Durga Puja Committee Account

অনুদান খরচের হিসাব মিলবে কি, প্রশ্নে দুর্গাপুজোয় ‘টাকার খেলা’

এই পরিস্থিতিতে কলকাতার দুর্গাপুজোর উদ্যোক্তাদের বড় অংশই ক্ষোভের সঙ্গে বলছেন, বাছাই করা কিছু পুজো কমিটিকে বিপুল টাকা দেওয়া হয়েছে।

নীলোৎপল বিশ্বাস
শেষ আপডেট: ১৬ মে ২০২৬ ১০:০৭
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

সরাসরি সরকারি অনুদান ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা। সরকারের তরফে পুরস্কার-প্রাপ্তি বাবদ এসেছে আরও কিছু। তার সঙ্গেই ছিল বিভিন্ন সরকারি দফতরের তরফে দেওয়া বিজ্ঞাপন থেকে আয়। এর উপরে বিদ্যুতের মাসুলে ৮০ শতাংশ, দমকলের ফি-তে ১০০ শতাংশ মকুব-সহ যাবতীয় ছাড় মিলিয়ে প্রায় চার লক্ষাধিক টাকা। মন্ত্রী বা ক্ষমতাসীন দলের নেতার ‘আশীর্বাদধন্য’ বেশ কিছুদুর্গাপুজো কমিটি গত এক বছরে এমনই টাকা পেয়েছে বলে সূত্রের খবর। অভিযোগ, এর পাশাপাশি চলেছে প্রভাব খাটিয়ে পুজোর বিজ্ঞাপনের দর নিয়ন্ত্রণ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুদানের টাকা খরচের হিসাব জমা না-দেওয়া। রাজ্যে পালাবদলের পরে প্রশ্ন উঠেছে, দুর্গাপুজো ঘিরে এই ‘টাকার খেলা’ বন্ধ হবে কি? পুজো কমিটি ধরে ধরে অনুদানের টাকা খরচের হিসাব নেওয়া হবে কিনা, চর্চা চলছে তা নিয়েও।

২০২৪ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার জানিয়েছিল, ৪৫৩৩৬টি পুজো কমিটিকে অনুদান দেওয়ার জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে ৩৮৫ কোটি ৩৫ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। সেই বছরে প্রতিটি পুজো কমিটি পেয়েছিল ৮৫ হাজার টাকা। গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫-এ কমিটি-পিছু অনুদান বাড়িয়ে করা হয় ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা। এই হিসাবে সে বছর রাজ্য সরকারের খরচ হয়েছিল ৪৯৮ কোটি ৬৯ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। এই ব্যয়ের পাশাপাশি সরকারি প্রায় সব ফি মকুব করে দেওয়ায় তাদের আয় হয়নি।

২০১৮ সালে প্রথম বার পুজো কমিটিগুলিকে ১০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পরেই বিষয়টি আদালতে গড়ায়। কিন্তু তার পরেও অনুদান বন্ধ হয়নি। তবে, কোন কোন খাতে টাকা খরচ করা যাবে, তা বেঁধে দিয়েছিল আদালত। খরচের হিসাব জমা দেওয়ার কথাও বলেছিল তারা। কিন্তু অভিযোগ, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পুজো কমিটিগুলির কাছ থেকে খরচের যথাযথ হিসাব মেলেনি।

এই পরিস্থিতিতে কলকাতার দুর্গাপুজোর উদ্যোক্তাদের বড় অংশই ক্ষোভের সঙ্গে বলছেন, বাছাই করা কিছু পুজো কমিটিকে বিপুল টাকা দেওয়া হয়েছে। অনুদান ছাড়াও তাদের জন্য প্রতি বছর বাঁধা ছিল ‘কলকাতাশ্রী’, ‘বিশ্ব বাংলা শারদ সম্মান’। সেই প্রাপ্তি বাবদ ৫০ হাজার টাকা করে মোট এক লক্ষ টাকা ঢোকার পাশাপাশি ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ, ক্রেতা সুরক্ষা, নারী ও শিশুকল্যাণের মতো একাধিক দফতরের বিজ্ঞাপনের নামে ঢালাও টাকা দেওয়া হয়েছে। উত্তর কলকাতার এক পুজোকর্তার মন্তব্য, ‘‘নামী কিছু পুজোয় সরাসরি নেতা-মন্ত্রীর যোগ থাকায় আলাদা করে সরকারি তহবিল থেকে টাকা দেওয়ার উদাহরণও আছে।’’ উত্তর কলকাতারই আর এক পুজোকর্তা বলছেন, ‘‘কর্পোরেট বিজ্ঞাপন পেতে হলে আমাদের দেখাতে হত, কত দর্শনার্থী হয়েছে। কিন্তু নেতা-মন্ত্রীর পুজোয় সে সব লাগত না। একটি ক্ষেত্রে দর্শক সংখ্যা নিয়ন্ত্রক, অন্য ক্ষেত্রে নেতার ক্ষমতা।’’

যদিও এমন অভিযোগ উড়িয়ে শহরে জাঁকজমকপূর্ণ পুজো করিয়েদের অন্যতম এক কর্তার দাবি, ‘‘শুধু সরকারি সাহায্যে এত বড় পুজো হয় না! আমরা ২০২২ সালে প্রথম হোর্ডিংয়ে একটি বিজ্ঞাপন দেখানোর পরিবর্তে এলইডি স্ক্রিন বসাই। তাতে কয়েক মিনিট অন্তর একাধিক বিজ্ঞাপন দেখানো গিয়েছে। এটাই এর পরে ট্রেন্ড হয়ে গিয়েছে।’’দক্ষিণ কলকাতার আর এক পুজোকর্তার মন্তব্য, ‘‘প্রাক্তন সরকার বুঝেই টাকা দিয়েছে। বাংলার দুর্গাপুজোর সঙ্গে ৮০ হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি জড়িত। বাংলায় যদি ৪৫ হাজার পুজো হয়, তার সঙ্গে মৃৎশিল্পী, ডেকরেটর্স, সব ধরনের লোক মিলিয়ে প্রতি পুজোয় অন্তত ৫০ জন তো থাকবেনই। অর্থাৎ, প্রায় ২০ থেকে ২৫ লক্ষ মানুষ সরাসরি যুক্ত। তাঁদের পরিবার ধরলে প্রায় এক কোটি মানুষের রুটিরুজি তৈরি করে দুর্গাপুজো।’’

আরও পড়ুন