মঙ্গলবার ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে ধর্নামঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: পিটিআই।
মমতা বলেন, “আমরা আশা রাখি। সুপ্রিম কোর্ট বিচারের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির উপরেও আমাদের ভরসা আছে। আমাদের আবেদন থাকবে, প্রকৃত ভোটারদের নাম যেন বাদ না যায়। নির্বাচন কমিশন যে বিভ্রান্তি তৈরি করছিল, সেটাও আদালত বলেছে। ভিডিয়োটা পুরোটা শুনলে দেখতে পাবেন। অর্ডারে সব লেখা থাকে না। কিন্তু অবজ়ার্ভেশনগুলো ডিরেক্ট ভিডিয়ো হয়। তাতে দেখতে পাবেন। চিন্তা না করে, আত্মহননের পথ বেছে না নিয়ে, মনকে দুর্বল না করে আপিলেট অথরিটির কাছে যাবেন। সব জায়গা উন্মুক্ত আছে।”
তৃণমূলনেত্রী বলেন, “উনি তো নিজের প্রচার করার পরে ভোট ঘোষণা করেন। এটা আমরা দেখেছি। আমাদের আগে দেখা আছে। ১৫ তারিখ উনি ব্রিগেড করার পরে যদি নির্বাচন ঘোষণাও হয়, চিন্তার কারণ নেই। একে বারে ভোটের আগের দিন পর্যন্ত সময় থাকছে।”
তিনি আরও বলেন, “অনেকটা বিচার পাওয়া গিয়েছে। যার জন্য আমরা পাঁচ দিন রাস্তায় বসে আছি। অভিষেক সভার সকলের মতামত নিয়েছে। বিচারের দরজা যখন উন্মুক্ত হয়েছে। পাঁচ দিন তো আমরা রাস্তায় আছি। আমি দরকার হলে ৫০ দিনও থাকতে পারি। অভিষেকের যে প্রস্তাব, আমরা কি ধর্নাটি আজকের মতো তুলে নিতে পারি?” মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্নের পর সকলে সমস্বরে ‘হ্যাঁ’ বলেন।
এর পরে ধর্নাস্থলের আশপাশের দোকানদার, বিক্রেতা, হোটেল এবং অন্য বাণিজ্যিক সংস্থাগুলির উদ্দেশে মমতা বলেন, “আপনাদের আমরা এই ক’দিন ব্যস্ত হয়েছি। হয়ত কখনও কখনও আপনাদের কান ঝালাপালা হয়েছে। আমারও সারা রাত কান ঝালাপালা হয়েছে। বিভিন্ন শব্দে, বিভিন্ন আওয়াজে। ওটা আমার কাছে ম্যাটার নয়। আমি সিঙ্গুরের ব্যাপারে পণ করে এখানে ২৬ দিন অনশনও করে গিয়েছিলাম। দেখুন কী ভাবে ইতিহাস মিলিয়ে দিয়েছে। সিঙ্গুরের সময়ে যে লোকটা জোর করে চাষিদের জমি অধিগ্রহণ করেছিলেন, সেই লোকটাকেই আজ নির্বাচন কমিশন এখানে ডেপুটি ইলেকশন কমিশন না কী যেন একটা পোস্ট দিয়ে পাঠিয়েছে।”
মমতা আরও বলেন, “সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনে তৃণমূলের জয়যাত্রা এখানের মঞ্চ থেকেই শুরু হয়েছিল। আগামী দিনেও জেনে রাখবেন, ইতিহাসের কিন্তু পুনরাবৃত্তি হয়। আমরা দেখলাম, মা কালীও আমাদের সঙ্গ দিলেন। মায়ের আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত হলেন কেউ কেউ। বুঝতে পারছেন, মা-ও কিন্তু ভালবাসেন মানবিকতা, মনুষ্যত্ব এবং সকলকে নিয়ে একসঙ্গে বাস করা।”
ধর্না তুলে নেওয়ার ঘোষণার পর ম়ঞ্চ থেকেই মমতা জানান, তিনি সিভি আনন্দ বোসের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন। তিনি বলেন, “আমাদের গভর্নর অনেক দিন এখানে ছিলেন। উনি ‘সৌজন্য’-তে আছেন। কাল চলে যাবেন। প্রাক্তন রাজ্যপাল, যাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, অবিচার হয়েছে— আমি তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যাব।”
মমতা বলেন, “আমরা বলেছিলাম ন্যায্যমূল্যে আলু কিনব। সরকার অধিগ্রহণ করবে। সেই প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে চালু হয়েছে। আমি আজকেও এখান থেকেই কথা বলেছি কৃষি দফতরের সচিবের সঙ্গে। বলেছি, কোথায় কোথায় চাষিরা বিক্রি করতে পারছে না সেটি দেখো এবং প্রক্রিয়াটি তরান্বিত করো। ধান তো আমরা কিনেই নিই। বিনা পয়সা চাল আমরা সব মানুষকে দিই। স্বাস্থ্য দিই, শিক্ষা দিই, মহিলাদের সম্মান দিই।”
মমতা বলেন, “কাউকে কাউকে টাকা দিয়ে কিনে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। লোকে যখন জেনে যায় কেউ টাকা নিয়েছে, সেটি কিন্তু চাপা থাকে না। মানুষের কাছে তখন চিরকালের মতো গদ্দার হয়ে পরিচিত থাকতে হয়। কেন এই বদনাম নেবেন? সম্মানের সঙ্গে বাঁচুন। আমাদেরও যদি কাউকে কেনার চেষ্টা করে, আমরা কিন্তু নজর রাখব। সেটির সম্পর্কে সতর্ক থাকবেন।”
মমতা বলেন, “আমি আশা করছি মানুষ অধিকার পাবেন। যে দরজাটা একেবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সেই দরজাটা অনেকটাই খোলা হয়েছে। সেটির সদ্ব্যবহার করুন।”
কেন্দ্রকে বিঁধে মমতা বলেন, “আগামী দিন বড় ভয়ঙ্কর! এমনতিই ২০০ লক্ষ কোটি টাকার উপর দেনা করে বসে আছে। আগামী দিনে কী করবে, কেউ জানে না।”
গ্যাসের দাম নিয়ে কেন্দ্রকে বিঁধে মমতা বলেন, “গ্যাসের দাম কমান। রোজ গ্যাস বেলুনের মতো নিজের পাবলিসিটি না করে। প্রচার করতে যে টাকা খরচ হচ্ছে, সেই টাকা তো ভর্তুকি দিতে পারেন। অন্তত কিছু না হলে ১ টাকা হলেও কমত। পাঁচ টাকা হলেও কমত।”
মমতা বলেন, “বিহারের যে উপমুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন মাছ-মাংস খাওয়া যাবে না, তিনি এখানে এসে বসে আছেন। এখানে এসেছেন বিজেপিকে কী করতে ভগবান জানেন। আমার তো মনে হয়, এই লোকগুলিকে চিনে রাখা দরকার। দেখে রাখা দরকার। এরা পদার্থ, না অপদার্থ? বাংলাকে গালাগালি দেয়।”
মমতা বলেন, “গ্যাসের দাম বাড়ছে, সে দিকে কোনও পাত্তা নেই। বলছে, আমি বাধ্য হয়েছি যুদ্ধের জন্য। তাই? মনমোহন সিংহ যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, গ্যাসের দাম ছিল ৪০০ টাকা। তার পর কত বার বেড়েছে? আজ ছোট গ্যাস ১১০০, বড় গ্যাস ২১০০। এর পর পেট্রল। রাশিয়া থেকে তেল আনবে। তেলের উপর তেলকড়ি মাখাতে হবে না? তেলকড়ি মাখবে জনগণ। আর উনি কোটি কোটি টাকা খরচা করে মিথ্যা কথার বিজ্ঞাপন করবেন।”
মমতা বলেন, “২৫ তারিখ মামলার পরবর্তী শুনানি রয়েছে। কিন্তু ১৫-১৬ তারিখ ভোট ঘোষণা হয়ে গেলেও এটা খেলা শেষ হবে না। খেলাটা সুপ্রিম কোর্টের হাতে রয়ে গেল। আমরা এখন দেখব। আমাদের পিটিশন অনুযায়ী নির্দেশগুলি হয়েছে। পর্যবেক্ষণগুলিও আমরা জেনেছি।”
তৃণমূলনেত্রী মমতা জানান, মূলত দু’টি দাবিতে ধর্না চলছিল। তিনি বলেন, “অবৈধ ভাবে যাঁদের নাম ‘বিবেচনাধীন’ রাখা হয়েছে, বা যাঁদের নাম ‘ডিলিট’ করে দিয়েছে, তাঁরা যাতে বিচার পান, সেই জন্য আমাদের ধর্না ছিল।” পাশাপাশি, নির্বাচন কমিশন বার বার বার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে ‘মিসলিড’ করে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের উল্টোপাল্টা বোঝাচ্ছে বলে অভিযোগ তোলেন তিনি। এই দুই-য়ের বিরুদ্ধেই তৃণমূলের ধর্না চলছে বলে জানান মমতা।
মমতা বলেন, “নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার পরেও সুপ্রিম কোর্টের হাতে মামলা থাকবে। আমার পিটিশনটি এখনও আছে। এখন নির্বাচন ঘোষণা করে দিলেও ভাববেন না যে আপনার সুযোগ নেই। ওরা বলেছেন, ভোটের আগের দিন পর্যন্ত যদি কারও নাম বাদ গিয়ে থাকে, আমাদের কাছে আসবেন। আমরা স্পেশ্যাল কেস হিসাবে এটি দেখব।”
অভিষেক বলেন, “আমি আপনাদের সকলের অনুমতি নিয়ে দিদিকে অনুরোধ করব। গতকালও বলেছিলাম। আজ সকালেও ওনাকে বলেছি। আপনি যে দাবি নিয়ে ধর্নায় বসেছেন, আপনার এই দাবিকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত মান্যতা দিয়েছে। এটিই বাংলার জয়, তৃণমূলের জয়। এখনও প্রায় ৫০-৫৫ দিন লড়াই বাকি। এপ্রিলের ৩০ তারিখ অবধি লড়াই চলবে। আপনাকে বাংলার ১০ কোটি মানুষের স্বার্থে সুস্থ থাকতে হবে। বাকিটা আমরা আছি। আমরা বুঝে নেব।”
তিনি আরও বলেন, “আমি আরেক বার অনুরোধ করব। আমি আপনাদের সকলের হয়ে দিদিকে অনুরোধ করব। আজ প্রায় পাঁচ দিন আপনি রাস্তায় বসে রয়েছেন। জ্ঞানেশ কুমার এসেছিল। হোঁচট খেয়ে ল্যাজ গুটিয়ে পালিয়েছে। বাংলার মানুষের প্রশ্নের জবাব জ্ঞানেশ কুমারের কাছে নেই। অন্য দিকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত আমাদের দাবিকে মান্যতা দিয়েছে। আমাদের আবেদন থাকবে, আপনি এই কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করুন। বাকিটা তৃণমূলের কর্মীরা, আমরা তো আছি। যে বিধানসভা এলাকায় যাওয়ার প্রয়োজন, আমি নিজে যাব। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো যাবেনই। ৮০ হাজার বুথে এদের গণতান্ত্রিক ভাবে দেউলিয়া করতে হবে।”
অভিষেক বলেন, “গায়ের জোরে ভোটারদের নাম কেটে দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের আবেদন বা আপিল করার কোনও সুযোগ থাকছে না। আমরা তা আদালতের কাছে রেখেছিলাম।” তিনি আরও বলেন, “সুপ্রিম কোর্ট ইসিকে ভর্ৎসনা করেছে। যাদের নাম বাদ যাচ্ছে, তারা যাতে আবার আবেদন করার সুযোগ পায়— সেই জন্য প্রাক্তন বিচারপতিদের আপিলেট ট্রাইবুনাল বেঞ্চ খোলার জন্য হাই কোর্টকে নির্দেশ দিয়েছে। এই জয় গণতন্ত্রের জয়।”
তিনি বলেন, “ইচ্ছাকৃত ভাবে নির্বাচন পিছোনোর জন্য চেষ্টা করছে জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন। ১৫ দিনের কাজকে তিন-চার লাগাতে চাইছে। সুপ্রিম কোর্ট শুধু আবেদন করার জায়গা নেই। সুপ্রিম কোর্ট এটাও বলেছে, আমরা বাংলার কেসকে স্পেশাল কেস হিসাবে বিবেচনা করব। নির্বাচনের এক দিন আগে পর্যন্ত ভোটার তালিকায় ভোটারের নাম তোলার জন্য সুপ্রিম কোর্ট আছে।”
তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের কথায়, “আমরা যে যে দাবি তুলেছিলাম, প্রত্যেকটি দাবিকে সুপ্রিম কোর্ট মান্যতা দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, নির্বাচনের এক দিন আগেও যদি কোনও সমস্যা হয়, তার জন্য ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আছে। নির্বাচন কমিশনের উপর দেশের সর্বোচ্চ আদালতও ভরসা রাখেনি। সেই জন্য নির্বাচন কমিশনকে এক তরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা সুপ্রিম কোর্টও দেয়নি। জুডিশিয়াল অফিসারদের নিয়োগ করা হয়েছিল। স্বাধীন ভাবে তাদের কাজ করতে দেয়নি বলে সুপ্রিম কোর্টে ভর্ৎসনার মুখে পড়েছে কমিশন।”
তিনি আরও বলেন, “এই লড়াই আজ শেষ নয়। যে দিন প্রতিটি মানুষ তাঁর ভোটাধিকার পাবে, সেই দিন লড়াই শেষ হবে। আদালত বলেছে পরবর্তী কালে দরকার হলে আবার কোর্টের দৃষ্টিআকর্ষণ করতে পারবেন। আমরা গোটা বিষয়টায় নজর রাখব।”
অভিষেক বলেন, “সাংবাদিকেরা জ্ঞানেশ কুমারকে একাধিক কঠোর প্রশ্ন করেছেন। তার একটিরও সদুত্তর জ্ঞানেশ কুমার দিতে পারেননি।”
ধর্মতলায় তৃণমূল কংগ্রেসের ধর্নামঞ্চে পৌঁছোলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবারও ধর্নামঞ্চে গিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক।
মমতা বলেন, ‘‘লালগড়ের কথা সব সময় মনে পড়ে। কারণ আমি প্রথম লালগড়ে ছুটে গিয়েছিলাম। নেতাইয়ে সাত জন যখন মারা গিয়েছিল তখনও ছুটে গিয়েছিলাম। লালগড়ে এখন নার্সিং ইনস্টিটিউট তৈরি হয়েছে। লালগড়ের রাস্তাঘাট ভাল হয়েছে। শালবনিতেও সিমেন্ট হাব হচ্ছে। কিন্তু আমি এক দিন লালগড়ে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে জঙ্গলমহলে আটকে দেওয়া হয়। সবই মনে পড়ে।’’
ধর্মতলার ধর্নামঞ্চে পৌঁছোল মতুয়া সম্প্রদায়ের মিছিল। তাঁদের আসতে দেখে মমতা বলেন, “মতুয়া সম্প্রদায়ের একটি বড় মিছিল আসছে। আমরা তাঁদের ভোটাধিকার দাবি করছি। মতুয়া, রাজবংশী, হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রিস্টান— সকল বৈধ ভোটারের জন্য আমরা ভোটাধিকারের দাবি করছি।”
ধর্নামঞ্চে হাতে তুলে নিয়েছেন তুলি। ক্যানভাসে এসআইআর নিয়ে ছবি আঁকছেন মমতা।সেখানে ইংরেজি হরফে লেখা এসআইআর।তার পর মুখ্য নির্বাচনী কমিশনারকে কটাক্ষ করে লেখেন ‘ভ্যানিশ কুমার’।
গত শুক্রবার থেকে ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে ধর্নায় বসেছেন তৃণমূলনেত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার তাঁর অবস্থান কর্মসূচির পঞ্চম দিন।