(বাঁ দিকে) সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক মারিয়াম আলেকজ়ান্ডার বেবি এবং রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম (ডান দিকে)। শুক্রবার আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে। —নিজস্ব চিত্র।
পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস সিপিএমের সঙ্গ ত্যাগ করার কথা ঘোষণা করে দিয়েছে সপ্তাহখানেক হল। বামেদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ হওয়ার পর থেকে এই পর্বে বিভিন্ন স্তরের কংগ্রেসকর্মীরা সমাজমাধ্যমে ‘সাঁইবাড়ি’, ‘আমতায় পাঞ্জা কেটে নেওয়া’র মতো বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করে সিপিএম-কে ‘লাল সন্ত্রাস’ নিয়ে বিঁধছিলেন। শুক্রবার খোলস ছাড়ল সিপিএম-ও। আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে বসে দলের সাধারণ সম্পাদক মারিয়াম আলেকজ়ান্ডার বেবি মনে করিয়ে দিলেন সত্তর দশকে কংগ্রেসের ‘সন্ত্রাসের’ কথা। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের জমানার কথা। যা এক সময়ে মুখস্থের মতো পাড়ার পথসভা বা স্ট্রিট কর্নারে বলতেন সিপিএমের নেতারা।
কংগ্রেস সঙ্গে বিচ্ছেদের প্রশ্নে বেবি বলেছেন, ‘‘আমরা তো চেয়েছিলাম পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি এবং তৃণমূল-বিরোধী সমস্ত শক্তিকে একত্রিত করে লড়াই করতে। কংগ্রেস যদি প্রয়োজনীয়তা অনুভব না-করে তা হলে আমরা কী করতে পারি?’’ এর পরেই বেবি স্মরণ করিয়ে দেন, এ রাজ্যে কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক অতীতে কেমন ছিল। ফিরে যান ইতিহাসে। ফিরে যান সিপিএমের সেই পুরনো পাঠ্যক্রমে। সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘‘১৯৭২ সালের জাল জালিয়াতির নির্বাচনের কথা আমরা সকলেই জানি। সেই ভোটে বরাহনগরে ‘জেবি’ (নাম ও পদবির ইংরেজি আদ্যক্ষর জুড়ে প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু এই নামেই সিপিএমে খ্যাত ছিলেন) হেরে গিয়েছিলেন। ওই পাঁচ বছর আমরা বিধানসভা বয়কট করেছিলাম। তার পরে ১৯৭৭ সালে ‘ম্যাজিকাল’ ফলাফল দেখিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের মানুষ।’’ উল্লেখ্য, ১৯৭৭ সালেই ভোটে জিতে প্রথম ক্ষমতায় এসেছিল জ্যোতিবাবুর নেতৃত্বাধীন প্রথম বামফ্রন্ট সরকার।
যদিও ২০১৬ সাল থেকে এ রাজ্যে ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতি’তে সেই কংগ্রেসের সঙ্গেই ধারাবাহিক সখ্য রেখে বিভিন্ন নির্বাচন লড়েছে সিপিএম। মাঝে মাঝে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট এবং বিধানভবনের সম্পর্কে শৈত্যও এসেছে। কিন্তু সুতো ছিঁড়ে যায়নি। যা হল ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটের প্রাক্কালে। কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে সিপিএমের অন্দরে বিতর্ক ছিল। নিচুতলার অনেকে অভিযোগ করেন, কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে নেতাদের সমীকরণে। গোটা পার্টি কাঠামো কখনওই তাতে সঙ্গ দেয়নি। সিপিএমের অনেকে জোট পর্বে কংগ্রেস সম্পর্কে পুরনো কথা তুললে নেতাদের তরফেই বলা হয়েছিল, ‘‘আরএসএসের কথায় নাচবেন না।’’ কিন্তু কংগ্রেসের সঙ্গ ত্যাগ করতেই সত্তরের দশকের ‘আধা ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস’-এর পাঠ্যক্রম রাজ্য সিপিএম-কে স্মরণ করিয়ে দিলেন খোদ সাধারণ সম্পাদক।
অতিবড় সিপিএম-ও এ কথা মানেন যে, এ বারেও তাঁদের লড়াই শূন্যের গেরো কাটানোর। প্রস্তুতি কেমন? রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠকের পরে বেবি দাবি করেছেন, ‘‘দলের কর্মীরা এই সময়ে রাজনৈতিক কাজ বাদ দিয়েও সামাজিক নানা বিষয়ে, নানা ধরনের কাজে অংশগ্রহণ করেছেন। তার ফল মিলবে।’’ তবে বেবির বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, কংগ্রেস পুরনো কথা টেনে সিপিএম-কে বিঁধলে পাল্টা সিপিএমও পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে রেয়াত করবে না। এ-ও স্পষ্ট যে, গত এক দশকের ‘বন্ধুত্ব’ হঠাৎ করেই ঘেঁটে যেতে বসেছে।
বেবির সঙ্গে কালো চশমা চোখে আলিমুদ্দিনে সাংবাদিক বৈঠকে হাজির ছিলেন রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমও। সদ্য তাঁর ছানি অস্ত্রোপচার হয়েছে। দিন তিনেক ঘরবন্দি থাকার পরে বৃহস্পতিবার থেকে তিনি দলীয় কাজে বাইরে বেরোচ্ছেন। বৃহস্পতিবার আসন সমঝোতা নিয়ে বৈঠক করেছেন আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকির সঙ্গে। শুক্রবার ছিল সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠক। সাধারণত প্রতি সপ্তাহে বুধবার হয় সম্পাদকমণ্ডলীর সভা। কিন্তু সেলিমের চোখের অস্ত্রোপচারের কারণেই গত বুধবারের বদলে বৈঠকটি শুক্রবার হল। সেলিম জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে বাম শরিকদের সঙ্গে আলোচনা সম্পন্ন করে আসন বোঝাপড়া ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে চূড়ান্ত করে ফেলা যাবে। তার পরে ১৯ এবং ২০ তারিখ সিপিএমের রাজ্য কমিটির বৈঠক।