মালদহের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ছবি: সংগৃহীত।
মোদী বলেন, ‘‘বন্দে মাতরমের ১৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই প্রেরণা বজায় রাখতে হবে। বাংলাকে বিকাশের পথে নিয়ে যেতে হবে। বলুন বন্দে মাতরম। ভারত মাতার জয়। অনেকে সুন্দর ছবি তৈরি করে এনেছেন। এসপি এই ছবি সংগ্রহ করুন, যাঁদের ছবির পিছনে নাম, ঠিকানা লেখা থাকবে, তাঁদের ধন্যবাদপত্র পাঠাব। আপনাদের শিল্পকে কুর্নিশ। ভারত মাতার জয়।’’ বক্তৃতা শেষ করলেন মোদী।
মোদী বলেন, ‘‘ কাল দেখলাম মহিলা সাংবাদিক নিগৃহীত। কত অভদ্রতা করা হয়েছে। তৃণমূলরাজে স্কুল, কলেজেও মহিলারা সুরক্ষিত নন। নির্মমতা এতটাই যে মহিলাদের কথা শোনা হয় না। নির্যাতিতাদের কোর্টে যেতে হয়। এই পরিস্থিতি বদলাতে হবে। এই কাজ কে করবে? আপনাদের একটা ভোট করবে। আপনাদের ভোট পশ্চিমবঙ্গের পুরনো গৌরব ফেরাবে। তৃণমূলের গুণ্ডাগিরি বেশিদিন চলবে না। এর শেষ হবে। গরিবদের নিপীড়ন শেষ হবে।’’
মোদী বলেন, ‘‘মোদীর গ্যারান্টি, মতুয়া, যাঁরা প্রতিবেশী দেশে ধর্মের কারণে হিংসার শিকার হয়ে এখানে এসেছেন, তাঁরা ভয় পাবেন না। মোদী সিএএ-র মাধ্যমে শরণার্থীদের সুরক্ষা দিয়েছে। এখানে যে বিজেপি সরকার হবে, তারা মতুয়া, নমশূদ্র শরণার্থীদের বিকাশের কাজে গতি আনবে। বাংলায় পরিবর্তন আনার দায়িত্ব রয়েছে মা-বোন, যুবকদের।’’
মোদী বলেন, ‘‘বাংলার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হল অনুপ্রবেশ। দুনিয়ার সমৃদ্ধ দেশ, যেখানে টাকার অভাব নেই, তারাও অনুপ্রবেশকারীদের বার করে দিচ্ছে। ওদের বাইরে পাঠানো উচিত কি না? কিন্তু তৃণমূল সরকার থাকতে তা কি সম্ভব? ওরা কি করবে? আপনাদের অধিকার কি রক্ষা করবে? আপনাদের জমি, বোন-মেয়েদের কি রক্ষা করবে? অনুপ্রবেশকারীদের কে বার করবে? তৃণমূলের সিন্ডিকেট বহু বছর ধরে অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার করার খেলা করছে। ওরা গরিবদের অধিকার ছিনিয়ে নেয়। যুবকদের কাজ ছিনিয়ে নেয়। বোনদের উপর অত্যাচার করেছে। দেশে সন্ত্রাস, হিংসা আনছে। জনসংখ্যার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ভাষার ফারাক আসছে কিছু জায়গায়। মালদহ, মুর্শিদাবাদের অনেক জায়গায় হিংসা বাড়ছে। অনুপ্রবেশকারী এবং সত্ত্বাধারীদের জোট ভাঙতে হবে। বিজেপি সরকার হলে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে বড় পদক্ষেপ হবে।’’
মোদী বলেন, ‘‘ফুলহারে সুরক্ষার জন্য ব্যবস্থা হবে। বাংলার দ্রুত বিকাশ হবে, ভরসা রাখুন। এখানে বিজেপির সরকার তৈরি করুন, মালদহ, বাংলার পুরনো গৌরব ফিরিয়ে আনব। ইংলিশবাজার, কালিয়াচকে যা দেখা যেত, তা ফিরে আসবে, বিজেপি এলে যুবক, কৃষকদের সুযোগ বাড়বে। আম-অর্থনীতিকে নতুন উচ্চায় নিয়ে যাবে। হিমঘর তৈরির জন্য এক লক্ষ কোটির ব্যবস্থা হচ্ছে। এখানে সরকার গড়লে বাংলায় হিমঘর তৈরি করব। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে জোর দেব। রেশম কৃষকদের বিকাশ হবে। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার কোটি টাকার প্রকল্প চালু করেছে। পাটশিল্পের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার অনেক চেষ্টা করছে। গত ১১ বছরে পাটের সমর্থনমূল্য বৃদ্ধি হয়েছে। ২০১৪ সালের আগে যারা সরকার চালাত, তাদের আমলে সমর্থন মূল্য় ছিল ২৪০০ টাকা। এখন সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। পাটচাষীরা আরও টাকা পাচ্ছেন। পাটচাষীরা ৪০০ কোটি পেয়েছিল, ২০১৪ সালের আগে। তখন তৃণমূল কেন্দ্রীয় সরকারে (জোটশরিক) ছিল। বিজেপি সরকার ১৩০০ কোটি টাকার বেশি দিয়েছে। তিন গুণ বেশি টাকা দিয়েছে। বিজেপি সরকার তৈরি করুন। উদ্যোগ বৃদ্ধি হবে, এটা মোদীর গ্যারান্টি।’’
মোদী বলেন, ‘‘মালদহ তৃণমূলের দুর্নীতির কারণে মার খাচ্ছে। প্রতি বছর এখানে অসংখ্য ঘর নদীতে তলিয়ে যায়। লক্ষ মানুষ তৃণমূল সরকারের কাছে আবেদন করছেন, পাড় বাঁধাতে। তৃণমূল ছেড়ে দেয়। বাঁধের নামে কত যে খেলা হয়, আমার থেকে বেশি আপনারা জানেন। সিএজি রিপোর্ট দেখছিলাম বাঁধ নিয়ে। আপনাদের বাঁধের টাকা দেয়নি। কিন্তু তৃণমূলের নিজের লোকদের খাতায় ৪০ বার বাঁধের টাকা পাঠানো হয়েছে। যাঁদের প্রয়োজন নেই, তাঁদের দেওয়া হয়েছে। যাঁরা সঙ্কটে ছিলেন, তাঁদের দেয়নি। তৃণমূলের ঘনিষ্ঠেরা পীড়িতদের টাকা লুটেছে। মালদহের মাটিতে বলছি, বাংলায় বিজেপির সরকার হলেই তৃণমূলের এই কালো দুর্নীতি বন্ধ হবে।’’
মোদী বলেন, ‘‘মালদহে আপনাদের দুঃখ কমাতে এসেছি। এখানে কারখানা হচ্ছে না। কৃষকেরা সুবিধা পাচ্ছে না। মালদহ, মুর্শিদাবাদ থেকে যুবকেরা রুজির জন্য পালাতে বাধ্য হন। রেশম কৃষক, আম কৃষকদের অবস্থা বেহাল। আমচাষীরা বলছেন, চাষের টাকাও ওঠেনি। কারণ, তৃণমূল সরকার এই নিয়ে উদ্যোগ নেয়নি। প্রক্রিয়াকরণ নিয়ে বড় উদ্যোগ নেয়নি। আপনাদের হকের টাকা দেয়নি।’’
মোদী বলেন, ‘‘কেন্দ্রীয় সরকার দেশে মুক্ত বিদ্যুৎ যোজনা চালু করেছে। লক্ষ লক্ষ পরিবার সুবিধা পাচ্ছে। ছাদে সৌর প্রকল্প বসিয়েছে। হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে কেন্দ্র। আমি চাই, পশ্চিমবঙ্গে লক্ষ পরিবারও এই মুক্ত বিদ্যুৎ প্রকল্পের সুবিধা পাক। আপনার ঘরের বিদ্যুতের বিল শূন্য হোক। কিন্তু গরিবের ভাল হয়, এমন কাজ এখানকার তৃণমূল সরকার করতে দেয় না। বলুন, সুবিধা পাওয়া উচিত কি না! কে বাধা দিচ্ছে? যে বাধা দিচ্ছে, তাকে হঠাবেন তো? তখনই বাংলার লোকের ভাল হবে, যখন বাধা দেওয়া তৃণমূলের বদলে উন্নয়নকারী বিজেপি সরকার আসবে।’
মোদী বলেন, ‘‘দেশের কোটি কোটি গরিব মুক্ত চিকিৎসা করিয়েছে। তৃণমূল বাংলায় আমার ভাইবোনদের এই সুযোগ নিতে দেয় না। নির্মম সরকার। এই সরকারের বাংলা থেকে বিদায় জরুরি। এই সরকারের যাওয়া উচিত কি না?’’
মোদী বলেন, ‘‘বাংলার সব গৃহহীন ঘর পান। নল থেকে সকলে জল পান, মুক্ত রেশন পান, যে যোজনা কেন্দ্র গরিবদের জন্য চালু করেছে, আমি চাই, বাংলার মানুষ তার সুবিধা পাক। আপনাদের সেগুলি পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু তা হচ্ছে না। তৃণমূল সরকার নির্দয়। নির্মম। কেন্দ্রীয় সরকার গরিবদের জন্য যে টাকা দেয়, তা তৃণমূলের লোকজন লুটে নেয়। তৃণমূলের লোক বাংলার গরিবদের শত্রু। ওরা আপনাদের কষ্ট নিয়ে চিন্তা করে না। নিজেদের সিন্দুক ভরছে। আমি চাই, বাকি দেশের মতো বাংলার গরিব মানুষজনও ৫ লক্ষ টাকার মুক্ত চিকিৎসা পান। আয়ুষ্মান ভারত চালু হোক। কিন্তু আজ বাংলা দেশের একমাত্র রাজ্য, যেখানে ৫ লক্ষ টাকার যোজনা, আয়ুষ্মান যোজনা চালু হতে দেয়নি।’’
মোদী জানান, বন্দে ভারতের সঙ্গে চারটি নতুন অমৃত ভারত এক্সপ্রেস ট্রেন পাচ্ছে বাংলা। এর ফলে উত্তরবঙ্গে যাতায়াত উন্নত হবে। পর্যটকের আনাগোনা বাড়বে।
মোদী বলেন, ‘‘বাংলার দ্রুত বিকাশ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্য। কিছু ক্ষণ আগে বাংলার বিকাশের সঙ্গে জড়িত বেশ কিছু প্রকল্প উদ্বোধন করেছি। বাংলা আধ ডজন নতুন ট্রেন পেয়েছে। তার মধ্যে একটা বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেন। মেড ইন ইন্ডিয়া। সকলের জন্য আনন্দের যে, প্রথম স্লিপার বন্দে ভারত শুরু হচ্ছে বাংলা থেকেই। একটা স্টেশন মালদহও। বাংলার সব মানুষকে শুভেচ্ছা।’’
মোদী বলেন, ‘‘যেখানে বিজেপির নামে মিথ্যা বলা হয়েছে, মিথ্যা প্রচার হয়েছে, সেখানেও ভোটার আশীর্বাদ দিচ্ছে। আজও উৎসাহ দেখে বলছি, এ বার বাংলার মানুষও বিজেপি-কে বড় ব্যবধানে জয়ী করবে।’’
মোদী বলেন, ‘‘বিজেপি দেশে সুশাসন এবং বিকাশের নতুন মডেল এনেছে। আজ পুরো দেশে জনতা তাদের আশীর্বাদ দিচ্ছে। কাল মহারাষ্ট্রে শহরে পুরসভা ভোটের ফল বেরিয়েছে। বিজেপি ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে। পৃথিবীর অন্যতম বড় শহর মুম্বইয়ের পুরসভা, বিএমসি-তে প্রথম বার বিজেপি রেকর্ড জয় পেয়েছে। তিরুঅনন্তপুরমে বিজেপির মেয়র হয়েছে। যেখানে বিজেপির ভোট জয় অসম্ভব মনে করা হত, সেখানেও বিজেপি সমর্থন পাচ্ছে। এর থেকে স্পষ্ট, জেন জ়ি, ভোটারেরা বিজেপির উপর ভরসা করে।’’
মোদী বলেন, ‘‘বিজেপি এই কাজ করে ছাড়বে। বাংলায় সুশাসন আনবে। আমার সঙ্গে একটা সঙ্কল্প নিন। আমি বলব, পাল্টানো দরকার। আপনারা বলবেন, চাই বিজেপি সরকার।’’
মোদী বলেন, ‘‘ওড়িশায় বিজেপি সরকার করেছে। ত্রিপুরা, অসম ভরসা রেখেছে বিজেপি-তে। কিছু দিন আগে বিহার আরও এক বার বিজেপি-এনডিএ সরকার গড়েছে। বাংলার চার দিকে বিজেপির সুশাসনের সরকার রয়েছে। এখন বাংলায় সুশাসনের সময় এসেছে। তাই আমি বিহারে জয়ের পর বলেছিলাম, মা গঙ্গা আশীর্বাদে বাংলায় বিকাশের গঙ্গা বইবে।’’
মোদী বলেন, ‘‘দেশ আজ দীক্ষিত ভারত হওয়ার লক্ষ্যে। পূর্ব ভারতের বিকাশ খুব জরুরি। হিংসার রাজনীতি যারা করে, তারা বিকাশ আটকে রেখেছিল। বিজেপি এই রাজ্যগুলিকে হিংসার রাজনীতি করা লোকজনের থেকে মুক্ত করেছে। পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির বিশ্বাস যদি কারও সঙ্গে থাকে, তা হলে তা হল বিজেপি।’’
মোদী বলেন, ‘‘আজ এখানে জনসাগর। যত না মণ্ডপে রয়েছেন, তার দ্বিগুণ বাইরে অপেক্ষারত। এই আশীর্বাদে আমি ধন্য। বাংলা আমায় অনেক ভালবাসা দিয়েছে। বাংলার সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আসল পরিবর্তনের বিশ্বাস দেখছি। মালদহের মাটি, বাংলার স্বর্গ, ভারতের বিকাশ।’’
মোদী বলেন, ‘‘মালদহ সেই জায়গা, যেখানে প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে। রাজনীতি এবং সাংস্কৃতির চেতনা। মালদহ বাংলার সমৃদ্ধির কেন্দ্র। আমি প্রথম বাংলার শিবেন্দুশেখর রায়কে প্রণাম জানাই, যার জন্য মালদহ আজও ভারতে রয়েছে। আজও নিজের আম, আমসত্ত্ব, রেশম, লোকসঙ্গীত, বৌদ্ধিক চেতনার জন্য পরিচিত।’’
মোদী বলেন, ‘‘জয় মা কালী। পবিত্র ভূমিকে প্রমাণ। মায়েরা, কেমন আছেন? আজ আমি খুশি। ছোট ছোট বালকেরা হনুমান, রাম, লক্ষ্মণ সেজেছে। ওদের শুভকামনা।’’