দেবরাজ চক্রবর্তী। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
প্রোমোটার ও ব্যবসায়ীদের চমকানোই শুধু নয়। অভিযোগ, তোলা আদায় করতে অনলাইনে অনুমোদনের জন্য পাঠানো নকশার ফাইলও আটকে দেওয়া হত পুরসভার অন্দরে। নেপথ্যে কলকাঠি নাড়া হত রাজারহাট থেকে। বিধাননগর পুরসভার মেয়র পারিষদ দেবরাজ চক্রবর্তীর গ্রেফতারির পরে রাজারহাট-গোপালপুর ও রাজারহাট-নিউ টাউন, এই দু'টি বিধানসভা এলাকা থেকে এমনই অভিযোগ উঠেছে।
বিধাননগর পুরসভার অধীনে মূল সল্টলেকে প্রোমোটিংয়ের সুযোগ কম। বরং রাজারহাটের বিস্তীর্ণ এলাকা প্রোমোটিংয়ের আঁতুড়ঘর। যেখানে বেআইনি নকশা (ডি-প্ল্যান নামে স্থানীয় ভাবে পরিচিত) ব্যবহার করে প্রোমোটিং করার অভিযোগ অতীতে বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। সেই অবৈধ নকশা ব্যবহার করে তৃণমূল নেতাদের মদতে চলা বহুতল নির্মাণের ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণের কোনও চেষ্টা হয়নি বলেই অভিযোগ।
সম্প্রতি রাজারহাট-গোপালপুরের বিজেপি বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারি অভিযোগ করেছিলেন এই ডি-প্ল্যান নিয়ে। যার পিছনে দেবরাজ ছাড়াও তৃণমূলের আরও এক বড় মাপের নেতা যুক্ত বলে অভিযোগ তাঁর। এমনকি, সামগ্রিক ভাবে বেআইনি নির্মাণের পিছনে বিধাননগর পুরসভার কর্মী-আধিকারিকদের একাংশ জড়িত বলেও অভিযোগ ছিল বিধায়কের। এর পরেই প্রোমোটারদের একাংশ এই মর্মে অভিযোগ করতে শুরু করেছেন যে, অনলাইনে নকশা অনুমোদন হলেও চার-পাঁচ লক্ষ টাকা না দিলে সেই ফাইল পুর কর্তৃপক্ষের টেবিলে সইয়ের জন্য পাঠানো হত না।
প্রোমোটারদের অভিযোগ, বিধি মেনে নকশা অনুমোদনের জন্য অনলাইনে জমা দেওয়া হত। তবে অনুমোদিত ফাইল বিল্ডিং কমিটির বৈঠকে পৌঁছতে দেওয়া হত না। মোটা অঙ্কের টাকা দিলে তবেই ফাইল বিল্ডিং কমিটির বৈঠকে ও মেয়রের সইয়ের জন্য পাঠানো হত বলে অভিযোগ। এর পিছনে একটি বড় চক্র কাজ করত বলে অভিযোগ অনেকেরই।
বহু ক্ষেত্রেই নকশা তৈরির পর থেকে অনুমোদিত নকশা হাতে পাওয়ার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি এলবিএস-দের মারফত সম্পন্ন করতেন প্রোমোটারেরা। ফলে এ বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলেই মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
পুলিশ আরও অভিযোগ পেয়েছে যে, তোলাবাজি করতে গিয়ে কিছু ক্ষেত্রে প্রথমে নির্মাণ বন্ধ করে দেওয়া হত। পরে টাকা পেলে ফের কাজ চালু করতে দেওয়া হত। সে সব ক্ষেত্রে রাজারহাট-গোপালপুর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত বিধাননগর বা দক্ষিণ দমদম পুরসভার ভূমিকা কী ছিল, সেগুলি খতিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে বলে মনে করছে তদন্তকারী দল।
কী ভাবে কাজ বন্ধের নোটিস দেওয়া হত, নির্মাণে গলদ থাকলে পুরসভাগুলি পদক্ষেপ করত কিনা, কী ভাবেই বা সেই সব বন্ধ করে দেওয়া নির্মাণকাজ ফের চালু হত, সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে খবর।
এই চক্রে দেবরাজ কিংবা তাঁর বাহিনী কতটা জড়িত, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ। পুলিশ সূত্রের খবর, দেবরাজ তদন্তে সহযোগিতা করলেও অনেক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছেন। এক প্রোমোটারের অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হয়েছিল তাঁকে। প্রোমোটারদের থেকে নেওয়া টাকা অন্য কোথাও বিনিয়োগ করা হয়েছে, না কি সেই টাকা আরও বড় কোনও মাথার কাছে পৌঁছেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যাচাই করে দেখা হচ্ছে এই সংক্রান্ত কিছু সূত্র।
পুলিশ সূত্রের খবর, শনিবার সিটের তদন্তের পাশাপাশি তৃণমূলের সর্বোচ্চ বৃত্তে থাকা পলাতক এক ব্যক্তির গতিবিধি নিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে দেবরাজকে। যদিও সূত্রের খবর, গা-ঢাকা দেওয়ার সময়ে তাঁর সঙ্গে কারও যোগাযোগ ছিল না বলেই দাবি করেছেন অভিযুক্ত।
এ দিকে, রবিবার সকালে দক্ষিণ দমদমের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে একটি টেনিস অ্যাকাডেমি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তোলেন বাসিন্দারা। তা নিয়ে উত্তেজনা ছড়ায় সেখানে। বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারি ঘটনাস্থলে গেলে এলাকার বাসিন্দাদের একাংশ অভিযোগ করেন, জায়গা দখল করে ওই অ্যাকাডেমি তৈরি হওয়ায় হাওয়া চলাচল আটকে যাওয়া থেকে শুরু করে নানা সমস্যার মুখে পড়েছেন তাঁরা। এই অভিযোগেও নাম জড়িয়েছে ধৃত দেবরাজের।
প্রসঙ্গত, বিধানসভা ভোটের ফল বেরোনোর পরে ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল পুরপ্রতিনিধি সঞ্জয় দাসের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। তিনি দেবরাজ ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে অভিযোগ। তাঁর নামও উঠেছে এ দিনের অভিযোগে। বিধায়ক বাসিন্দাদের অভিযোগ শুনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার আশ্বাস দিয়েছেন।