(বাঁ দিকে) অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রতীক জৈন (ডান দিকে)। — ফাইল চিত্র।
দেড় দশক ধরে সরকার চালালেও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তথা শাসক তৃণমূলকে ‘বিড়ম্বনায়’ পড়তে হয়েছিল আরজি কর আন্দোলনের পর্বে। বিধানসভা ভোটের আগে সেই আরজি কর পর্ব থেকে ‘শিক্ষা’ নিয়েই ডিজিটাল যোদ্ধাদের বার্তা দিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
গত অক্টোবরে ‘আমি বাংলার ডিজিটাল যোদ্ধা’ কর্মসূচির সূচনা করেছিলেন অভিষেক। তার পর গত আড়াই মাস ধরে চলে নথিভুক্তিকরণ। সেখান থেকে প্রায় হাজার দশেক ‘যোদ্ধা’কে চিহ্নিত করে সোমবার মিলনমেলা প্রাঙ্গণে ‘কনক্লেভ’ করল তৃণমূল। খাতায়-কলমে ওই সমাবেশের উদ্যোক্তা তৃণমূলের আইটি সেল হলেও আসলে গোটা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল তৃণমূল এবং সরকারের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাক।
প্রায় সাড়ে ছ’ঘণ্টার কনক্লেভে ‘মেঘনাদ’ হয়ে হাজির থাকলেন আইপ্যাক কর্ণধার প্রতীক জৈন। গত বৃহস্পতিবার প্রতীকের লাউডন স্ট্রিটের বাড়ি এবং সল্টলেক সেক্টর ফাইভে সংস্থার দফতরে হানা দিয়েছিল ইডি। তল্লাশি চলাকালীন সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলের সর্বময় নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং। সেই ঘটনার পর থেকে প্রতীককে সে ভাবে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। সোমবারেও তিনি রইলেন কার্যত পর্দার আড়ালে। মঞ্চের নেপথ্যে। ‘মেঘনাদ’ হয়ে। সূত্রের খবর, বক্তৃতা দেওয়ার পরে অভিষেক প্রতীকের সঙ্গে কিছু ক্ষণ কথাও বলেছেন।
‘ডিজিটাল যোদ্ধা’দের আগামী ১০০ দিন নাওয়াখাওয়া ভুলে সতর্ক থেকে কাজ করার কথা বলেছেন অভিষেক। তাঁর নির্দেশ, সমাজমাধ্যমে তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিজেপি যে ভাষ্য তৈরি করবে, দলের হয়ে ‘ডিজিটাল যোদ্ধা’দের সেখানে গিয়েই পাল্টা যুক্তি উপস্থাপিত করতে হবে। উদাহরণ দিতে গিয়ে অভিষেক বলেন, ‘‘আরজি করের সময়ে সিপিএম এবং বিজেপি সমাজমাধ্যমে যা যা প্রচার করেছিল, সংবাদমাধ্যমের একাংশ সেটাই লিখেছিল। ময়াতদন্তের রিপোর্ট না-দেখেই বলে দেওয়া হয়েছিল পেলভিক বোন, কলার বোন ভাঙা (নির্যাতিতা, নিহত মহিলা চিকিৎসকের)। সেই পর্বে আমরা পাল্টা ভাষ্য তৈরি করতে পারিনি। সে কারণেই একতরফা প্রচার হয়েছিল।’’ অনেকের বক্তব্য, ঠারেঠোরে অভিষেক দলের আইটি সেলের তৎকালীন ‘দুর্বলতা’র দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।
তবে সমাজমাধ্যমের প্রচারে যুক্তি এবং তথ্য-পরিসংখ্যানের উপরই জোর দেওয়ার কথা বলেছেন অভিষেক। বাড়তি ‘লাইক’, ‘শেয়ার’-এর জন্য প্রলুব্ধ হয়ে চটুল কোনও কিছু করা থেকে দূরে থাকার বার্তা দিয়েছেন ‘সেনাপতি’। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের অনেক মেজো, সেজো, ছোট নেতা সস্তায় হাততালি পাওয়ার জন্য অনেক সময়ে আলটপকা কথা বলেন। তেমন কিছু করবেন না। যা করবেন শালীনতার গণ্ডির মধ্যে থেকে করতে হবে।’’ কোনও ব্যক্তির নামে জয়ধ্বনি না-দিয়ে দলের কথা প্রচারে মনোনিবেশ করতে বলেছেন অভিষেক। এক দিকে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘অর্থনৈতিক অবরোধ’ এবং অন্য দিকে মমতা সরকারের কাজকেই প্রচারের বর্শাফলক করার বার্তা দিয়েছেন তিনি।
মিলনমেলার প্রেক্ষাগৃহে সোমবার যেন ভোটের আগের বিজয়োৎসবের মেজাজে ছিলেন তৃণমূলের কর্মীরা। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স হ্যান্ডল কী ভাবে ব্যবহার করতে হবে, সে ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে ‘ডিজিটাল যোদ্ধা’দের। ঋজু দত্ত, দেবাংশু ভট্টাচার্য, তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য, অরূপ চক্রবর্তীদের পাশাপাশি বক্তা ছিলেন কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের কন্যা প্রিয়দর্শিনী হাকিম, ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষের কন্যা প্রিয়দর্শিনী ঘোষ, প্রয়াত প্রাক্তন মন্ত্রী সাধন পাণ্ডের কন্যা শ্রেয়া পাণ্ডেরা। অতিথি হিসাবে হাজির ছিলেন সাংসদ তথা অভিনেতা দেবও। মাঝে সঙ্গীত পরিবেশন করেন কেশব দে। সেই সময়ে প্রেক্ষাগৃহ দেখলে বোঝার উপায় ছিল না যে, ভোট আসছে, না কি ফলই ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। অভিষেকের বক্তৃতা শুরুর পরেও সেই উচ্ছ্বাসের রেশ ছিল। যোদ্ধাদের শান্ত করতে কয়েক মিনিট ব্যয় করতে হয় তাঁকে। হতে পারে সে কারণেই তাঁর নির্দেশ, ‘‘অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস দেখাবেন না। মাটি কামড়ে লড়াই করুন।’’
‘ডিজিটাল যোদ্ধা’দের অভিষেকের বার্তা, সেনাবাহিনীর মতো করে কাজ করতে হবে। ভারতীয় সেনার তিন বাহিনীর সঙ্গে তৃণমূলের তিন বাহিনীর তুলনা টানেন অভিষেক। তাঁর কথায়, ‘‘যাঁরা বুথে লড়ছেন, তাঁরা সেনাবাহিনী। আমরা যাঁরা লোকসভায় কিংবা আদালতে লড়াই করছি, তাঁরা নৌবাহিনী। আর ডিজিটাল যোদ্ধারা বায়ুসেনার মতো। তিন বাহিনী একসঙ্গে অগ্রসর হলে প্রতিপক্ষ চূর্ণবিচূর্ণ হবেই।’’
বক্তৃতার শেষে বেশ কয়েক জনের প্রশ্নের উত্তর দেন অভিষেক। তার মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিল, তাঁর প্রিয় ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েটর’ কে? অভিষেক বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী। তিনিই রোজ কন্টেন্ট তৈরি করেন। আজ দেখলাম ঘুড়ি উড়িয়েছেন।’’