Manisankar mukhopadhyay

পাঠকের প্রতি দায়বদ্ধতা ছিল দেখার মতো

সাহিত্যকারের জনপ্রিয়তা এক বিরল বস্তু। রাতদিন কলম পিষেও কেউ হয়তো পাঠকের দাক্ষিণ্য পান না, কেউ হয়তো আবির্ভাবেই বিস্ফোরণ ঘটান। যেমন, শংকর। দেশ পত্রিকায় ‘কত অজানারে’ বেরোতে শুরু করতেই পাঠক হামলে পড়ল তার উপরে।

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:২৫
মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়।

মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।

অতি অমায়িক হাসিটি যেন এখনও চোখের সামনে ভাসছে। ওই হাসির ভিতর দিয়ে তাঁর অমলিন হৃদয় উঁকি দিত। শংকর বাংলা সাহিত্যের এক জন অগ্রণী লেখক তো ছিলেনই, ব্যক্তি শংকরও ছিলেন এ যুগের পক্ষে নিতান্তই বেমানান এক জন ভাল মানুষ। আদ্যন্ত ভদ্রলোক, শুদ্ধবাক এবং নিরহঙ্কার। ওই হাসির ভিতর দিয়েই যাঁর হৃদয়বত্তার প্রকাশ ঘটত। প্রথম জীবনে অর্থাভাবে বিস্তর কষ্ট পেয়েছিলেন বটে, কিন্তু প্রতিভা, ভাগ্য ও ভুজবলে তা তিনি অনায়াসেই অতিক্রম করে নিজেকে অনতিক্রম্য করে তোলেন। কী সাহিত্যে,কী পেশায়।

সাহিত্যকারের জনপ্রিয়তা এক বিরল বস্তু। রাতদিন কলম পিষেও কেউ হয়তো পাঠকের দাক্ষিণ্য পান না, কেউ হয়তো আবির্ভাবেই বিস্ফোরণ ঘটান। যেমন, শংকর। দেশ পত্রিকায় ‘কত অজানারে’ বেরোতে শুরু করতেই পাঠক হামলে পড়ল তার উপরে। কারণ, শংকর সেই আশ্চর্য বিবরণীতে এক অজানা জগৎকে খুলে দিয়েছিলেন। সেটা উপন্যাস নয়, রোম্যান্টিক কাহিনি নয়, তবু আশ্চর্য স্বাদু গদ্যে লেখা এক অচিনপুরের কথা। কী যে ভাল লেখা! আর, ওই তাঁর ব্যাটিং শুরু হল ব্র্যাডম্যানের মতো। কয়েক দশক ধরে বাঙালিকে মুগ্ধ ও ঋদ্ধ করেছেন তিনি।

তখন হুগলির ডানলপে এক বড় কর্তার ভূমিকায় কাজ করতেন। প্রায় প্রতি শীতেই কবি-সাহিত্যিকদের দল বেঁধে নিয়ে যেতেন ডানলপে। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার বিপুল আয়োজন হত সেখানে, আর চলত বল্গাহীন আড্ডা। ভারী সুন্দর সময় কাটত সেখানে। কারখানাটি নিজে সঙ্গে করে ঘুরিয়ে দেখাতেন। পরে উনি সিইএসসি-তে চলে আসেন।

স্ত্রীর অকালপ্রয়াণে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন, যেমন সব পুরুষই হয়। আরও নিঃসঙ্গতা এল, যখন তাঁর দুই মেয়েই বিয়ের পরে প্রবাসীহয়ে গেলেন। হাওড়ার বাস গুটিয়ে শংকর কলকাতায় থিতু হয়েছিলেন শেষ অবধি। পরিণত বয়সে গল্প বা উপন্যাস তেমন লিখতেন না, কিন্তু তাঁর ঝরঝরে গদ্যে চমৎকার কিছু আত্মজৈবনিক লেখা লিখেছিলেন, যেমন, ‘একা একা একাশি’। সম্ভবত, শ্রীরামকৃষ্ণ এবং স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি তাঁর আকর্ষণ জন্মায় এই সময়েই। তাঁদের নিয়েও তিনি অনেক লেখা লিখেছেন।

শংকর বয়সে আমার বা আমাদের প্রজন্মের লেখকদের প্রায় সমবয়সিই ছিলেন, তবু তাঁকে ঠিক আমাদের দলের লেখক বলে ধরা হয় না। একটু মানসিক বা জাগতিক দূরত্ব হয়তো ছিল। তবে, মাঝে মাঝেই এসে আমাদের সঙ্গে দেশ পত্রিকার দফতরে দেখা করে যেতেন। কোনও এক অজ্ঞাত কারণে শংকরের সঙ্গে আমাদের এই অনভিপ্রেত দূরত্বটা রচিত হয়েছিল।

পাঠকের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা এবং ভালবাসা ছিল দেখার মতো। গত কয়েক বছর ধরে দেখেছি, অশক্ত শরীরেও বইমেলার মাঠে খোলা জায়গায় টেবিল-চেয়ার পেতে বসে অগুনতি স্বাক্ষর দিয়ে চলেছেন প্রসন্ন মুখে। তখন ভাল করে হাঁটতেও পারতেন না, হুইলচেয়ারই বাহন। শুধু ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও এই বছরটা যেতে পারেননি।

সদাপ্রসন্ন মানুষটিকে আমি খুবই পছন্দ করতাম। তবে, শেষের দিকে খুব একটা দেখাসাক্ষাৎ হত না। ঘরবন্দি হয়ে পড়েছিলেন। অনুষ্ঠান বা সভা-সমিতিতে যেতেন না। টেলিফোনে মাঝেমধ্যে কথা হত।

শংকরের প্রয়াণ বাঙালির কাছে এক অশুভ সংবাদ। বয়স হয়েছিল বটে, এবং আমরা কেউই অমর নই, তবু এই তিরোভাব শোকাবহ। এই শূন্যতা বহুকাল থেকে যাবে।

আরও পড়ুন