প্রতীক জৈনের বাড়ির সামনে মুখ্যমন্ত্রী। — ফাইল চিত্র।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সিবিআই তদন্ত চেয়ে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। তাদের অভিযোগ, আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে তল্লাশির সময় পুলিশের সাহায্য নিয়ে তাদের হেফাজত থেকে ‘অপরাধ সংক্রান্ত নথি’ নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী।
আবেদনে ইডি অভিযোগ করেছে, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সাংবিধানিক পদে থেকে ‘বেআইনি ভাবে’ তাদের কাজে হস্তক্ষেপ করেছেন। পিএমএলএ (টাকা তছরুপ বিরোধী আইন)-এর অধীনে রাজনৈতিক পরামর্শদাতার সংস্থার কর্তার বাড়িতে আইনি ভাবে তল্লাশি চলছিল। কয়লা দুর্নীতিকাণ্ডে একটি মামলায় সেই অভিযান হয়েছে। সেই আইনি তল্লাশিতে মুখ্যমন্ত্রী বাধা দিয়েছেন বলে অভিযোগ।
২০২০ সালে সিবিআই কয়লা পাচার সংক্রান্ত একটি এফআইআর করে। ওই এফআইআরের ভিত্তিতে পিএমএলএ ২০০২ অনুযায়ী তদন্ত শুরু করে ইডি। প্রায় ২,৭৪২ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের মামলায় তদন্ত করছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। তাদের অভিযোগ, এই টাকার একটি অংশ হাওয়ালা মারফত আইপ্যাকের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, বিশেষত গোয়ায়। সেই মামলার সূত্রে দিল্লি ও কলকাতায় ১০টি জায়গায় তল্লাশি চালানো হয়। তার মধ্যে ছিল প্রতীকের বাড়ি এবং সল্টলেক সেক্টর ফাইভে সংস্থার দফতর।
ইডি আদালতে অভিযোগ করেছে, তল্লাশি চলাকালীন প্রথমে দক্ষিণ কলকাতার ডেপুটি পুলিশ কমিশনার প্রিয়ব্রত রায় এবং পরে কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মা ঘটনাস্থলে যান। তার পরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা নিজে ঘটনাস্থলে প্রবেশ করেন। ইডির দাবি, তাদের অনুমোদিত তল্লাশি চলার সময় ডিজিটাল ডিভাইস (ল্যাপটপ, মোবাইল, হার্ডডিস্ক), গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র জোর করে পুলিশ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ইডির মতে, এতে তাদের তদন্ত সম্পূর্ণভাবে ‘বাধাগ্রস্ত’ হয়। ডিজিটাল ফরেন্সিক কাজ মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। ইডির আরও দাবি, তারা আইপ্যাকের দফতরে ঢুকে তল্লাশি শুরু করলেও রাজ্য পুলিশের বাধায় কাজ করা যায়নি। পরে একটি ‘ইনসিডেন্ট রিপোর্ট’ তৈরি করা হয়।
হাই কোর্টে ইডির দাবি, ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ২০২৩ অনুযায়ী এই ঘটনায় একাধিক ‘অপরাধ’ হয়েছে। যেমন— সরকারি কর্মচারীর কাজে বাধা, বেআইনি আটক, বলপ্রয়োগ, চুরি (ডিজিটাল ডিভাইস ও নথি), প্রমাণ লোপাট, অপরাধমূলক ভয় দেখানো, ষড়যন্ত্র। ইডি আদালতে জানিয়েছে, তারা চায়, সিবিআই–কে দিয়ে এফআইআর করে সম্পূর্ণ ঘটনার তদন্ত হোক। মুখ্যমন্ত্রী ও পুলিশের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা হোক। বাজেয়াপ্ত করা সব ডিজিটাল ডিভাইস ইডি–কে ফেরত দেওয়া হোক। ঘটনাস্থলের সেই সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ করা হোক। ভবিষ্যতে ইডি–র কাজে রাজ্য পুলিশের হস্তক্ষেপ বন্ধ হোক। ইডি অফিসারদের বিরুদ্ধে কোনও প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ না নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হোক।
বৃহস্পতিবার বিবৃতি দিয়ে ইডি দাবি করেছিল, এক পুলিশকর্মীর সঙ্গে কলকাতা পুলিশের ডিসি (দক্ষিণ) এবং বাকি পুলিশ অফিসারেরা এসে তল্লাশি অভিযানে শামিল ইডি আধিকারিকদের পরিচয় খতিয়ে দেখেন। ওই বিবৃতিতেই ইডি জানায়, কিছু ক্ষণ পরে লাউডন স্ট্রিটের ওই ফ্ল্যাটে ঢোকেন পুলিশ কমিশনার মনোজ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কলকাতা পুলিশের কয়েক জন আধিকারিকও। তার পরে সেখানে প্রবেশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। ইডি বিবৃতিতে আরও দাবি করে, নথিপত্র এবং বৈদ্যুতিন নথি-সহ ‘প্রমাণ’ নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে যান মুখ্যমন্ত্রী। আইপ্যাকের দফতরে তদন্তে বাধা পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে শুক্রবার কলকাতা হাই কোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইডি। আদালত মামলা দায়ের করার অনুমতি দেয়। পাল্টা মামলা করে তৃণমূলও। তৃণমূলের মামলা এবং ইডির মামলা, দু’টিই পিছিয়ে দিয়েছে হাই কোর্ট। ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত শুনানি মুলতুবি। শুক্রবার ওই দু’টি মামলারই শুনানি হওয়ার কথা ছিল বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে। কিন্তু আদালত কক্ষে প্রবল ভিড় হওয়ায় দু’টি মামলারই শুনানি আগামী ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মুলতুবি করে দেন বিচারপতি ঘোষ। তার পর ইডি তাদের মামলার দ্রুত শুনানির আর্জি নিয়ে প্রধান বিচারপতির দ্বারস্থ হয়। তবে সেই আবেদন মঞ্জুর হয়নি।