মত এড়াচ্ছে বিজেপি
SIR

‘বিবেচনা’ ফেলে রেখে ভোট নয়, বাড়ছে দাবি

রাজ্যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পরে বাদ গিয়েছে প্রায় ৬৩ লক্ষ নাম। আর ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় রয়েছেন প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ।

নিজস্ব সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ০৩ মার্চ ২০২৬ ০৯:০২
রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতরের সামনে কংগ্রেসের ধর্না-বিক্ষোভ।

রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতরের সামনে কংগ্রেসের ধর্না-বিক্ষোভ। — নিজস্ব চিত্র।

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া নিয়ে চাপানউতোর চলছিলই। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) শেষ পর্বে বিপুল সংখ্যক নাম ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় চলে যাওয়ায় এ বার শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। ‘বিবেচনা’র ফয়সালা হওয়ার আগে বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা না-করার জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে দাবি জানাল অ-বিজেপি সব দল। রাজ্যের নানা প্রান্তে এবং রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতরের সামনে দফায় দফায় নানা দলের বিক্ষোভ, প্রতিবাদও শুরু হয়েছে। বিজেপি অবশ্য এই প্রসঙ্গে সরাসরি মন্তব্য এড়িয়ে ভোটারের নামে আপত্তি জানানোর ফর্ম ৭ সংক্রান্ত আবেদনের নিষ্পত্তির দাবি তুলছে।

রাজ্যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পরে বাদ গিয়েছে প্রায় ৬৩ লক্ষ নাম। আর ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় রয়েছেন প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ। তৃণমূল কংগ্রে, সিপিএম ও কংগ্রেস এক সুরে প্রশ্ন তুলছে, সীমিত সময়ের মধ্যে এই ঝুলে থাকা তালিকার নিষ্পত্তি না-হলে এই বিপুল সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকারের কী হবে? তালিকা থেকে যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁরা ফর্ম ৬ পূরণ করে ফের নাম তোলার আবেদন করতে পারেন। ‘বিবেচনাধীন’ বলে যাঁদের ‘সংশয়পূর্ণ ভোটার’ করে রাখা হচ্ছে, তাঁদের কোনও সুযোগই নেই! নিয়ম অনুযায়ী, ভোট ঘোষণার সময়ে সর্বশেষ যে ভোটার তালিকা থাকে, সেই তালিকা ধরেই ভোট হয়। এই কারণেই বিজেপি বাদে বাকি প্রায় সব দল দাবি করছে, ‘বিবেচনাধীন’ তালিকার মীমাংসা না-হওয়ার আগে ভোট ঘোষণা অনুচিত।

তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষের দাবি, ‘‘কমিশনকে দিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে এসআইআর-এর নাম করে ভোটচুরি করেছে বিজেপি। এখানে বাধা পেয়ে নির্বাচন ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিষয়টি দেশের সর্বোচ্চ আদালতে রয়েছে। আদালতই যোগ্য ভোটারের অধিকার নিশ্চিত করবে।’’ সেই সঙ্গে তাঁর মন্তব্য, ‘‘দলমত নির্বিশেষে এক জন যোগ্য ভোটারকেও তালিকার বাইরে রাখা যাবে না। এই রকম অপরিকল্পিত এসআইআর-এর কারণে বাঙালি নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার বিসর্জন দিতে পারে না। সেটাই রাজ্যের নির্বাচনে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।’’

ভোটাধিকার রক্ষার দাবিকে সামনে রেখে বামফ্রন্ট কাল, বুধবার সিইও দফতরে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু বলেছেন, “বিবেচনাধীনের তালিকা অনুসরণ করে লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংখ্যালঘু অংশের বড় সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আদিবাসী, তফসিলি, মতুয়াদের অনেকের নাম বাদ গিয়েছে। পাশাপাশি, ‘বিবেচনাধীনে’র তালিকায় থাকা মানুষকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলেছেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি। কমিশন বিজেপির নির্দেশে কাজ করছে। আর রাজ্যের আধিকারিকেরা এই কাজে কমিশনকে সাহায্য করেছেন।” এই পরিস্থিতিতে বামফ্রন্টের দাবি, ২০০২-এর সঙ্গে যাঁদের ‘ম্যাপিং’ হয়ে গিয়েছে, তাঁদের নাম অবিলম্বে বৈধ বলে ঘোষণা করতে হবে। তাঁদের কোনও ভাবেই বিচারাধীন রাখা যাবে না। পাশাপাশি, বাকি নাম কেন বিবেচনাধীন, তা কারণ-সহ এখনই জানাতে হবে।

এই প্রেক্ষিতে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চকবর্তী বলেছেন, ‘‘যাঁরা স্থায়ী ভাবে এই রাজ্য বসবাসকারী, তাদের নাম ভোটার তালিকায় নাম রাখতেই হবে। বিবেচনাধীন বলে ঝুলিয়ে রেখে কোনও মানুষকে অসমের মতো ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। দলমত নির্বিশেষে এটাই এখন সকলের দাবি হওয়া উচিত।’’

সমস্ত ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারের বিষয় নিষ্পত্তি না-করে নির্বাচন ঘোষণা করা অনুচিত, লিখিত ভাবে কমিশনকে সেই দাবি জানিয়েছে প্রদেশ কংগ্রেস। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি দিয়ে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য অধীর চৌধুরীও দাবি করেছেন, ‘বিবেচনা’র প্রক্রিয়া শেষ করে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরেই ভোট ঘোষণা করা উচিত। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরে অনুপ্রবেশকারী, রোহিঙ্গারা কোথায়, সেই প্রশ্নকে সামনে রেখে প্রদেশ কংগ্রেস এ দিন সিইও দফতরের সামনে বিক্ষোভ-ধর্না করেছে। প্রদেশ সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের মন্তব্য, বলেছেন, “আমরা কমিশনের দফতরের ভিতরে ঢুকব না। কারণ, গিয়ে লাভ নেই। এঁরা ও বিজেপি নেতারাই আসল রোহিঙ্গা! অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা দেখান। রাজ্যে পিছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতা দখল করতে চাইছে বিজেপি। প্রথমে লক্ষ্যবস্তু করেছিল মুসলমানদের। এখন হিন্দু, মতুয়া, মহিলাদের নামও বাদ দিচ্ছে কেন?” বিবেচনাধীন কয়েক জন ভোটারকে সঙ্গে নিয়েই প্রদেশ সভাপতির অভিযোগ, “চূড়ান্ত তালিকায় মৃত ভোটারদের নাম আছে। অথচ, জীবিত অনেকের নাম বাদ। তামাশার শুনানির পরেও ৬০ লক্ষ বিবেচনাধীন কেন?’’ অবস্থানে ছিলেন প্রসেনজিৎ বসু, আশুতোষ চট্টোপাধ্যায়, রোহন মিত্রেরা। ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারের নামে কোনও বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া যাবে না, এই দাবি নিয়ে সিইও দফতর অভিযান করেছে সিপিআই (এম-এল) লিবারেশন এবং এসইউসি-ও। নানা জেলায় বিক্ষোভ-প্রতিবাদে নেমেছে সিপিএম-সহ বিভিন্ন বাম দল।

অন্য সব দলের এমন ‘চাপে’র মুখে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য অবশ্য বলেছেন, ‘‘এটা সম্পূর্ণ কমিশন এবং সুপ্রিম কোর্টের বিষয়। এই নিয়ে আমাদের কোনও বক্তব্য নেই।’’ তাঁর দাবি, ‘‘আমরা স্পষ্ট ভাবে বলতে চাই, আমাদের যে ৭ নম্বর ফর্ম পুলিশ কেড়ে নিয়েছে, তৃণমূল লুট করেছে, ছিঁড়ে দিয়েছে, জ্বালিয়ে দিয়েছে। যে ফর্ম জমা দেওয়ার পরেও ইআরও- এইআরও সিস্টেমে আপলোড করেননি, সেগুলোর সমাধান না-হলে নির্বাচন হবে না!’’

জ্ঞানেশকে চিঠি অধীরের

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ৬০ লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম এখনও বিবেচনাধীন। তাঁদের স্বার্থে বিবেচনার প্রক্রিয়া শেষ করে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরেই ভোট ঘোষণা করা উচিত বলে দাবি তুলে সোমবার জাতীয় নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি লিখলেন কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য অধীর চৌধুরী। চিঠিতে অধীর বলেছেন, ‘ভোটের তারিখ ঘোষণা হয়ে গেলে, তখনও পর্যন্ত যে ভোটার তালিকা থাকবে, সেটিকেই চূড়ান্ত বলে ধরা হবে। ফলে অনেকেই আসন্ন ভোটে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না। তাই বিবেচনার প্রক্রিয়া শেষ করে ভোটের তারিখ ঘোষণার আগেই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা দরকার।’ এই সূত্রেই প্রাক্তন সাংসদ অধীরের সংযোজন, ‘বিবেচনার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরে ৬০ লক্ষের নাম চূড়ান্ত তালিকায় থাকবে কি না, তা নিয়ে কোনও নিশ্চয়তা নেই। নামের সামান্য অমিলের মতো ছোট ত্রুটির ফলেও ভোটারদের নাম যেতে পারে। ফলে প্রকৃত ভোটারেরা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।’ এই পরিস্থিতিতেই জ্ঞানেশের হস্তক্ষেপ দাবি করে উপযুক্ত পদক্ষেপ করার দাবি তুলেছেন অধীর।

আন্দোলনের ডাক বামফ্রন্টের

এই প্রেক্ষিতে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চকবর্তী বলেছেন, “মতুয়াদের কোনও ভাবে জাল ভোটার বলা যাবে না। জাল ভোটার মুক্ত ভোটার তালিকা করার দায় সরকারের। যাঁরা স্থায়ী ভাবে এই রাজ্য বসবাসকারী, তাদের নাম ভোটার তালিকায় নাম রাখতেই হবে। আইন করে কেন্দ্রীয় সরকার বলেছে ২০১৪-র ৩১ ডিসেম্বরের আগে ধর্মীয় হিংসার কারণে যাঁরা ভারতে এসেছেন, তাঁরা দেশের নাগরিক হবেন। ফলে, দীর্ঘদিন ধরে এখানে বসবাসকারী মতুয়াদের কেন এসআইআর-এর নামে সমস্যায় ফেলা হচ্ছে?” জলপাইগুড়ি-সহ রাজ্যের নানা প্রান্তে পুরো প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে পথেও নেমেছে সিপিএমের বিভিন্ন গণসংগঠন।

প্রতিবাদে লিবারেশন

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ‘বিবেচনাধীন’ বলে দাগিয়ে দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে, এই অভিযোগ তুলে সোমবার পথে নামল সিপিআই (এম-এল) লিবারেশন। মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতর পর্যন্ত মিছিল করে গিয়ে সেখানে দাবিপত্র দেওয়া হয়েছে। দলের পলিটব্যুরো সদস্য কার্তিক পালের নেতৃত্বে এই কর্মসূচি হয়েছে। দলের বক্তব্য, ‘বাদ যাঁরা পড়েছেন, তাঁদের বড় অংশই মহিলা, পরিযায়ী শ্রমিক, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। জীবিত ভোটার, শুনানিতে নথি জমা দেওয়ার পরেও নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রথমে যুক্তিগত অসঙ্গতি, তার পরে বিবেচনাধীন শব্দবন্ধের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া ভোটাধিকার হরণের অভিযানে পরিণত হয়েছে।’ এই পরিস্থিতিতে প্রত্যেক ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ ভোটারকে নথি প্রমাণের সুযোগ দেওয়া, বিবেচনাধীনের নামে ভোটাধিকার হরণ বন্ধ, যাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে উপযুক্ত আইনি কারণ জানানোর মতো বিভিন্ন দাবি তুলেছে লিবারেশন।

পথে এসইউসি

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) নামে বৈধ ভোটারদের নাম বাতিল দেওয়া হয়েছে, এই অভিযোগ তুলে সোমবার রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন আধিকারিকের (সিইও) দফতর অভিযান করল এসইউসি। এ ছাড়াও, শিলিগুড়ি, ক্যানিং, পূর্ব বর্ধমান-সহ নানা জায়গাতেই হয়েছে প্রতিবাদ মিছিল। দলের বক্তব্য, এসআইআর-এর নামে এনআরসি চলছে। পাশাপাশি, এসইউসি-র দাবি, বিবেচনাধীন ভোটারের নামে কোনও বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া যাবে না।

আরও পড়ুন