মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সমাজমাধ্যম।
৩ জুন থেকে ৪ জুলাই। ৩১ দিনের মধ্যে পদত্যাগ করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনোনীত রাজ্য সভানেত্রী। চন্দ্রিমার পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টা পরেই মুখ খুললেন মমতা। সমাজমাধ্যমে ২৬ মিনিটের লাইভ ভিডিয়ো বার্তায় তাঁকে বলতে শোনা গেল, প্রতীক যদি হাতছাড়া হয়েও যায়, ‘তাতে কী যায় আসে’! মনে করিয়ে দিলেন ২৮ বছর আগে যখন দলের জন্ম হয়েছিল তখন মাত্র ৫২ দিন সময় পেয়েছিলেন মানুষকে দলের প্রতীক চেনানোর। জন্মলগ্ন থেকে তৃণমূলের সাংগঠনিক কাজ যে ৩০বি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট থেকেই পরিচালিত হয়েছে সেটাও মনে করিয়ে দেন মমতা।
তা হলে কি তাঁর তৈরি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীক থেকে শুরু করে দলীয় কার্যালয় সব কিছু হারাতে পারেন, এই আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে বর্ষীয়ান নেত্রীর মনে? কে আসল তৃণমূল, তা নির্ধারণ করতে আগামী সোমবারের মধ্যে তৃণমূলের দুই শিবিরের বক্তব্য জানতে চেয়েছে নির্বাচন কমিশন।
মমতা বলেন, ‘‘ভ্যানিশ কুমার বাবু আমাদের পার্টিকে ফিনিশ করার জন্য ইলেকশনটাও করেছে… সিম্বল দিয়েও দেয়, তাতে কী যায় আসে! সিম্বল সেটাই হয়, যেটা সাধারণ মানুষ গ্রহণ করে। আমি এই সিম্বল দিয়ে ১ মাস ২২ দিনের মাথায় লড়াই করেছিলাম। তখন সিম্বল কাউকে চেনাতে পারিনি। এখন যদি আমি গলায় সিম্বল ঝুলিয়ে মানুষের কাছে বেরোই, আপনারা কী আমার কণ্ঠরোধ করতে পারবেন! অত সস্তা নয়।”
মেট্রোপলিটনে তৃণমূলের ভাড়া নেওয়া পার্টি অফিস নিয়েও শনিবার আগাগোড়া আক্রমণাত্মক ছিলেন মমতা। পার্টি অফিসের ভাড়া সংক্রান্ত নথিপত্র দেখিয়ে দাবি করলেন, আগামী বছরের অক্টোবর পর্যন্ত পার্টি অফিস ভাড়া নেওয়া আছে তৃণমূলের। পার্টি অফিসের ভাড়া সংক্রান্ত বিভিন্ন রশিদও দেখান মমতা। তাঁর দাবি, ওই ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ করে কালীঘাট-তৃণমূল। প্রতি মাসে এক লক্ষ টাকা করে ভাড়াও দেওয়া হয়। পার্টি অফিসের ভাড়ার নথিতে ফিরহাদের স্বাক্ষর প্রসঙ্গে মমতা বলেন, “কেউ গিয়ে বলছেন, তাঁর নামে (ভাড়া নেওয়া)। তিনি সই করেছেন। কিন্তু সইটা উনি ব্যক্তিগত ভাবে করেননি। দল অনুমোদন দিয়েছে বলে সই করেছেন। ব্যক্তি চলে যেতে পারেন, প্রতিষ্ঠান চলে যায় না। এটা প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি। আমি যেমন কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি দখল করতে পারি না, তেমনই আমাদের মা মাটি মানুষের সম্পত্তিও কেউ জোর করে দখল করতে পারে না।”
চন্দ্রিমার পদত্যাগকে আমলই দিতে চাননি মমতা। তিনি বলেন, ‘‘কেউ এক জন কোথায় গেল, আই ডোন্ট কেয়ার। আমি নেতা চাই না, কর্মী চাই।’’ তবে দলের ভাঙন নিয়ে মমতা যে বিড়ম্বনায় রয়েছেন, তা শনিবার ২৬ মিনিটের ভিডিয়োবার্তায় বার বার প্রতিফলিত হল। বক্তৃতার শুরুতেই উঠে এল ‘আমার তৃণমূল কংগ্রেস’ বা ‘আসল তৃণমূল কংগ্রেস’-এর মতো শব্দবন্ধ। একই সঙ্গে বিঁধলেন ঋতব্রত-শিবিরকেও। বললেন, “যাঁরা আমার সই করা সিম্বলে জিতেছেন, তাঁরা আজ বলছেন ২০২৩ সালের পর এই পার্টির কোনও অস্তিত্ব নেই।” এ প্রসঙ্গে মমতার দাবি, “আমাদের ২০২৭ সালের অক্টোবরে আবার ইলেকশন (দলীয় ভোটাভুটি) হওয়ার কথা। দলীয় সংবিধানে এটা বলা আছে। যদি ২০২৩ সালেই দলের স্বীকৃতি শেষ হয়ে যায়, তা হলে ২০২৬ সালে দাঁড়ালেন কী করে! পার্টির সিম্বল তো আমি দিয়েছিলাম।” ‘বিদ্রোহী’ শিবিরকে নিশানা করে মমতার প্রশ্ন, “দু’মাসও ধৈর্য্য ধরতে পারলেন না? এত তাড়াতাড়ি দলের সঙ্গে বেইমানি করে চলে গেলেন? বেইমানিরও তো একটা সীমা থাকা উচিত।”
মদন মিত্র এবং কুণাল ঘোষকে রাজ্য সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়ার কথা ঘোষণা করে, মমতা জানান, দলের রাজ্য সভানেত্রীর দায়িত্বও তাঁর হাতেই থাকবে।
মদন এবং কুণাল উভয়েই অতীতে তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব সামলেছেন। ২০০০ সালে মমতা দলের সাধারণ সম্পাদক করেছিলেন মদনকে। দল ক্ষমতাসীন থাকা কালে রাজ্য সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব সামলেছেন কুণালও। তবে এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। আগে মমতার সঙ্গে যে ‘ভিড়’ থাকত, তা এখন দৃশ্যত নেই। একের পর এক নেতা ‘বিদ্রোহী’ হয়ে কালীঘাট শিবির ছাড়ছেন। এ অবস্থায় ফের মদন এবং কুণালের উপরেই ভরসা রাখলেন মমতা।
দল তৈরির আগে থেকেই মদন ছিলেন প্রায় তাঁর ছায়াসঙ্গী। ছিলেন সুব্রত বক্সীও। তাঁর কথাও এ দিন উল্লেখ করেন মমতা। পুরনো তৃণমূল কর্মীদের কথায়, “১৯৯৮ সালে ছিল গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ। আর আজ ভাঙা হাট। পরিস্থিতি অনেকটাই আলাদা।’’
পরিস্থিতি যে আলাদা, তা মানছেন মদনও। মমতা তাঁর নতুন দায়িত্বের কথা ঘোষণা করার পরে আনন্দবাজার ডট কম যোগাযোগ করে কামারহাটির বিধায়কের সঙ্গে। নতুন দায়িত্ব প্রসঙ্গে মদন বলেন, “যে ভাবেই আসুক, যে রূপেই আসুক, দায়িত্ব কথাটার অর্থ একটাই রেসপন্সিবিলিটি। খারাপ দিনেও আসতে পারে, ভাল দিনেও আসতে পারে। ভাল দিনে আসলে জাপটে ধরব, খারাপ দিনে আসলে দূরে ঠেলে দেব— এটা ঠিক নয়। তবে এই মুহূর্তে দায়িত্ব পালন করা খুবই শক্তের। মানুষের উপরে নির্ভর করা ছাড়া আর কোন পথ নেই। মানুষ সবটাই দেখছে।”
পুরনো সঙ্গীদের হাতে গোনা কয়েকজন আজ রয়েছেন মমতার সঙ্গে। ভিডিয়ো বার্তায় পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি ঘোষণা করেন, ২১ জুলাইয়ের অনুষ্ঠান রিকশায় দাঁড়িয়ে হলেও, হবে।
মমতা কি পারবেন ঘুরে দাঁড়াতে? একুশের মঞ্চের দিকেই নজর সবার।