তারাতলার দুর্ঘটনাস্থলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং-সহ নানা বিভাগের পাঁচ জন অধ্যাপকের অনুসন্ধানী দল। ছবি: সুমন বল্লভ।
বিরাট জমির মধ্যে খণ্ডহরের মতো দাঁড়িয়ে আছে ভেঙে পড়া গুদামের কাঠামো। কাছে গেলেই ভেসে আসছে দুর্গন্ধ। এ দিক-সে দিক ছড়িয়ে আছে ভাঙা নির্মাণ সামগ্রী, কংক্রিট। ৭২ ঘণ্টা ধরে চলা যান্ত্রিক শব্দ, উদ্ধারকারীদের পদধ্বনি থেমে গিয়েছে। ফিরে গিয়েছে সেনা, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ) ও তাদের পেল্লায় ক্রেন, যন্ত্রপাতি। পুলিশ সূত্রের খবর, শনিবার দুপুুরে কার্যত শেষ হয়েছে তারাতলা বিপর্যের উদ্ধারকাজ। তবে এখনই ধ্বংসস্তূপ পুরো সরানো হবে না। পুরসভা ও তদন্তকারীদের অনুমতির পর খালি করা হবে এই জমি। এ দিন কলকাতা পুলিশের অনুরোধে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার পাঁচ বিশেষজ্ঞও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। আরও কিছু পরীক্ষা ও নমুনা সংগ্রহ করা হতে পারে বলে সূত্রের খবর।
এ দিকে, এ দিন এসএসকেএম হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারে চিকিৎসাধীনদের মধ্যে দুর্বাসা মল্লা, মানিকচাঁদ কুমার, শহিদ কুমার, রাজেন্দ্র রাম, রামপ্রসাদ চৌধুরী, মহম্মদ আবিদ খান, সুরজ চৌধুরী, জৌর আলি গায়েন, দেবাশিস দাস, মহম্মদ সনু ওরফে আরমান খান, সন্দীপ পান্ডে, মুস্তাকিন গায়েন, কার্তিক পাত্র—মোট ১৩ জনকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। তবে ট্রমা কেয়ারে ক্রিটিকাল কেয়ারে এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন ভর্তি বদন মুন্ডা ও রাজেশ রুইদাস। এইচডিইউ-এ রয়েছেন বিশ্ব প্রকাশ। সাধারণ ওয়ার্ডে রয়েছেন আরও এক জন রোগী। তারাতলায় মৃতদের মধ্যে একজন অজ্ঞাতপরিচয় ছিলেন। এ দিন তাঁর পরিচয় জানা গিয়েছে। শিরচাঁদ কুমার নামে ওই ব্যক্তির দেব শনাক্ত করেছেন পরিজনেরা। এই ঘটনায় আহত শহিদ কুমার ও মানিকচাঁদ কুমারের আত্মীয় শিরচাঁদ।
এ দিন হাসপাতাল থেকে ছুটি পাওয়া দেবাশিস দাস জানান, তিনি মঙ্গলবার তারাতলায় কাজে পৌঁছন। অন্য জায়গায় দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরি মেলে। তারাতলায় দৈনিক ১ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ছিল। অতিরিক্ত আয়ের আশায় অনেকেই কাজে এসেছিলেন। দেবাশিসের সঙ্গেও তাঁর পরিচিত ন’জন কাজে এসেছিলেন। দেবাশিসের কথায়, “কিছু টাকা বেশি আয়ের জন্য কাজে গিয়েছিলাম। বরাত জোরে প্রাণে বেঁচেছি। আর এমন কাজে যাব না।” তাঁর দাবি, “তিন তলার ছাদ আগেই ঢালাই করা হয়ে গিয়েছিল। যা নিয়ম নয়। আমরা একতলার ছাদ ঢালাই করছিলাম। তখনই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে।” দৈনিক এক হাজার টাকা মজুরি দেখেই বিহারের মুঙ্গের থেকে তারাতলায় এসেছিলেন শহিদ। সঙ্গে তাঁর পরিবারের আরও পাঁচ জন এসেছিলেন। তার মধ্যে তিন জন মারা গিয়েছেন। শহিদের কথায়, “কাঠামোটা কয়েক দিন ধরেই দুলছিল। কিন্তু এ ভাবে ভেঙে পড়বে, বুঝিনি। দোতলায় কাজ করছিলাম, আচমকাই পুরোটা ভেঙে বসে গেল!” ভেঙে পড়া অংশের একটা ফাঁকে আটকে গিয়েছিলেন শহিদ। তিনি জানান, শরীরের বিভিন্ন অংশে কেটে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। প্রায় দু’ ঘণ্টা আটকে থাকার পরে নিজের চেষ্টায় কয়েকটি রড টেনে সরিয়ে পাশেই আটকে থাকা ভাই মানিকচাঁদকেও টেনে বের করেন। তার পরে দু’জনকেই উদ্ধার করে হাসপাতালে আনা হয়েছিল।
ঘটনার পরেই ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার শুরু হয়েছিল। ভিতরে আরও কেউ বেঁচে আছেন কি না, তা বুঝতে ‘লাইফ ডিটেক্টর’ যন্ত্রও ব্যবহার করা হয়েছিল। পুলিশ এবং এনডিআরএফ সূত্রের খবর, ‘লাইফ ডিটেক্টিং ক্যামেরা’-য় নতুন করে আর কিছু ধরা পড়েনি। এ দিন প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে যাদবপুরের বিশেষজ্ঞ দল। ছিলেন কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক পার্থপ্রতিম বিশ্বাস, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক দীপঙ্কর চক্রবর্তী, আর্কিটেকচার বিভাগের অধ্যাপক মৈনাক ঘোষ, মেটালার্জিক্যাল অ্যান্ড মেটেরিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মহম্মদ বসিরউদ্দিন এবং টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট সম্রাট সেনগুপ্ত। একাধিক জায়গা থেকে মাটি, কংক্রিট এবং অন্যান্য নমুনা সংগ্রহ করেন তাঁরা। পরে পার্থপ্রতিম বলেন, “কলকাতা পুলিশ যোগাযোগ করেছিল। আমরা ঘুরে দেখলাম। কেন ঘটনা ঘটল, তা খতিয়ে দেখে পুলিশকে রিপোর্ট দেব।”
তারাতলার গুদাম ভেঙে মৃত সুমন কর্মকারের দেহ এসএসকেএমের মর্গ থেকে ছাড়া হল। বাইরে তাঁর শোকার্ত ভাই। শনিবার। ছবি: বিশ্বনাথ বণিক।
এই নির্মাণের ঢালাই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সে ব্যাপারে দীপঙ্কর বলেন, “টিনের উপরে ঢালাই করার ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম আছে। এখানে তা মানা হয়েছিল কি না, খতিয়ে দেখতে হবে। কংক্রিটের গুণমান, লোহার মান, মাটির ধারণক্ষমতা এবং কাঠামোর ভার বহনের ক্ষমতা—সব খতিয়ে দেখা হবে।” ওই দলের দাবি, ধ্বংসস্তূপ পুরো সরানোর পরে চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। ভবিষ্যতে ফের বিশেষজ্ঞেরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে পারেন। এ দিন ঘটনাস্থলে যান কলকাতার ডিসি (দক্ষিণ-পশ্চিম) ঈশানী পালও।
এ দিনও ঘটনাস্থলে স্থানীয় মানুষের ভিড় ছিল। তার মধ্যে কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীও ছিলেন। এমনই এক শ্রমিক বললেন, “সে দিন বিকট শব্দে সব কিছু যেন লন্ডভন্ড করে দিল। সেই দৃশ্য জীবনেও বোধহয় ভুলতে পারব না।”