West Bengal Assembly Election 2026

তৃণমূলের বাম-রাম, বিজেপির সিপেমূল, সিপিএম বলছে বিজেমূল! সবার উপরে ‘সেটিং’ সত্য, তাহার উপরে কিছু নাই?

প্রতিপক্ষের মধ্যে অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি করার কৌশল রাজনীতিতে বহু ব্যবহৃত। স্বাধীনতার আগে থেকেই তা চলে আসছে। মহাবিদ্রোহের সময়ে কার্তুজে দু’টি বিশেষ প্রাণীর চর্বি মিশ্রিত থাকার ব্রিটিশের প্রচার সেই অবিশ্বাসকেই তীব্র করেছিল।

Advertisement
শোভন চক্রবর্তী
শেষ আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৫৭
Propagation of theory of understanding in West Bengal politics is an old tactic, adopted by TMC, BJP, CPM ahead of 2026 assembly polls

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

লক্ষ্য এক— ভোট। লাইনও এক— ‘সেটিং’। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের আগে সেই লক্ষ্যে একই লাইনে হাঁটছে যুযুধান তিন শিবির তৃণমূল, বিজেপি এবং সিপিএম।

Advertisement

তৃণমূল এবং সিপিএম এই ভাষ্য প্রচার করছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটের মুখে সেই ‘সেটিং’ তত্ত্ব অর্থাৎ বোঝাপড়ার প্রচারে শান দিচ্ছে বিজেপি-ও। তিন পক্ষের উদ্দেশ্য একটাই, অন্যের ভোটে ভাগ বসিয়ে সেই ভোট নিজেদের বাক্সে নিয়ে আসা। তিন পক্ষের অঙ্ক আলাদা আলাদা। কিন্তু লাইন একই— ‘সেটিং’।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের পর থেকেই তৃণমূল ‘বাম-রাম’ তত্ত্বের কথা বলতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ, যাহা সিপিএম, তাহাই বিজেপি। কারণ, সে বারই প্রথম দেখা গিয়েছিল, বামেদের ভোট কমে একেবারে প্রান্তিক হয়ে গিয়েছে। আর বামেদের যে পরিমাণ ভোট কমেছে, প্রায় সেই পরিমাণ ভোট বেড়ে গিয়েছে বিজেপির। যে হিসাব দিয়ে তৃণমূল প্রায়শই বলে থাকে, বামের ভোটই রামে গিয়েছে। অর্থাৎ, সিপিএমের ভোটেই পুষ্ট হয়েছে বিজেপি।

আবার সিপিএমের বক্তব্য, প্রথমত, কেন্দ্রে অটলবিহারী বাজপেয়ী মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূলই পশ্চিমবাংলায় বিজেপি-কে হাত ধরে এনেছিল। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও কেন ‘মাথা’ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সি পৌঁছোয় না, সেই প্রশ্ন। যে প্রশ্ন তুলে সিপিএম তাদের মতো করে বিজেপি এবং তৃণমূলের মধ্যে ‘সেটিং’য়ের কথা বলে। যদিও ইদানীং ‘বিজেমূল’ বলা আনুষ্ঠানিক ভাবে বন্ধ করেছে সিপিএম। কিন্তু ‘সেটিং’ তত্ত্ব থেকে তারা বেরিয়ে আসেনি। ভোটের আগে বেরোনোর লক্ষণও নেই। বরং তা তীব্রতর হওয়ার সম্ভাবনা।

তবে সর্বভারতীয় স্তরে বিজেপি-বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’য় একসঙ্গেই রয়েছে তৃণমূল-সিপিএম। অন্তত খাতায়কলমে। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে যে মঞ্চ তৈরির সময় থেকেই সিপিএম এবং তৃণমূলকে একত্র করে ‘সিপেমূল’ বলার চেষ্টা করছে বিজেপি। বিধানসভা ভোটের আগে সেই তত্ত্ব আরও জোরের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে পদ্মশিবির। সম্প্রতি রাজ্য বিজেপির ফেসবুক পেজ থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে একটি ভিডিয়ো নির্মাণ করে সিপিএম-তৃণমূলের বোঝাপড়াকে তুলে ধরা হয়েছে। বিজেপির বক্তব্য, তাদের ভোট কেটেই তৃণমূলকে ২০২১ সালের ভোটে ৬০-৭০টি আসন পাইয়ে দিয়েছিল সিপিএম। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী প্রায়ই বলছেন, দমদম, ব্যারাকপুরের মতো আসনগুলিতে সিপিএম ‘ভোটকাটুয়া’ হয়ে বিজেপিকে হারিয়ে তৃণমূলকে জিতিয়েছে। না হলে সৌগত রায়, পার্থ ভৌমিকদের বদলে শীলভদ্র দত্ত, অর্জুন সিংহেরা সংসদে যেতে পারতেন। ‘হিন্দু কমরেড’দের উদ্দেশে বারংবার বার্তা দিচ্ছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও।

তিন পক্ষের অঙ্ক আলাদা আলাদা। কিন্তু লাইন এক— ‘সেটিং’। তৃণমূলের উদ্দেশ্য বিজেপি-বিরোধী বামমনস্ক ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ জনতাকে তাদের দিকে টানা। বিজেপি চাইছে বামেদের দিকে এখনও যে ‘হিন্দু’ ভোট রয়েছে, সেই ভোট তাদের বাক্সে নিয়ে আসতে। সিপিএম হাল না-ছেড়ে সেটিং তত্ত্ব প্রচার করে চেষ্টা করছে, যদি কিয়দংশেরও ভোট ফেরানো যায়। অন্তত শূন্যের গেরো যাতে কাটে।

রাজ্য রাজনীতিতে এই ‘সেটিং তত্ত্ব’ কি নতুন? ইতিহাস বলছে, একেবারেই নয়। বরং এই তত্ত্ব বহু যুগ ধরেই চলে আসছে। কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হওয়ার অব্যবহিত পরেই সিপিআইয়ের সঙ্গে সিপিএমের বিস্তর দূরত্ব ছিল। সেই পর্বে কংগ্রেসের সঙ্গে সিপিআইয়ের ঘনিষ্ঠতাকে কটাক্ষ করে পশ্চিমবাংলার দেওয়ালে দেওয়ালে সিপিএম লিখেছিল, ‘দিল্লি থেকে এল গাই, সঙ্গে বাছুর সিপিআই’। সেই সময়ে কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রতীক ছিল ‘গাই-বাছুর’। আবার সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে থাকা বামেরাই সত্তরের দশকে কংগ্রেস এবং নকশালপন্থীদের মধ্যে বোঝাপড়া বোঝাতে ‘কংশাল’ শব্দবন্ধকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল রাজ্য রাজনীতিতে। এমনকি, কংগ্রেস ছেড়ে মমতা বেরিয়ে আসার পর্বে তাঁর মূল অভিযোগ ছিল বিধান ভবনের নেতাদের সঙ্গে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের ‘বোঝাপড়া’। অর্থাৎ, ‘সেটিং’। মমতা তার কোনও নাম দেননি ঠিকই। কিন্তু তৎকালীন কংগ্রেসনেতা অধুনাপ্রয়াত সুব্রত মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে বলেছিলেন ‘তরমুজ’। অর্থাৎ, উপরে সবুজ হলেও ভিতরে লাল। উপরে কংগ্রেস হলেও অন্তর থেকে সিপিএম। যদিও সুব্রত পরে তৃণমূলে যোগ দিয়ে মমতার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হয়েছিলেন।

কেন এই তত্ত্ব বলে বা বলছে রাজনৈতিক দলগুলি? প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান প্রশান্ত রায় এই প্রবণতাকে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘রাজনৈতিক দলগুলি যখন মানুষের মনে নিজেদের সম্পর্কে বিশ্বাস তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তখনই তারা এ হেন অবিশ্বাসের তত্ত্ব ভাসিয়ে দেয়। এটা দৈন্য ছাড়া অন্য কিছুই নয়।’’ আবার কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক প্রতীপ চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘‘দলগুলি জনগণের সঙ্গে ‘সেটিং’ করতে পারছে না বলেই এই তত্ত্ব বলছে। এর মধ্যে খানিকটা সহানুভূতি আদায় করার ঝোঁকও মিশে থাকে।’’

এ কথা ঠিক যে, প্রতিপক্ষের মধ্যে অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি করার কৌশল রাজনীতিতে বহু ব্যবহৃত। স্বাধীনতার আগে থেকেই তা চলে আসছে। মহাবিদ্রোহের সময়ে কার্তুজে দু’টি বিশেষ প্রাণীর চর্বি মিশ্রিত থাকা নিয়ে ব্রিটিশের প্রচার সেই অবিশ্বাসকে তীব্র করেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এই কৌশল নিতে দেখা গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দলগুলিকেও। বাম জমানার শেষ পর্বে মন্ত্রী গৌতম দেব প্রায় ধারাবাহিক ভাবে দাবি করতেন, তাঁকে ভিতর থেকে তৃণমূলের নেতারা নানা খবর দিচ্ছেন। তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যাওয়ার পর শুভেন্দু বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নেপথ্যকাহিনি বলে দাবি করেন, নবান্নে তাঁর লোক রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বৃত্ত থেকেই তিনি সরকারের সমস্ত খবর পেয়ে যাচ্ছেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বিজেপির বেশ কিছু সাংসদ-বিধায়ক তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। রাজনীতির কারবারিদের অনেকের বক্তব্য, এ সবই আসলে অবিশ্বাস তৈরির ‘কৌশল’। ‘সেটিং’ তত্ত্ব তারই একটি রূপ।

Advertisement
আরও পড়ুন