TMC Dharna

যদি বেঁচে থাকি বিজেপি-কে সরাবই! তৃণমূলে ডামাডোলের মধ্যে ধর্নামঞ্চে মমতা বললেন, আমাকে আটকাতে পারবে না

মঙ্গলবার দুপুর ২টো নাগাদ মমতা কালীঘাটের বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমেই পৌঁছে যান রেড রোডে। সেখানে বিআর অম্বেডকরের মূর্তিতে মালা দেন মমতা। তার পর সেখান থেকে সোজা চলে যান ওয়াই চ্যানেলে তৃণমূলের ধর্নামঞ্চে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ০২ জুন ২০২৬ ১৩:৪৮
Mamata Banerjee\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\'s dharna program on Dharmatala\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\'s Y channel

ওয়াই চ্যানেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সারমিন বেগম।

ওয়াই চ্যানেলে ধর্নামঞ্চ থেকে বিজেপির বিরুদ্ধে সরব রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, ‘‘আমি কারও সুদিনে না-হোক, দুর্দিনে আছি।’’ তাঁর কথায়, ‘‘বিজেপি বাদে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক আছে। তবে বিজেপির যাঁরা বলেছেন, তাঁদের পাশেও ছিলাম।’’ ভোটের পর থেকে তাঁকে আটকানোর চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলেন মমতা। এ-ও বলেন, ‘‘জিয়েঙ্গে তো বিজেপি কো হাটাকে যায়েঙ্গে (যদি বেঁচে থাকি বিজেপি-কে সরাবই)।’’

Advertisement

মমতার অভিযোগ, দিল্লি থেকে বিজেপি সরকার কলকাঠি নেড়ে তৃণমূলকে ফেলে দেওয়ার ‘চক্রান্ত’ হচ্ছে। তবে সেই চেষ্টা ‘বানচাল’ করে দেওয়ার বার্তা দিলেন মমতা। তাঁর কথায়, ‘‘বেআইনি ভাবে আমাদের বিধায়ক, কাউন্সিলর, দলীয় প্রার্থীদের ভয় দেখানো হচ্ছে।’’

গত শনিবার সোনারপুরে মৃত তৃণমূল কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে আক্রান্ত হন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ধর্নামঞ্চ থেকে সেই প্রসঙ্গ তোলেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, ‘‘ওটা গলির মধ্যে ছিল। হেলমেট না-দিলে পাথরটা ওর মাথায় লাগত।’’ তার পরেই হাসপাতালের ‘অসহযোগিতা’ নিয়ে সরব হন মমতা। তাঁর দাবি, ‘‘যখন সিরিয়াস অবস্থায় রোগী নিয়ে গেলাম তখন সিইও-র থেকে অনুমতি নেওয়ার কথা বলছে। পুলিশ নার্সিং হোমকে থ্রেট করছে। পরে ট্রমা কেয়ারে ভর্তি করল। তখন হাসপাতালের সিইও আমার কাছে এলেন। শোভন চট্টোপাধ্যায়ও ছিল আমার সঙ্গে। আমাদের বললেন, মাফ করবেন। আর চাপ নিতে পারছি না। ভয় দেখানো হচ্ছে।’’

রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে ধর্নার অনুমতি না-পাওয়ায় পুলিশের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, ‘‘আমাদের এখানে ধর্নায় মাইকের অনুমতি দেওয়া হয়নি। হ্যান্ড মাইক নিয়ে বলতে হচ্ছে। এ ভাবে আমাকে আটকাতে পারবে না। যেখানে পারব বসে পড়ব। বাবা সাহেব অম্বে়ডকরের মূর্তিতে মালা দিতে কি আমাকে আটকাতে পেরেছে না জানতে পেরেছে? সংবিধান নিয়ে গিয়েছিলাম। মহাত্মা গান্ধীর মূর্তিতে মালা দিয়ে শপথ নিলাম— এই অত্যাচার যত দিন চলছে, তত দিন মোকাবিলা করব। করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে (করব নয়তো মরব)।’’ মমতার অভিযোগ, ‘‘আমাকে মারা হয়েছে। ভোট লুট হয়েছে।’’

ওয়াই চ্যানেলে ধর্না কর্মসূচির পোস্টার।

ওয়াই চ্যানেলে ধর্না কর্মসূচির পোস্টার। ছবি: সারমিন বেগম।

মমতা জানান, জীবন-জীবিকা বাঁচানোর জন্য এই ধর্না। মমতার অভিযোগ, ধর্নায় বাধা দেওয়া হচ্ছে। তার পরেই সেখানে উপস্থিত পুলিশের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, ‘‘যাঁরা আসছেন, তাঁদের ঢুকতে দিন। না হলে লালবাজার ঘেরাও হবে। নবান্না ঘেরাও হবে। সব থানা ঘেরাও হবে।’’ তবে তার পরেই মমতা বলেন, ‘‘আমি পুলিশকে দোষ দিচ্ছি না। ওদের কোনও ভুল নেই। আমিও প্রশাসনে ছিলাম। ওরা চেয়ারের কথা শোনে। চেয়ার যা বলে তা করে।’’ মমতার অভিযোগ, দলীয় বিধায়কদের বাড়ি থেকে বার হতে দেওয়া হচ্ছে না। পুলিশ গিয়ে তৃণমূল ছাড়ার কথা বলছে। নতুন তৃণমূল তৈরি করতে বলছে। তার পরেই মমতার প্রশ্ন, ‘‘কারা নতুন তৃণমূল তৈরি করবে? যাঁরা প্রথম থেকে দলের সঙ্গে আছেন তাঁরা নাকি যাঁরা দলের প্রতীকী জিতেছে তাঁরা?’’ মমতার অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে ‘বুলডোজ়ার’ রাজনীতি চলছে। হুমকি দেওয়া হচ্ছে সকলকে।

মমতার অভিযোগ, ইডি, সিবিআই দিয়ে ‘ভয়’ দেখিয়ে বিজেপি-কে সমর্থন করার কথা বলা হচ্ছে। গণতন্ত্রের উপর বুলডোজ়ার চালাবেন না। তৃণমূলনেত্রীর কথায়, ‘‘আমাদের বিধায়ক-সাংসদের ভয় দেখাবেন না। আমাদের লোকদের গ্রেফতার করবে না। আপনাদের অত্যাচারে আত্মহত্যা করছেন। সব জায়গায় চাপ সৃষ্টির চেষ্টা চলছে।’’


ওয়াই চ্য়ানেলে বসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

ওয়াই চ্য়ানেলে বসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সারমিন বেগম।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্দেশে মমতা বলেন, ‘‘দেখুন কার উপর আপনি দায়িত্ব দিয়েছেন। কী হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। এ সব কিছু তো আপনাকে দেখতে হবে।’’ মমতার অভিযোগ, ইচ্ছা করে রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে কর্মসূচি করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাঁর কথায়, ‘‘ওই রাস্তা দিয়ে গদ্দার যায়। ওখানে লাটসাহেব থাকেন। আমিও দেখব ভবিষ্যতে রানি রাসমণিতে কোনও কর্মসূচি হচ্ছে কি না। যদি সেখানে কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হয়, তখন কোর্টে যাব। বলব, আমাদের ওখানে কর্মসূচি করতে দেওয়া হয়নি।’’

মমতার দাবি, যাঁদের ঘর-দোকান ভেঙেছ, তাঁদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তাঁর কথায়, ‘‘অভিষেক দু’জায়গায় গিয়েছিল, তাতেই ভয় পেয়ে গিয়েছে। ওকে মারতে গিয়েছিল। আমি তো সব জায়গায় যাব। আমি তো জানিয়ে যাব না।’’ মমতার চ্যালেঞ্জ, ‘‘মারলে মারো। কিন্তু যত দিন কণ্ঠ রয়েছে, তত দিন মাথা নত করাতে পারবে না।’’

বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা বাছাই নিয়ে মঙ্গলবারের মঞ্চ থেকে মমতা বলেন, ‘‘২০০৬ সালে আমরা ২৯টা আসন জিতেছিলাম। অন্তত ৩০টা জিততে হত, না হলে বিরোধী দলনেতার তকমা মেলে না। সেই কারণে তৎকালীন সরকার তখন স্বীকৃতি দেয়নি। যখন ৩০ হয়, তখন স্বীকৃতি দিয়েছিল। এ ব্যাপারে দলকে বলতে হয়। কোনও বিধায়ক বলেন না। আমরা যখন সরকারে আসি তখন সিপিএমের তরফে সূর্যকান্ত মিশ্রের নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। আমরা মেনে নিয়েছিলাম। এখন কেন আমাদের দেওয়া হচ্ছে না।’’

তার পরেই সই-বিতর্ক নিয়ে মুখ খোলেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘আজ যাঁরা বলছেন, সই আমাদের নয়। আমার কাছে ভিডিয়ো রেকর্ড আছে। কেউ বড় অক্ষরে লেখেন, কেউ আবার সই করেন। তবে হাতের লেখা ওদের কি না, তা ফরেনসিক পরীক্ষা করিয়ে নিন। যদি কোনও বিভ্রান্তি থাকে তো ফরেনসিক করাতেই পারেন। কিন্তু তার জন্য বিরোধী দলনেতা বাছাই আটকায় না।’’ এফআইআর প্রসঙ্গেও প্রশ্ন তোলেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘আমরা আমাদের দল থেকে চিঠি দিয়েছিলাম। যখন স্পিকার নির্বাচন হল তখন তো বিরোধী দলনেতা হিসাবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন। তার অর্থ কী? যদি তিনি বিরোধী দলনেতা না-ই হবেন, তবে তাঁকে হাত ধরে নিয়ে এসেছিলেন কেন? স্পিকারের স্বাগত ভাষণেও বিরোধী দলনেতা হিসাবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বক্তৃতা করতে বলেছিলেন। এখন সই-বিভ্রান্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। এই সব করার দরকার নেই। এটা দল সিদ্ধান্ত নেয়।’’

ওয়াই চ্যানেলে মমতা এবং তৃণমূল নেতৃত্বকে ঘিরে রয়েছেন দলীয় কর্মী-সমর্থকেরা। মমতার বক্তৃতার সঙ্গে সঙ্গে উঠছে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান। প্রথমে তৃণমূল সমর্থকদের চিৎকারে বক্তৃতার মাঝে বার বার থামতে হয় মমতাকে। পরে তৃণমূল কর্মীদের শান্ত করিয়ে আবার বক্তৃতা করেন তিনি।

মঙ্গলবার দুপুর ২টো নাগাদ মমতা কালীঘাটের বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমেই পৌঁছে যান রেড রোডে। সেখানে বিআর অম্বেডকরের মূর্তিতে মালা দেন মমতা। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মদন মিত্র, কুণাল ঘোষ, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, দোলা সেন, অসীমা পাত্রেরা। তার পর সেখান থেকে সোজা চলে যান ওয়াই চ্যানেলে তৃণমূলের ধর্নামঞ্চে।

মঙ্গলবার ওয়াই চ্যানেলে তৃণমূলের ধর্নার অনুমতি দিয়েছে পুলিশ, দুপুর ২টো থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অনুমতি রয়েছে। সেই মতো মঙ্গলবার সকাল থেকে তৃণমূল প্রস্তুতিও শুরু করে। তবে এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সতর্ক পুলিশও। ওয়াই চ্যানেল ঘিরে রয়েছে পুলিশবাহিনী। চোখে পড়ার মতো মহিলা পুলিশের সংখ্যাও।

ওয়াই চ্যানেলে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়।

ওয়াই চ্যানেলে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। ছবি: সারমিন বেগম।

ভোট-পরবর্তী সন্ত্রাসের অভিযোগে রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে ধর্না কর্মসূচির ডাক দিয়েছিলেন মমতা। তবে ওই জায়গায় তৃণমূলের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির অনুমতি মেলেনি। সোমবার পুলিশের তরফে জানানো হয়, রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে নয়, ওয়াই চ্যানেলে ধর্না কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। সেই মতো আবেদন করতে হবে তৃণমূলকে। যদিও তৃণমূল বিধায়ক কুণাল সোমবার থেকেই বার বার প্রশ্ন তুলছেন, কেন আবার তাঁরা নতুন করে আবেদন করবেন? একই প্রশ্ন তোলেন তৃণমূলের সাংসদ কল্যাণও। তিনি বলেন, “রাত সাড়ে ১২টায় ইমেল পাঠিয়ে পুলিশ বলেছে ওয়াই চ্যানেলে কিছু করার জন্য অনুমতি নিতে হবে। এটা কি সম্ভব? তাহলে আগে বলল না কেন? এটা তো বিরোধী স্বরকে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।” আর সেই সেই কারণেই মমতার কর্মসূচি নিয়ে জট সৃষ্টি হয়।

যদিও মঙ্গলবার বেলা গড়াতে একে একে তৃণমূল নেতারা ওয়াই চ্যানেলে আসতে শুরু করেন। শোভনদেব, নয়না, চন্দ্রিমারা ছাড়াও রয়েছেন ফিরহাদ হাকিম, অশোক দেবের মতো প্রবীণ নেতারাও। শুধু তা-ই নয়, তৃণমূল কর্মী-সমর্থকেরাও একে একে জড়ো হতে শুরু করেন ওয়াই চ্যানেলে। সকলের মুখে, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান।

ভোটের পর মমতার প্রথম রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে অনিয়শ্চতার মূলেই ছিল পুলিশের অনুমতি না-পাওয়া। তৃণমূলের অভিযোগ ছিল, বিজেপি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়েই তাদের কর্মসূচির অনুমতি দিচ্ছে না। যদিও অতীতে তৃণমূলের শাসনকালে বিজেপির প্রায় অনেক কর্মসূচি নিয়েই এ ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিত। মিলত না পুলিশের অনুমতি। রাজ্যের তৎকালীন বিরোধী দলনেতা তথা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে কোনও কর্মসূচি করতে গেলেই আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে মিছিল-মিটিং করতে হয়েছে শুভেন্দু বা বিজেপি-কে।

ওয়াই চ্যানেলে তৃণমূল কর্মী-সমর্থকেরা।

ওয়াই চ্যানেলে তৃণমূল কর্মী-সমর্থকেরা। ছবি: সারমিন বেগম।

রবিবার কালীঘাটের বৈঠকেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, তৃণমূলের পরিষদীয় দলে ফাটল ধরেছে। ওই দিন দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬০ জনই অনুপস্থিত ছিলেন। তার পর সই জাল-কাণ্ড নিয়েও বিড়ম্বনা বাড়ে রাজ্যের পূর্বতন শাসকদলের। তার মধ্যেই মঙ্গলবার তৃণমূলের কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। মঙ্গলবার সকালে কালীঘাটে মমতার বাড়িতে বৈঠকে বসেছিলেন দলের দুই বিধায়ক কুণাল এবং মদন। সেই বৈঠকে ছিলেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ দোলাও।

(এই খবরটি ক্রমাগত আপডেট হচ্ছে। সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে পাতাটি রিফ্রেশ করতে থাকুন।)

Advertisement
আরও পড়ুন