কমিশনের বৈঠক শেষে তৃণমূলের প্রতিনিধিদল। —নিজস্ব চিত্র।
রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে বৈঠকের পর কমিশনের ফুল বেঞ্চ দফায় দফায় রাজ্য প্রশাসনের আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করবে। মঙ্গলবার রাজ্যের মুখ্যসচিবের সঙ্গে বৈঠক রয়েছে।
কমিশনের বৈঠকে সাতটি দল যোগ দিয়েছিল। তৃণমূল, বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস ছাড়াও ছিল ফরোয়ার্ড ব্লক, আম আদমি পার্টি, ন্যাশনাল পিপল্স পার্টি। প্রত্যেক দল শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিয়েছে। বৈঠক শেষে কমিশন জানায়, অনেক দল এসআইআর প্রক্রিয়ার প্রশংসা করেছে এবং কমিশনের প্রতি ভরসা রেখেছে। রাজ্যে আগ্রাসন, সমাজবিরোধী কার্যকলাপ রোধে কমিশনকে কঠোর পদক্ষেপের আর্জি জানিয়েছে দলগুলি। শান্তিপূর্ণ, অবাধ নির্বাচন চাওয়া হয়েছে। অশান্তি এড়াতে সকলেই আরও বেশি সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের কথা বলেছেন। এক বা দু’দফায় নির্বাচনের আর্জি জানিয়েছেন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার সকলে আশ্বস্ত করেছেন, আইন মেনেই নিরপেক্ষ ভোট হবে। এসআইআর প্রক্রিয়াও নিরপেক্ষ ভাবেই হচ্ছে। যে কোনও নাম মোছার জন্য, যোগ করার জন্য বা পরিবর্তনের জন্য এখনও ৬, ৭ ও ৮ নম্বর ফর্ম পূরণ করা যাচ্ছে।
কমিশনের বৈঠকে (বাঁ দিক থেকে) রাজীব কুমার, ফিরহাদ হাকিম এবং চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। —নিজস্ব চিত্র।
কত দফায় ভোট চায় তৃণমূল? এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়েছেন ফিরহাদ, চন্দ্রিমারা। বলেন, ‘‘এটা ভোটের দফা আলোচনার জায়গা নয়।’’ বিজেপির বিরুদ্ধে তোপ দেগে ফিরহাদ বলেন, ‘‘বিজেপির পায়ের তলায় মাটি নেই। ওরা রাজ্যের সর্বনাশ করছে। নিরীহ মানুষকে এসআইআরের লাইনে দাঁড় করিয়েছে। ওদের জন্যেই এত মানুষ মারা গিয়েছেন।’’
তৃণমূলের প্রতিনিধিদলে ফিরহাদ হাকিমও ছিলেন। তিনি বলেন, ‘‘বিজেপি একটা ধারণা তৈরি করে দিয়েছে যে, এটা রোহিঙ্গা আর অনুপ্রবেশকারীদের জায়গা। সেই অনুযায়ী কমিশন নীতি তৈরি করেছে। কিন্তু আপনারা তো এই দু’মাসের প্রক্রিয়ায় তার কোনও প্রমাণ পেলেন না। বরং ভারতীয় নাগরিকদের হেনস্থা করলেন। কয়েকশো মৃত্যু, এত অসুস্থতার দায় কার? এত মানুষ নিজেদের কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। শুধু নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে। এটা কমিশনের ভুল হয়েছে। বিজেপির কথা শুনে তৈরি করা নীতিতে ভুল হয়েছে। আমাদের একটাই আবেদন, দেখবেন যেন কোনও ভারতীয় নাগরিক বঞ্চিত না হন।’’
রাজারহাটে কমিশনের সঙ্গে বৈঠক সেরে বেরিয়ে তৃণমূলের প্রতিনিধিরা। —নিজস্ব চিত্র।
এসআইআর নিয়ে তৃণমূল সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছে। কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে সে প্রসঙ্গ উঠেছিল। চন্দ্রিমা বলেন, ‘‘এসআইআর নিয়ে যা-ই বলি, ওঁরা বলছেন, মামলা সুপ্রিম কোর্টে আছে। তা হলে আর আমাদের ডাকলেন কেন? ডেকেছেন যখন, আমাদের কথা তো শুনতে হবে। সুপ্রিম কোর্টে যাওয়াটা কি আমাদের অন্যায় হয়েছে? বেশ করেছি সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছি। যাব না কেন? মানুষকে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।’’
নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে বৈঠক সেরে বেরোল তৃণমূলের প্রতিনিধিদল। কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। দাবি, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার তাঁকে চিৎকার করতে নিষেধ করেছেন। তাঁর ব্যবহারে চন্দ্রিমা অসন্তুষ্ট হয়েছেন বলে দাবি। চন্দ্রিমা বলেন, ‘‘আমি মহিলা, আমাকে বলছেন ডোন্ট শাউট! মহিলাদের প্রতি আসলে ওঁদের শ্রদ্ধা নেই। তাই মহিলাদের নামও কেটে দিচ্ছেন। আমার নাম না থাকলে সেটা প্রমাণ করার দায়িত্ব তো আপনার! কেন আমাকে লাইনে দাঁড়াতে হবে? মহিলাদের উপর চেঁচানোটা আপনাদের কাজ নয়।’’
কমিশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে কংগ্রেস নেতা প্রদীপ ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘এক দফা হোক, দু’দফা হোক, তিন দফা হোক— আমরা চাই নিরাপত্তা। নিরপেক্ষ ভাবে ভোট হবে, তা কমিশন নিশ্চিত করুক। এক দফায় ভোট হলে আমরা খুশি হব। কিন্তু নিরাপত্তাই অগ্রাধিকার। কমিশনকে পরিষ্কার করে জানিয়ে এসেছি।’’
এক দফায় ভোটের দাবি জানিয়েছে সিপিএম। সর্বোচ্চ দু’দফায় ভোট করানো হলেও তাদের আপত্তি নেই। এসআইআর নিয়ে কমিশনের বৈঠকে ক্ষোভ উগরে দিয়েছে সিপিএমের প্রতিনিধিদল। সেলিম বেরিয়ে বলেন, ‘‘আমরা জানতে চেয়েছি কমিশন একটা ভোটার তালিকা তৈরি করতে গিয়ে মানুষকে শত্রু বানাল কেন? মানুষের বিরুদ্ধে কেন যুদ্ধ ঘোষণা করল? কেন নির্বাচন কমিশন হয়ে গেল নির্যাতন কমিশন? ভোটের আগে তো তাদের নিজেদের সম্মান বজায় রাখতে হবে।’’
কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের পর সিপিএমের প্রতিনিধিরা। —নিজস্ব চিত্র।
বিজেপির প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে এসআইআর নিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি। কেবল নির্বাচনের পরিস্থিতি নিয়ে কথা হয়েছে। জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘এসআইআর নিয়ে আমরা আলোচনা করিনি। সুপ্রিম কোর্টে এ বিষয়ে মামলা আছে। আদালত যা সিদ্ধান্ত নেবে, আমরা মানতে বাধ্য। আজ বৈঠকে শুধু ভোট নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমাদের অসন্তোষের কথা জানিয়েছি।’’ এক বা সর্বোচ্চ দু’দফায় ভোট চেয়েছে বিজেপি। তা যাতে অল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়, তা-ও দেখতে বলা হয়েছে।
বৈঠকের পর বেরিয়ে তাপস রায় বলেন, ‘‘এত দিন রাজ্যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ভোট হয়নি। কমিশনের দায়িত্ব এই রাজ্যে গণতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করা। মমতা এবং তাঁর দলবল এখনও ভয় দেখাচ্ছে। জ্ঞানেশ কুমারের আঙুল কাটা মানে তো সংবিধানেরই আঙুল কাটা! তৃণমূলের এত বড় আস্পর্ধা হয়েছে! আমরা হিংসামুক্ত, ভয়মুক্ত, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চাই।’’
শিশির বাজোরিয়া বলেন, ‘‘রাজ্য পুলিশের ভূমিকায় আমরা অসন্তুষ্ট। তা কমিশনকে জানিয়েছি। আমরা চাই, প্রতি বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনীর তৎপরতায় ভোট হোক। ওয়েব ক্যামেরা থাকুক। কোথাও ক্যামেরা খারাপ হয়ে গেলে ভোট বন্ধ রাখতে হবে অথবা পুনর্নির্বাচন করাতে হবে। বুথে ঢোকার আগে সকলের পরিচয় যাচাই করতে হবে। কোনও পুলিশ বা দলের এজেন্ট সেখানে থাকবেন না। হিংসামুক্ত, শান্তিপূর্ণ ভোট করানো কমিশনের লক্ষ্য। আমরা বলেছি, আমরা তাতে সব সহায়তা করব।’’
কমিশনের ফুল বেঞ্চের কাছে ১৬ দফা দাবি জানিয়ে এসেছে বিজেপির প্রতিনিধিদল। কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদ্ব্যবহার থেকে শুরু করে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করা, রিগিং ঠেকানোর মতো দাবি রয়েছে সেই তালিকায়।
তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের আঙুল কেটে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। সোমবার কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে বৈঠকেও তা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বিজেপি। তারা চায়, এই মন্তব্য নিয়ে জ্ঞানেশ এফআইআর করুন। সে কথা কমিশনারকে জানিয়ে এসেছেন দলের প্রতিনিধিরা।
কংগ্রেসের প্রতিনিধিদলও রাজারহাটে পৌঁছেছে। এসেছেন আশুতোষ চট্টোপাধ্যায়, প্রদীপ ভট্টাচার্যেরা। আর কিছু ক্ষণের মধ্যেই কমিশনের সঙ্গে তাঁদের বৈঠক শুরু হবে।
রাজারহাটের বৈঠকস্থলে কংগ্রেসের প্রতিনিধিদল। —নিজস্ব চিত্র।
তৃণমূলের প্রতিনিধিদলের অন্যতম সদস্য রাজীব কুমার কমিশনের বৈঠকস্থলে প্রবেশ করেছেন।
সিপিএমের প্রতিনিধিরাও কমিশনের বৈঠকস্থলে প্রবেশ করেছেন। দলের রাজ্য় সম্পাদক মহম্মদ সেলিম ছাড়াও রয়েছেন আফরিন বেগম এবং শমীক লাহিড়ী।
সোমবার নির্বাচন কমিশনের বৈঠকস্থলে সিপিএমের প্রতিনিধিরা। —নিজস্ব চিত্র।
তৃণমূলের তরফে কমিশনের বৈঠকে যাবেন ফিরহাদ হাকিম, রাজীব কুমার এবং চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য।
বিজেপির প্রতিনিধিরা বৈঠকস্থলে ঢুকলেন। রয়েছেন শিশির বাজোরিয়া, তাপস রায় এবং জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়।
নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের আগে বিজেপির প্রতিনিধিদল। —নিজস্ব চিত্র।
সোমবার সকাল থেকে বৈঠকে বসবেন জ্ঞানেশরা। প্রথমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক হবে। আলোচনা হবে রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গেও।