Crimes

রাজনীতির আবর্তেই চলে দখলদারির লড়াই, খুনোখুনি

বখরা নিয়ে গোষ্ঠী কোন্দল সর্বত্র। গুলি চলে, বোমা পড়ে। মতের অমিল হলেই করা হয় খুন। রাজনীতির ছত্রচ্ছায়ায় এই অপরাধের জাল কত দূর? ভোটের আগে খোঁজ নিল আনন্দবাজার। আজ প্রথম কিস্তি।

নীলোৎপল বিশ্বাস, চন্দন বিশ্বাস
শেষ আপডেট: ০১ মার্চ ২০২৬ ০৬:০৮

—প্রতীকী চিত্র।

সকাল ৯টার ব্রাইট স্ট্রিট। ভিড়ের মধ্যে পর পর গুলির আওয়াজ। শরীরে গুলি না লাগলেও একব্যক্তি রাস্তায় পড়ে গিয়েছেন। এর পরে প্রকাশ্যেই তাঁকে ঘিরে ধরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে শুরু করল তিন জন। মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত চলল কোপানো! পুলিশি তদন্তে উঠে আসে,মাদক পাচার ও জাল নোটের কারবারের বখরা নিয়ে গন্ডগোলের জেরেই ওই খুন।

তিলজলার মসজিদবাড়ি লেনে আবার নির্মীয়মাণ একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে গল্প করছিলেন এলাকার এক প্রোমোটার। সেখানেইমোটরবাইক নিয়ে এসে ওই প্রোমোটারকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে খুন করে কয়েক জন। প্রোমোটিং সংক্রান্ত বিবাদের জেরেই ঘটে সেই খুনের ঘটনা।

আনন্দপুরের গুলশন কলোনির একটি নির্মীয়মাণ বাড়ির ছাদ লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালাতে দেখা গিয়েছিল মোটরবাইকেথাকা কয়েক জন যুবককে। ছাদ থেকেও উড়ে আসে বোমা। প্রায় সিনেমার মতো সেই দৃশ্যের মুখে পড়ে হতবাক হয়ে যায় পুলিশ!এ ক্ষেত্রেও এলাকা দখলের লড়াই থেকেই ওই কাণ্ড বলে তদন্তে উঠে আসে।

সম্প্রতি হাওড়ার পিলখানায় খুব কাছ থেকে এক প্রোমোটারকে গুলি করে খুনের ঘটনার দৃশ্যশোরগোল ফেলেছে। বেআইনি কারবারের বখরা নিয়ে বিবাদের জেরেই এই খুন বলে প্রাথমিক ভাবে মনে করছে পুলিশ। সাম্প্রতিক অতীতে এমন একাধিকঘটনা ঘটেছে কলকাতাতেও। হাওড়ার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই শহরের নানা কুখ্যাত এলাকা ঘুরে দেখা গেল, একই রকম গোষ্ঠী কোন্দলের চোরাস্রোত বইছে।

পুলিশ সূত্রের খবর, এক সময়ে যেখানে দাপিয়ে বেড়াতে শোনা যেত শেখ বিনোদ, নান্টি ওরফে বাবলু ঘোষ, জিশু জৈনদের,সেখানেই এখন উল্কার গতিতে উত্থান হয়েছে বিশ্বজিৎ পোদ্দার ওরফে সোনা পাপ্পুর। বাবার সোনার দোকানে এক সময়ে কাজ করারসুবাদেই কসবার সুইনহো লেনের বাসিন্দা পাপ্পুর নাম হয় সোনা পাপ্পু। রাজ্যেপালাবদলের পরে ৬৭ নম্বর ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধির হাত ধরে হঠাৎ করেই রাজনীতিতে আসা তাঁর। ২০১৫ সালে পাপ্পুর নাম প্রথম বড় ধরনের অপরাধে জড়ায় বালিগঞ্জ রেল ইয়ার্ডে এলাকা দখলের সংঘর্ষ ঘিরে।এর মধ্যেই কসবা, তিলজলা, তপসিয়া এলাকার অবাধ সিন্ডিকেট-রাজের বাদশা হিসাবে উঠে আসে পাপ্পুর নাম। ২০১৭ সালে নির্মাণ ব্যবসা ঘিরে একটি খুনের ঘটনায়নাম জড়ায় তাঁর। ২০২১ সালে প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের বাইরে ২৫ জন সঙ্গীকে নিয়ে বিরোধী গোষ্ঠী মুন্না পাণ্ডের উপরে হামলাচালানোরও অভিযোগ ওঠে পাপ্পুর বিরুদ্ধে। আদালতের নির্দেশে কসবায় পাপ্পুর প্রবেশ বন্ধ হলেও ঢাকুরিয়া, গোলপার্ক এলাকায় প্রভাব বিস্তার শুরু হয় তাঁর।

ওই এলাকায় এত দিন প্রভাব ছিল বাপি হালদারের। কসবা এলাকার এক পুরপ্রতিনিধির সঙ্গে দূরত্ব যত বেড়েছে, ততই পাপ্পুরসঙ্গে লড়াইয়ে কোণঠাসা হয়েছেন বাপি। পুলিশের একটি সূত্রেরই দাবি, শাসকদলের দক্ষিণ কলকাতার এক নেতার ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার পর থেকেই রাজনৈতিক সভায় বিশেষ উপস্থিতি দেখা যায় পাপ্পুর। এখন কার্যত দক্ষিণের নানা সভা ভরানোর দায়িত্ব থাকে তাঁর উপরে।সেই সূত্রেই দক্ষিণ কলকাতা জুড়ে তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য। এর মধ্যেই গোলপার্ক এলাকায় একটি বাড়ির প্রোমোটিংয়ের দায়িত্ব পাপ্পুর ছেলেরা পাওয়ার পরেই কাঁকুলিয়ারোডে বাপি বনাম পাপ্পু গোষ্ঠীর সংঘর্ষ হয়। পুলিশ ২৩ জনকে গ্রেফতার করলেও যুযুধান দুই গোষ্ঠীর মাথাদের এখনও ধরতে পারেনি। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে বাপি এবং পাপ্পু, কেউই ফোন ধরেননি।

পুলিশের এক কর্তার দাবি, ‘‘পাপ্পু ছাড়া তেমন কোনও নাম আর দক্ষিণ কলকাতায় নেই।অনেকেই রাজনীতিতে ভিড়ে গিয়েছেন। কেউ কেউ আবার কল সেন্টার খুলে সাইবার প্রতারণার ফাঁদ পাতার কাজ করছেন। এই ধরনের অপরাধে শেখ বিনোদেরমতো লোকও সম্প্রতি গ্রেফতার হয়েছেন।’’

যদিও দক্ষিণ-পূর্ব কলকাতার গুলশন কলোনি ও কসবা অঞ্চলও পুলিশের কপালে ভাঁজ ফেলেছে বার বার। আন্তর্জাতিকজলাভূমি সংরক্ষণ প্রকল্প রামসার সাইটের তালিকাভুক্ত হওয়ায় এই অংশে যে কোনও রকমের নির্মাণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু অভিযোগ, আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলতেই থাকে নির্মাণকাজ। নির্মাণ ঘিরেই টাকা ওড়েএখানে। অভিযোগ, বখরার ভাগ নিয়েই কসবা এলাকায় চলতে থাকে দুই পুরপ্রতিনিধির অনুগামীদের মধ্যে লড়াই!

অনেকেরই দাবি, গুলশন কলোনি বা মার্টিনপাড়ার মতো এলাকা এক ঝলক দেখলে বোঝাইযায় না যে, সেগুলি কলকাতা শহরের অংশ। এই দুই এলাকা থেকেই সাম্প্রতিক অতীতে একাধিক দুষ্কৃতী, এমনকি, জঙ্গিও ধরা পড়েছে। গুলশন কলোনির পাশের একটি বিরাট জলাভূমি বুজিয়ে হাতবদল করা হয়ে গিয়েছে। সেইজমির দখল ঘিরেই গুলশন কলোনির নির্মাণ ব্যবসায়ী জুলকার আলির সঙ্গে কয়েক মাস আগে ১০৮ নম্বর ওয়ার্ডের শাসকদলের পুরপ্রতিনিধি সুশান্ত ঘোষের ঘনিষ্ঠ হায়দর আলির বিবাদ প্রকাশ্যে আসে। সেইসূত্রেই সুশান্তকে খুনের ছক কষা হয়েছিল বলে পুলিশি তদন্তে জানা যায়। গুলশন কলোনির মহম্মদ ফিরোজ খান ওরফে ‘মিনি ফিরোজ’ ও শেখ সাদ্দামেরগোষ্ঠীর সংঘর্ষও খবরের শিরোনামে এসেছে বার বার। পুরপ্রতিনিধি সুশান্ত যদিও বললেন, ‘‘দুষ্কৃতীরা গন্ডগোল করে। এর সঙ্গে রাজনীতির যোগ নেই।’’

একই রকম গন্ডগোল চলে যাদবপুরের শহিদ স্মৃতি কলোনির সুশান্ত নস্কর ও মতিদাস ওরফে মধুর গোষ্ঠীর মধ্যে। তাঁরা নিজেরাই জানাচ্ছেন, বস্তিকে দু’ভাগে এই দু’জনের মধ্যে ভাগ করেদিয়েছেন নেতারা। কোন নেতা, তা অবশ্য খোলসা করেননি কেউই। কিন্তু বস্তির বাইরের দখল কার?এই নিয়েই গুলি চলে, বোমা পড়ে যাদবপুরে।

(চলবে)

আরও পড়ুন