উচ্ছেদের পরে জীবিকা এখন ঘোর অনিশ্চয়তায়। বারবার চেষ্টা করেও রেল কর্তৃপক্ষ বা সরকারের কোনও বার্তা, আশ্বাস কিছুই মিলছে না। দমদম স্টেশন চত্বরে গলায় প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে ভিক্ষা করে প্রতিবাদে নেমেছেন দোকানদার ও হকারেরা। —নিজস্ব চিত্র।
সম্প্রতি দমদম স্টেশন চত্বরে অবৈধ অভিযোগে হকারদের স্টল উচ্ছেদ করেছে রেল। রুটি-রুজি হারানো সেই হকারদের একাংশ গলায় প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে বিকল্প ব্যবস্থার দাবিতে ভিক্ষাপাত্র হাতে স্টেশনের বাইরে বসলেন। পাশাপাশি, উচ্ছেদের প্রতিবাদে রাজ্যের নানা প্রান্তে বাম, কংগ্রেস-সহ বিভিন্ন দল এবং সংগঠন প্রতিবাদের স্বর চড়া করেছে। উল্টো দিকে, বিজেপি নেতৃত্বের একাংশ রেলের কাছে তাদের বাড়তি জায়গায় হকারদের পুনর্বাসন দেওয়ার দাবি করছেন।
আন্দোলনকারীদের সূত্রে দাবি, দমদমে প্রায় ৩৪০টি স্টল উচ্ছেদ হয়েছে। সব মিলিয়ে অন্তত হাজার দেড়েক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উচ্ছেদের পরে ফল বিক্রেতা-সহ কয়েক জন হকার দমদম স্টেশনের আশপাশে শুধুমাত্র ঝুড়ি নিয়ে বসছেন। আর রুজি হারানো হকারদের একাংশ বুধবার ওই চত্বরেই গলায় প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে ভিক্ষাপাত্র হাতে বসেছিলেন। তাঁদেরই এক জন কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “উচ্ছেদ করে রেল আমাদের পথের ভিখারি করে দিয়েছে। আমরা যাতে করে খেতে পারি, সেই ব্যবস্থা করুন।” পাশেই থাকা এক মহিলার বক্তব্য, “মুখ্যমন্ত্রী আমাদের সোনার বাংলার থালা দিয়েছেন! কোথায় কাজ পাব বলুন?” পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদের তীব্র প্রতিবাদ করছে সিপিএম, সিপিআই (এম-এল) লিবারেশন-সহ বিভিন্ন বাম দল। আগাগোড়া উচ্ছেদ-বিরোধী আন্দোলনে থাকা সিপিএম নেতা ময়ূখ বিশ্বাস এ দিন ছিলেন প্রতিবাদীদের পাশেই। তিনি বলেছেন, “আমরা রেলকর্তাদের কাছে গিয়ে শুনি, উচ্ছেদ হবে না। অথচ পুনর্বাসন না-দিয়ে বৃহৎ পুঁজির স্বার্থে গরিব মানুষের পেটে লাথি মারা হল।” ন্যায্য ভোটারদের ভোটাধিকার ফেরানো, ‘বুলডোজ়ার রাজ’ রোখার ডাক দিয়ে বালিগঞ্জে সমাবেশও করেছে সিপিএম।
চাকদহের বিজেপি বিধায়ক বঙ্কিম ঘোষ অবশ্য বলেছেন, “স্টেশন হকারি করার জায়গা নয়। আগে শাসক দল হকারদের বসিয়ে টাকা তুলেছে। এত দিন সেখানে হাত দেওয়ার সাহস কেউ দেখাননি। আমাদের এলাকায় হকারদের সঙ্গে কথা বলেছি। রেল যাতে তাদের বাড়তি জায়গায় হকারদের পুনর্বাসন দেয়, তা বলেছি। এখনও পর্যন্ত আমাদের এলাকায় পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ হয়নি।”
এরই মধ্যে কলেজ স্ট্রিটের বই-ব্যবসায়ীদের একাংশ দাবি করেছেন, পুরসভা লিখিত ভাবে কিছু না-বললেও, মৌখিক ভাবে বলা হয়েছে, রাস্তার উপরে বই রাখা যাবে না। এই আবহে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, “জানি না এটা গুজব কি না। কিন্তু বইপাড়াকে আক্রমণের অর্থ, বাংলার সংস্কৃতির মূলে কুঠারাঘাত করা। মানুষ তা রুখবেন। বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, হকার উচ্ছেদ করতে দেবেন না। এখন চুপ!” কলেজ স্ট্রিটে ইতিমধ্যেই আলাদা করে প্রতিবাদ কর্মসূচি করেছে এসইউসি, সিপিএম। হয়েছে নাগরিক মিছিল। ‘শিল্পী সাংস্কৃতিক কর্মী বুদ্ধিজীবী মঞ্চে’র তরফে দিলীপ চক্রবর্তী, সান্টু গুপ্ত বলেছেন, ‘পুরনো বইয়ের দোকানে গুরুত্বপূর্ণ ও দুষ্প্রাপ্য বই স্বল্পমূল্যে সংগ্রহ করার সুযোগ পান পড়ুয়া, শিক্ষক, গবেষকেরা। ঐতিহ্যবাহী বইপাড়ায় উচ্ছেদের তীব্র বিরোধিতা করি। পুনর্বাসন ছাড়া বইপাড়া-সহ রাজ্যের কোথাও যাতে হকার উচ্ছেদ না-হয়।’ উচ্ছেদের বিরুদ্ধে বাঘা যতীন স্টেশনে পতাকা ছাড়া মিছিল হয়েছে।
পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ বন্ধ, অবৈধ নির্মাণের অনুমতিদাতাদের চিহ্নিত করা-সহ নানা দাবিতে ১০ তারিখ লোকভবন (রাজভবনের বর্তমান নাম) অভিযানের ডাক দিয়েছে প্রদেশ কংগ্রেস। একই বিষয়ে নারকেলডাঙা ব্রিজ থেকে রাজাবাজার মোড় পর্যন্ত মিছিল করেছে যুব কংগ্রেস। গরিফায় রেলের উচ্ছেদ-নোটিসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বাম দলের নেতৃত্বে হাই কোর্টে মামলা দায়ের হয়েছে।