কলকাতার পুলিশ কমিশনার হিসাবে এক মাস পূর্ণ হর সুপ্রতিম সরকারের। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
তিনি সুলেখক। তাঁর লেখা ‘গোয়েন্দাপীঠ’ সিরিজ় পাঠকমহলে জনপ্রিয় এবং সমাদৃত। লেখার পাশাপাশি তিনি কি ‘সহস্র এক আরব্য রজনী’ মনোযোগ সহকারে পড়েছেন? নইলে বাগদাদের বাদশা হারুন অল রশিদের মতো রাতবিরেতে ছদ্মবেশে নিজের রাজ্যপাট ঘুরে দেখতে বেরোবেন কেন?
কখনও তিনি লাফিয়ে নামছেন শহরের রাস্তায়। হাতেকলমে ট্র্যাফিক সামলাতে। আবার কখনও সমাজমাধ্যমে কী কী লিখতে হবে আর কী কী লেখা যাবে না, তার পাঠশালা খুলে বসছেন।
তিনি সুপ্রতিম সরকার। কলকাতার পুলিশ কমিশনার। সদ্য সদ্য এক মাস পূরণ হল তাঁর দায়িত্বপ্রাপ্তির। ঘটনাচক্রে, গত এক মাসে শহরে ‘ধর-ধর ওই চোর’ মার্কা তেমন কোনও বড়সড় ‘কাণ্ড’ ঘটেনি। কিন্তু নগরকোটালকে চোখে পড়েছে বারবার। দায়িত্ব পেয়ে প্রথম দিনই সুপ্রতিম অধস্তন পুলিশ আধিকারিকদের নিয়ে ভার্চুয়াল মাধ্যমে বৈঠকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ‘কথা’ নয়, তিনি ‘কাজ’ দেখতে চান। তিনি চান তাঁর বাহিনীকে রাস্তায় ‘দেখতে এবং দেখাতে’। কারণ, তাঁর যুক্তি, পুলিশকে রাস্তায় দেখলে সাধারণ মানুষ নিরাপদ বোধ করবেন। তাঁদের পুলিশের উপর ভরসা বাড়বে। বলে দিয়েছিলেন, কলকাতা পুলিশের মধ্যে এলাকা নিয়ে দায় ঠেলাঠেলি চলবে না। মানুষ অভিযোগ জানাতে এলে তা নিতে হবে। এলাকা অন্য থানার আওতায় বলে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। মানুষকে ভরসা দিতে হবে। কমিশনারের দায়িত্ব পেয়ে শুরুতেই সুপ্রতিম দু’টি বিষয়ে জোর দিয়েছিলেন— ‘মবিলিটি’ (গতিশীলতা) এবং ‘ভিজ়িবিলিটি’ (দৃশ্যমানতা)।
পুলিশের উপর নাগরিকদের ভরসা বেড়েছে কিনা, তা তর্কসাপেক্ষ। তবে কমিশনার নিজে দৃশ্যমান হয়েছেন (এবং হচ্ছেন অবিরত) বার বার। কখনও রাত ১১টার শুনশান রাস্তায় সাদা পোশাকে হেঁটে নাটকীয় ভাবে থানায় ঢুকেছেন সাধারণ নাগরিক হিসাবে ফর্ম পূর্ণ করে মোবাইল হারানোর অভিযোগ লেখাতে। উদ্দেশ্য, রাতবিরেতে পুলিশকর্মীরা সতর্ক আছেন কি না, কেউ অভিযোগ জানাতে এসে হেনস্থার মুখে পড়ছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা। কখনও নেমে পড়েছেন গড়িয়াহাট কিংবা ধর্মতলার ব্যস্ত মোড়ে ট্র্যাফিক পুলিশের কাজ দেখতে! সন্দেহ নেই, এতে তাঁর পূর্বসূরিদের উল্টো স্রোতে হাঁটা আছে। আছে ছাপ রেখে যাওয়ার চেষ্টা।
ছাপ রাখার চেষ্টা আছে ‘চেনা’ মাঠেও। সুপ্রতিম একসময় কলকাতার যুগ্ম কমিশনার (ট্র্যাফিক) ছিলেন। অতিরিক্ত কমিশনার হিসাবেও ট্র্যাফিকের দায়িত্ব সামলেছেন। কমিশনারের পদে বসেই তিনি ট্র্যাফিকের ‘খামতি’ মেরামত করতে রাস্তায় নেমে পড়েছেন। ঘটনাচক্রে, সুপ্রতিম কমিশনার হওয়ার পরে ফেব্রুয়ারির গোড়ায় ডায়মন্ড হারবার রোডে পর পর কয়েকটি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল পাঁচ জনের। পুলিশের আধিকারিকেরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আলাদা করে এলাকার অটো ও রিক্সাচালকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁদের ট্র্যাফিকের নিয়মকানুন বোঝানো হয়েছে। ‘সচেতনতা’ তৈরি করতে দেওয়ালে দেওয়ালে পোস্টার সাঁটা হয়েছে। শহরের ২৬টি মোড়ও ‘চিহ্নিত’ করেছে সুপ্রতিমের বাহিনী। তাঁর নির্দেশ মেনে পদস্ত আধিকারিকেরা নিয়মিত সেগুলি পরিদর্শনেও যান। পুলিশে ‘সারপ্রাইজ় ভিজ়িট’ সংস্কৃতি চালু করেছেন সুপ্রতিম। পুলিশ অফিসারেরা গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার মোড়গুলিতে আচমকা পৌছে যাচ্ছেন। সে পরিকল্পনা তিনি নিজেই জানিয়েছেন। ‘রুটিন পুলিশিং’-এর পাশাপাশি ‘অন রুট পুলিশিং’ (ওআরপি) চালু করেছেন। অর্থাৎ, সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলিতে ওসি, ডিসি এবং এসি পদমর্যাদার আধিকারিকেরা একসঙ্গে নামছেন। সপ্তাহে এক বা দু’দিন ‘সারপ্রাইজ় ভিজ়িট’ হচ্ছে। বস্তুত, অনেকে মনে করছেন, ‘ভিজিট’ এত ঘন ঘন হচ্ছে যে, তা আর ‘চমক’ বা ‘সারপ্রাইজ়’ থাকবে কিনা সন্দেহ!
একদা তাঁর উদ্যোগেই কলকাতা পুলিশের ফেসবুক পেজ সক্রিয়, সুললিত এবং সুভাষিত হয়েছিল। কিন্তু পাশাপাশিই পুলিশবাহিনীর সদস্যদের একাংশ সমাজমাধ্যমে যথেচ্ছ পোস্ট করতে শুরু করেছিলেন। ফলে যিনি একসময় পুলিশকে সমাজমাধ্যমে সক্রিয় করেছিলেন, বাহিনীর প্রধান হয়ে তাঁকে সেই বাহিনীর উপরেই রাশ টানতে হচ্ছে। প্রকাশ করতে হচ্ছে ‘নির্দেশিকা’। এই মর্মে যে, পুলিশকর্মীরা ‘ব্যক্তিগ’ত স্তরে কী ভাবে সমাজমাধ্যম ব্যবহার করবেন, তাঁদের কোন কোন সতর্কতা মেনে চলতে হবে। এমন মোট ১৫টি নির্দেশ রয়েছে। যেমন কর্তব্যরত অবস্থায় বা অন্য সময়েও পুলিশকর্মীর আচরণ সমগ্র পুলিশ বিভাগ তথা সরকারের প্রতিফলন। তাই ভেবেচিন্তে কাজ করতে হবে। আলটপকা মন্তব্য করা যাবে না। বাস্তবের সঙ্গে নিজস্ব মতামত মেলানো যাবে না। তদন্ত সংক্রান্ত কোনও তথ্যও প্রকাশ করা যাবে না। ব্যক্তিগত সমাজমাধ্যমে এমন কিছু লেখা যাবে না, যাতে ‘বিচারাধীন’ ঘটনা সম্পর্কে জনমানসে কোনও ধারণা তৈরি হয়ে যায়। রাজনৈতিক ঘটনা, সরকারি নীতি বা ধর্মীয় বিষয়েও ‘বিতর্কিত মন্তব্য’ করা যাবে না। সমাজমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য ‘অফিশিয়াল ইমেল আইডি’ও ব্যবহার করার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। বলা হয়েছে, এর ব্যত্যয় হলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কমিশনারের নির্দেশিকা নিয়ে বাহিনীর অফিসারদের বিভিন্ন মতামত রয়েছে। প্রবীণেরা বলছেন, ‘‘আমরা ইস্কুলের পুরোন ছাত্র। আমরা জানি, কার এক্তিয়ার কতটা। এটা আমাদের জন্য নয়, নতুনদের জন্য।’’ এক ‘নতুন’ বলছেন, ‘‘আমরা তো এসব জানি। মেনেও চলি। এ বার কি ব্লক-টকও করতে হবে নাকি?’’ এর স্বভাবরসিক অফিসারের কথায়, ‘‘সিপি স্যর নিজেই বোতলের দৈত্যকে বার করেছিলেন। সে-ও মহানন্দে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন স্যরকেই আবার সেই দৈত্যকে বোতলে ঢোকানোর বন্দোবস্ত করতে হচ্ছে!’’
সমাজমাধ্যম ‘শিক্ষআ’ তো বটেই, নতুন কমিশনার মনে করিয়ে দিয়েছেন সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা এবং পরিচ্ছন্ন উর্দি ব্যবহারের কথাও।
মহিলাদের নিরাপত্তাতেও বিশেষ জোর দিয়েছেন কমিশনার। গত শনিবারেই নতুন দুই উদ্যোগ শুরু হয়েছে। মহিলাদের নিরাপত্তায় ‘পিঙ্ক বুথ’ শুরু করা হয়েছে। উদ্বোধনে নিগিয়ে সুপ্রতিম জানিয়েছেন, প্রতি দিন সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত মহিলা পুলিশকর্মীরা ওই বুথগুলিতে থাকবেন। পথচলতি মহিলারা সমস্যায় পড়লে সেখানে যোগাযোগ করতে পারবেন। শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলিতে রাত ৮টা থেকে রাত ২টো পর্যন্ত টহল দেবে মহিলা পুলিশের বিশেষ বাহিনী ‘শাইনিং’ (নাম দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়)। মহিলারা মহিলা পুলিশের কাছে নিজেদের সমস্যা দ্বিধাহীন ভাবে জানাতে পারবেন ভেবেই এই উদ্যোগ। প্রসঙ্গত, কলকাতা পুলিশে মহিলাদের টহলদারি বাহিনী ‘উইনার্স’ আগে থেকেই ছিল। তারা দ্বিচক্রযানে নিয়মিত শহরে টহল দেয়।
তবে ঘটনাচক্রে, তাঁর শাসনকালের এক মাসে শহরে দু’দিন বোমাতঙ্ক ছড়িয়েছে। প্রথমে নগর দায়রা আদালতে এবং পরে পাসপোর্ট অফিসে। তার কোনও কিনারা হয়েছে বলে অন্তত প্রকাশ্যে জানায়নি পুলিশ। ধর্মতলার রাস্তায় সারপ্রাইজ় ভিজ়িটরত কমিশনারকে প্রশ্ন করায় সংক্ষিপ্ত জবাব মিলেছে, ‘‘ওটা এসটিএফ দেখছে।’’
কমিশনার সুপ্রতিমের প্রথম এক মাসে চমক আছে। নতুন উদ্যোগ আছে। আছে নাটকীয়তাও। কিন্তু কমিশনারের দায়িত্ব নেওয়ার পর দিনই ভরসন্ধ্যায় গোল পার্কের কাছে রবীন্দ্র সরোবর থানা এলাকায় দুষ্কৃতী তান্ডবে জড়িতদের চাঁই সোনা পাপ্পুর হদিস এখনও পাননি সুপ্রতিম এবং তাঁর বাহিনী। ওই ঘটনায় বোমা পড়েছিল। গুলি চলেছিল। ভাঙচুর হয়েছিল পুলিশের গাড়ি। ওই ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে এখনও পর্যন্ত মোট ২৪ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। কিন্তু এলাকার কুখ্যাত দুষ্কৃতী সোনা এখনও অধরা। যদিও গোপন আস্তানা থেকে তাঁর ফেসবুক ‘লাইভ’ ছড়িয়ে পড়েছে দিগ্দিগন্তে।
তবে অনেকে এ-ও বলছেন যে, গত এক মাসে কলকাতায় বড়সড় ‘কাণ্ড’ ঘটেনি। তার কৃতিত্ব নতুন কমিশনারেরই। তাঁর ‘সক্রিয়তা’ শহর কলকাতার বুকে বড় ঘটনা ঘটতে দেয়নি। পুলিশের কাজ শুধু অপরাধীকে ধরাই নয় অপরাধ আটকানোও। তাঁরাই বলছেন, গোল পার্কের সোনাকে গ্রেফতার করতে না-পারলেও বেলেঘাটার ‘দাপুটে’ তৃণমূল নেতা রাজু নস্করকে গ্রেফতার করেছে সুপ্রতিমের বাহিনী। যাঁরা বলছেন, রাজুর গ্রেফতারির পিছনে ‘ইতিবাচক রাজনৈতিক সঙ্কেত’ ছিল, তাঁদের বিশ্বাস করতে চাইছেন না সুপ্রতিম-মুগ্ধেরা।
দায়িত্ব পেয়ে কলকাতা পুলিশের ভাবমূর্তি ফেরানোয় মনোযোগী হয়েছেন নগরকোটাল। বাহিনীকে বাঁধতে চাইছেন ধ্রুপদী শৃঙ্খলার নিগড়ে। ক্রিকেটের ভক্ত সুপ্রতিম ধ্রুপদী এবং ‘কপিবুক’ পদ্ধতিতে চকচকে করতে চাইছেন পুলিশের মুখ। সমস্যা হল, এখন টি টোয়েন্টির যুগ। মানুষের ধৈর্য কম। তারা দ্রুত ‘সোনা’ চায়!