তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ ভেঙে বিপর্যয়। ছবি: সারমিন বেগম।
তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ ভেঙে পড়ে পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। প্রাথমিক ভাবে ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পেরেছেন, ওই গুদামের নকশায় ত্রুটি ছিল। গত ১৭ জানুয়ারি কলকাতা পুরসভা সেই নকশা অনুমোদন করে। কেন ত্রুটিপূর্ণ নকশা অনুমোদন করা হল, প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি, তারাতলার সেই গুদামের নির্মাণ যথাযথ নিয়ম মেনে হচ্ছিল কি না, সেখানে পর্যাপ্ত তদারকি ছিল কি না, সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে নির্মাণের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না, নানা প্রশ্ন উঠছে। কর্তৃপক্ষের গাফিলতিকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
প্রায় ২০ হাজার বর্গফুট এলাকা জুড়ে বিস্তৃত গুদামটিতে কাজ চলছিল গত দেড় বছর ধরে। জানা গিয়েছে, জমিটি বন্দর কর্তৃপক্ষের। তাঁরা ২০২৪ সালের ১ অগস্ট বেহরা ব্রাদার্স নামের এক সংস্থাকে ওই জমি ৩০ বছরের জন্য লিজ় দেন। বেহরা ব্রাদার্সের মালিক শম্ভুনাথ বেহরা। লিজ় নেওয়া জমিতে কোনও নির্মাণকাজ করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে যথাযথ পদ্ধতি মেনে তা নেওয়া হয়েছিল কি না, প্রশ্ন উঠেছে। তবে সূত্রের খবর, বন্দর কর্তৃপক্ষ তাঁদের জমিতে নির্মাণ নিয়ে প্রাথমিক ভাবে কোনও আপত্তি করেননি। ইমারত বিশেষজ্ঞ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘এই রকম একটি বিল্ডিং, কংক্রিটের স্ল্যাব— এটায় বিল্ডিং রুল অনুযায়ী অনুমোদন দরকার। পুরসভা এই বিল্ডিংয়ের অনুমোদন দিয়েছে কি না, দেখতে হবে। এটা পোর্ট ট্রাস্টের জমি, লিজ় দেওয়া হয়েছিল। তারও কিছু শর্তাবলি থাকে। পোর্ট ট্রাস্ট এই নির্মাণের অনুমতি দিয়েছিল কি না, সব খতিয়ে দেখা উচিত। এখানে তো অনেক জমি আছে, খেয়ালখুশি মতো নির্মাণকাজ তো হতে পারে না।’’
নির্মাণের নকশা ‘ভয়ঙ্কর রকম ভুল’ বলে দাবি করেছেন বিমান। তাঁর কথায়, ‘‘নির্মাণের কাঠামোগত নকশা ভয়ঙ্কর রকম ভাবে ভুল। তা না হলে এ ভাবে কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে না। এটা নকশার ব্যর্থতা। নির্মাণকাজের পরিচালনা কী ভাবে হয়েছে, আমরা জানি না। কেউ কি নির্মাণকাজের তদারকি করছিলেন? বোঝা যাচ্ছে না। অনুমোদন যদি পেয়ে থাকে, সেই অনুযায়ী নির্মাণকাজ হয়েছে কি না, সেটাও দেখা দরকার। নিয়ম মেনে কাজ হলে মানুষকে এত অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়তে হত না।’’
বুধবার বেলা ১২টা ৭ মিনিটে তারাতলার গুদামের লোহার কাঠামো-সহ ছাদ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। নীচে সেই সময় কাজ করছিলেন অন্তত ৪০ জন শ্রমিক। ঘটনাস্থল ঘুরে দেখে দমকল থেকে শুরু করে পুরসভার আধিকারিকেরা একাধিক সম্ভাবনার কথা বলছেন। প্রথমত, নির্মাণকাজে যে উপাদান এবং সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছিল, তার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। দ্বিতীয়ত, বৃষ্টির কারণে মাটি বসে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে কেউ কেউ দাবি করছেন। তবে মুখ্যমন্ত্রী সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন। শুভেন্দু ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর বলেন, ‘‘আমি ইঞ্জিনিয়ার নই। তবে ঘটনাস্থল দেখে আমার মনে হয়েছে, বৃষ্টিতে মাটি বসে এই দুর্ঘটনা নয়। তা হলে লোহার বিম এই ভাবে বেঁকে যেত না। লোহার কাঠামোর নাট খুলে স্লিপ করে বেরিয়ে গিয়েছে।’’
দুর্ঘটনার জন্য আগের জমানার শাসন এবং পুরসভার গাফিলতিকেই কাঠগড়ায় তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। উল্লেখ্য, বেহরা ব্রাদার্সের এই নির্মাণ নিয়ে গত মে মাসেই প্রশ্ন তুলেছিল বাম শ্রমিক সংগঠন। তারা কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণও করেছিল। নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত ঠিকাদার আসগরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল আগেই। অভিযোগ, আসগর বেআইনি কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, আসগর এলাকার পরিচিত ঠিকাদার। স্থানীয় নেতা ও কাউন্সিলরদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল। এলাকায় একচেটিয়া কাজ করতেন তিনিই। ত্রুটিপূর্ণ নকশায় অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে পুরসভার নির্দিষ্ট কোনও আধিকারিক দায়ী কি না, নেপথ্যে বৃহত্তর কোনও চক্র সক্রিয় কি না, খতিয়ে দেখা দরকার। এ ক্ষেত্রে তৃণমূল জমানার সিন্ডিকেটরাজের দিকেও আঙুল তুলেছেন কেউ কেউ।
ইমারত বিশেষজ্ঞ বিমানের কথায়, ‘‘এখানে যে ঢালাই হয়েছিল, সেটা অনেক জায়গাতেই হয়। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনার সঙ্গে হয়েছিল কি না, নজরদারি ছিল কি না, দেখা দরকার। কোনওটাই ছিল না বলে আমার ধারণা।’’ ইতিমধ্যে কলকাতা পুলিশ তারাতলার ঘটনায় এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে। বেহরা ব্রাদার্সের প্রতিনিধিদের ডেকে পাঠানো হয়েছে। খোঁজ চলছে ঠিকাদারের।