আশ্রয়: মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘিতে সারমেয়গুলি। — নিজস্ব চিত্র।
শহরে থাকলেও ওদের কোনও স্থায়ী ঠিকানা ছিল না। গত কয়েক বছরে কখনও মানিকতলা, কখনও যাদবপুর, কখনও জোড়াসাঁকো থানায় থাকতে হত তাদের। ওসির (অফিসার ইন-চার্জ) বদলির সঙ্গে তাঁর পোষ্য কালু-ভুলুদের ঠিকানাও তাই বদলে যেত বার বার। অবশেষে ওই পুলিশ আধিকারিকের উদ্যোগেই শহর পেরিয়ে জেলায় স্থায়ী ঘর পাচ্ছে শহরের ১০টি সারমেয়। তাদের দেখাশোনার জন্য সর্বক্ষণ থাকছেন দু’জন। পুলিশ আধিকারিকের তত্ত্বাবধানে জেলার এই ঘরই আপাতত হবে কালু-ভুলুর স্থায়ী ঠিকানা।
কলকাতা পুলিশের ইনস্পেক্টর মৃণালকান্তি মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে ১০টি পথ কুকুরের জন্য মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘির ছামুগ্রামে ওই পাকা ঘরের বন্দোবস্ত হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় কলকাতা থেকে ওই কুকুরদের সেখানে নিয়েও যাওয়া হয়েছে। মৃণালকান্তির কথায়, ‘‘আমাদের তো বদলির চাকরি। আজ এখানে, তো কাল ওখানে। কোথায় কখন থাকি, কিছুই ঠিক থাকে না। বার বার জায়গা বদলের ফলে ওদেরও সমস্যা হত। এ বার একটা স্থায়ী ঠিকানা হল।’’
মৃণালকান্তির সঙ্গে এই পোষ্যদের ‘যোগাযোগ’ শুরু ২০১৯ সালে। তিনি তখন কড়েয়া থানার ওসি। নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে ১৬টি কুকুরছানাকে পিটিয়ে মেরে ফেলার অভিযোগ ওঠে। দু’টি কুকুরছানা কোনও মতে পালিয়ে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচেছিল। পশুপ্রেমীদের একটি সংগঠনের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছিলেন মৃণালকান্তি। বেঁচে যাওয়া সেই দুই কুকুরছানাকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। নাম দেন কালু-ভুলু। থানার ভিতরেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে দুই কুকুরছানার থাকার ব্যবস্থা করেন মৃণালকান্তি। সেই থেকে কালু-ভুলু ওসির সঙ্গেই থেকে গিয়েছে।
পরবর্তী সময়ে কড়েয়া থেকে বদলি হয়ে মৃণালকান্তি যান মানিকতলা থানায়। যদিও দুই কুকুরছানাকে ফেলে আসেননি। কড়েয়া থেকে নিয়ে চলে এসেছিলেন। এর পর থেকে মানিকতলা থানাই ছিল তাদের ঠিকানা।
জানা গিয়েছে, মানিকতলা থানায় থাকার সময়ে স্থানীয় আরও কয়েকটি কুকুর কালু-ভুলুর সঙ্গী হয়। থানা চত্বরেই তাদের জন্য ঘরের ব্যবস্থা করা হয়। ওসির তত্ত্বাবধানে তিন বেলা তাদের জন্য আলাদা করে রান্না হত। নিয়মিত তাদের দেখে যেতেন পশু চিকিৎসকেরা। এর পরে চাকরির নিয়মে মানিকতলা থেকে যাদবপুর হয়ে জোড়াসাঁকো থানায় বদলি হয়েছেন মৃণালকান্তি। ওসির সঙ্গে বার বার ঠিকানা বদলেছে তাঁর পোষ্যদেরও। সেই সঙ্গে বেড়েছে তাদের সংখ্যা। যদিও পোষ্যদের কাছছাড়া করেননি দুঁদে পুলিশ আধিকারিক।
তবে রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আগে জোড়াসাঁকো থানা থেকে মৃণালকান্তিকে বদলি হয়ে চলে যেতে হয় কলকাতা পুলিশের এনফোর্সমেন্ট শাখায়। জোড়াসাঁকো থানা থেকে দশ পোষ্যকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। নাদিয়াল থানা এলাকায় একটি অস্থায়ী বন্দোবস্ত করা হয় তাদের জন্য। ভোটের আগে থেকে সেখানেই ছিল ওই সারমেয়রা। এ বার সেখান থেকে পাকাপাকি ভাবে দশটি কুকুরকে নিয়ে যাওয়া হল মুর্শিদাবাদে।
কাজের প্রয়োজনে আপাতত মৃণালকান্তি পরিবার নিয়ে কলকাতায় থাকলেও তাঁর গ্রামের বাড়ি সাগরদিঘির ছামোগ্রামে। সেখানেই তাঁর পোষ্যদের জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় নাদিয়াল থানা এলাকা থেকে ছোট মালবাহী গাড়িতে ওই দশ পোষ্যকে তাদের নতুন ঠিকানায় নিয়ে যাওয়া হয়। শনিবার সকালে মুর্শিদাবাদের নতুন ঠিকানায় পৌঁছে যায় গাড়িটি। এতটা ধকল সয়ে পোষ্যদের প্রত্যেকেই সুস্থ রয়েছে বলে জানালেন মৃণালকান্তি। তাঁর কথায়, ‘‘আমার বেড়ে ওঠা সাগরদিঘিতে। কত স্মৃতি জড়িয়ে। কাজের চাপে এখন তো আর যাওয়া হয় না। ওদের মায়ায় হয়তো এ বার যাতায়াত বাড়বে।’’