তারাতলার বিপর্যস্ত গুদাম। — ফাইল চিত্র।
বহুতল উঠবে অথচ নির্মাণস্থলের মাটির পরীক্ষাই হয়নি! তাই মাটির পরীক্ষার রিপোর্ট পুরসভায় জমাও পড়েনি। বিল্ডিং প্ল্যানে জানানো হয়েছিল, ‘সলিড পিলার’-এর (ইট বা কংক্রিটের স্তম্ভ) উপরে ছাদ ঢালাই হবে। কিন্তু তার জায়গায় বসানো হয়েছে লোহার বিম! এমনকি, ‘স্ট্রাকচারাল প্ল্যান’ জমা না-দিয়েই পাশ হয়েছিল বিল্ডিং প্ল্যান। লালবাজার সূত্রের খবর, তারাতলার গুদাম বিপর্যয়ের তদন্তে নেমে এমনই সব কাণ্ডকারখানার কথা জানতে পেরেছে কলকাতা পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট)। পুলিশের একাংশের বক্তব্য, নির্মাণ ও নকশায় এমনই নানা আইন বহির্ভূত কাজ হয়েছিল এবং গুদাম ভেঙে পড়ার পিছনে সেটা অন্যতম বড় কারণ। পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, এই তদন্তে দ্রুত চার্জশিট দেওয়ার চেষ্টা হবে। সেখানে এই সব তথ্য বিশদে থাকবে।
পুলিশের খবর, এই ঘটনায় আরও কয়েক জনকে গ্রেফতার করা হতে পারে। প্রসঙ্গত, এই ঘটনায় কলকাতার মেয়র থাকাকালীন ফিরহাদ হাকিমের ওএসডি তথা পুরসভার অফিসার কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে গ্রেফতার করেছে সিট। কালীচরণের পিছনে ‘রক্ষাকর্তা’ ছিলেন বলেও জানিয়েছেন তদন্তকারীরা। এরই মধ্যে শনিবার প্রাক্তন মেয়র তথা কলকাতা বন্দরের বিধায়ক ফিরহাদের বিরুদ্ধে তারাতলা থানায় লিখিত অভিযোগ জানিয়েছে শ্রমিক সংগঠন ভারতীয় জনতা মজদুর সেল। তাদের বক্তব্য, দুর্ঘটনা নয়, মানুষের অপরাধে বিপর্যয় ঘটেছে। পুলিশের পাশাপাশি বন্দর এলাকার দুই প্রাক্তন কাউন্সিলর আনোয়ার খান এবং শামস ইকবালের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে খবর, অভিযোগ খতিয়ে দেখে এই মামলার এফআইআরের সঙ্গে তা যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ভারতীয় জনতা মজদুর সেলের সভাপতি এম বি মহেশ বলেন, ‘‘প্রাক্তন মেয়রের অজ্ঞাতে এত বড় দুর্নীতি হতে পারে না। তিনি বন্দর এলাকার বিধায়কও। ফলে তিনি সব জানেন। তাঁকেও পুলিশ হেফাজতে নিয়ে তদন্ত করুক। একই ভাবে ৮০ নম্বর ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধি আনোয়ার ও ১৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধি শামস এই নির্মাণ সিন্ডিকেটের নানা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। অতীতে গার্ডেনরিচে বহুতল ভেঙে বহু মানুষের মৃত্যুর ঘটনাতেও এঁদের ভূমিকা ছিল।’’ ফিরহাদের ফোন বেজে গিয়েছে। টেক্সট এবং ওয়টস্যাপ মেসেজের উত্তর মেলেনি। আনোয়ার খানের ফোন সুইচড অফ মিলেছে। শামস ইকবালকে ফোন করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন। পরে জনৈক ব্যক্তি অজানা মোবাইল নম্বর ফোন থেকে ফোন করে বলেন, ‘‘আপনি কি শামস ইকবালকে ফোন করেছিলেন? আপনার মেসেজ ওঁকে দিয়ে দিচ্ছি।’’ সেই উত্তর রাত পর্যন্ত আসেনি।
পুলিশ সূত্রের খবর, এই তদন্তে কলকাতা পুরসভার অন্দরের নানা দুর্নীতি সামনে আসছে। ইতিমধ্যেই কালীচরণকে জেরা করে পাওয়া নথিও চরম দুর্নীতি ও গাফিলতির দিকে ইঙ্গিত করছে। এক পুলিশ কর্তার দাবি, “পুরনো বা কঠিন পরিস্থিতিতে আছে এমন জায়গায় নির্মাণের জন্য কিছু ক্ষেত্রে জমি পরীক্ষার রিপোর্ট জমা দেওয়ার ব্যাপারে ছাড় দেওয়া হলেও বাকি সমস্ত ক্ষেত্রে এই রিপোর্টের প্রয়োজন হয়। তারাতলার ওই জমি পরীক্ষার ব্যাপারে জটিলতা ছিল বলে তদন্তে উঠে আসেনি।” তাঁর দাবি, শুধু জমি পরীক্ষা নয়, নির্মাণের অনুমতি জন্য প্রয়োজনীয় নথির অধিকাংশই, যেমন সার্ভে রিপোর্ট, স্ট্রাকচারাল রিপোর্ট, পুরসভায় জমা পড়েনি।” এক পুলিশ অফিসারের ব্যাখ্যা, স্ট্রাকচারাল রিপোর্টে নির্মাণের সমস্ত রকম খুঁটিনাটি থাকে। যেমন, নির্মাণে কী ধরনের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে, কী ভাবে নির্মাণকাজ করা হবে, সব জানাতে হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে পরে ওই রিপোর্ট দেওয়া হবে জানিয়ে বিল্ডিং প্ল্যান পাশ করিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পুলিশের দাবি, কাটমানি-র ভিত্তিতেই এই নিয়ম ভাঙা হয়েছিল।
পুলিশ সূত্রের খবর, অন্তত তিন কোটি ৮০ লক্ষ টাকার লেনদেন এ ক্ষেত্রে হয়ে থাকতে পারে বলে তদন্তে উঠে আসছে। কয়েক হাত ঘুরে সেই টাকা কোন পর্যন্ত গিয়েছিল, তার খোঁজ করছেন গোয়েন্দারা। বন্দর এলাকার নির্মাণ সিন্ডিকেট থেকে আরও বেশ কিছু জায়গায় এমন বেআইনি কাজ হয়েছে বলেও পুলিশের দাবি। সিট সূত্রেই খবর, অন্তত ভিত তৈরি হওয়ার পরেই স্ট্রাকচারাল রিপোর্ট জমা পড়ে যাওয়ার কথা পুরসভায়। অন্যথায় কোনও নির্মাণেই ছাড়পত্র পাওয়ার কথা নয়। এ ক্ষেত্রে নির্মাণ চলেছে শুধু তা-ই নয়, কংক্রিটের পিলারে কাজ হবে বলে ব্যবহার হয়েছে কম ক্ষমতা-সম্পন্ন লোহার বিম। তারই খেসারত দিতে হল এতগুলি মানুষকে।
সহ-প্রতিবেদন: মেহবুব কাদের চৌধুরী