিলেন নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (প্রয়াত সিপিএম নেতা তথা লোকসভার প্রাক্তন অধ্যক্ষ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বাবা। যে সোমনাথকে পরমাণু চুক্তির বিরোধিতা পর্বে স্পিকার পদ না-ছাড়ায় বহিষ্কার করেছিল সিপিএম)। তিনি হিন্দু মহাসভার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করার পরে বর্ধমান লোকসভা আসনে তাঁকে নির্দল প্রার্থী হিসাবে সমর্থন দিয়েছিল অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি। পাল্টা বলা হচ্ছে, জরুরি অবস্থার সময়ে কংগ্রেসের বিরোধিতা করতে গিয়ে জনসঙ্ঘের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিরুদ্ধে ইস্তফা দিয়েছিলেন সিপিএমের তৎকালীন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পি সুন্দরাইয়া। যা সিপিএমের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

Advertisement
আরও পড়ুন