— প্রতীকী চিত্র।
দু’-দু’জন চিকিৎসক তাকে মৃত বলে দিয়েছিলেন। খোঁড়া হয়ে গিয়েছিল কবর। তবে, কাঁথির এই কিশোরীর পরিণতি রবীন্দ্রনাথের গল্পের কাদম্বিনীর মতো হয়নি। কাদম্বিনীকে শেষমেশ মরে প্রমাণ করতে হয়েছিল যে সে মরেনি। যদিও কাঁথির এই কন্যার প্রাণ বেঁচেছে এক অ্যাম্বুল্যান্স কর্মীর সক্রিতায়।
পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি-১ ব্লকের দুলালপুরের বছর চোদ্দোর ওই নাবালিকা গত ৩ ফেব্রুয়ারি বিষক্রিয়াজনিত অসুস্থতা নিয়ে প্রথমে ভর্তি হয়েছিল মাজনা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। অবস্থা সঙ্কটজনক হওয়ায় তাকে কাঁথি মহকুমা হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু, আইসিইউয়ের শয্যা না না থাকায় প্রথমে তমলুক মেডিক্যাল, পরে কলকাতায় রেফার করা হয়। বাড়ির লোকজন তখন তাকে তমলুকের এক নার্সিংহোমে নিয়ে যান। সেখানকার এক চিকিৎসক অ্যাম্বুল্যান্সেই ওই কিশোরীর শুধু চোখ পরীক্ষা করে বলে দিয়েছিলেন যে তার মৃত্যু হয়েছে।
তখন সেই অ্যাম্বুল্যান্সে ছিলেন কাঁথি মহকুমা হাসপাতালের আইসিইউ অ্যাম্বুল্যান্স টেকনিশিয়ান রবীন্দ্রনাথ মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘‘পালস অক্সিমিটার এবং মনিটরিং মেশিনে তখনও প্রাণের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিল। কিন্তু, ওই চিকিৎসক কোনও ভাবে তা মানতে চাননি।’’ কিশোরীর বাড়ির লোকও রবীন্দ্রনাথের কথায় পুরোপুরি ভরসা করতে পারেননি। তবু বাড়ি ফেরার আগে মেয়েকে তাঁরা কাঁথি শহরের সেন্ট্রাল বাস স্ট্যান্ড এলাকায় এক চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বারে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনিও দেখে বলেছিলেন, ‘‘দুশো শতাংশ নিশ্চিত, ওর মৃত্যু হয়েছে।’’
এর পরে আর কোনও আশা রাখেনি কিশোরীর পরিবার। মেয়ের শেষকৃত্যের প্রস্তুতি শুরু করেন পরিজনেরা। খোঁড়া হয় কবর। রবীন্দ্রনাথ তখনও নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন। বার বার কিশোরীর পরিবারকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, যন্ত্রে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। একটি বার কাঁথি মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করেন। অ্যাম্বুল্যান্স চালক বিসমিল্লা খান বলছিলেন, ‘‘প্রথমে কেউ রাজি হচ্ছিল না। পরে অবশ্য ওই নাবালিকাকে কাঁথি হাসপাতালে নিয়ে যায় বাড়ির লোক।’’
রবীন্দ্রনাথ ততক্ষণে পুরো ঘটনা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে রেখেছেলেন। ভর্তির কিছুক্ষণের মধ্যেই মেয়েটি বমি করে। তার পরে কথাও বলে। বেশ কয়েক দিন কাঁথি হাসপাতালে চিকিৎসার পরে ৯ ফেব্রুয়ারি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ওই কিশোরী। তার মা বলেন, ‘‘ও যে বেঁচে ফিরবে সত্যিই ভাবিনি। ওই টেকনিশিয়ান দাদাকে অনেক ধন্যবাদ।’’ রবীন্দ্রনাথের ভূমিকার প্রশংসা করে কাঁথি হাসপাতালের সুপার অরুণরতন করণও বলেন, ‘‘ওই টেকনিশিয়ানের সক্রিয়তা ও দৃঢ়তা থেকে সকলের শিক্ষা নেওয়া উচিত।’’ আর রবীন্দ্রনাথ নিজে বলছেন, ‘‘মেয়েটা যে এ যাত্রায় বেঁচে ফিরল, এটাই আমার প্রাপ্তি।’’
কিন্তু দু’-দু’জন চিকিৎসক কী ভাবে একই ভুল করলেন? নন্দীগ্রাম স্বাস্থ্য জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক অসিতকুমার দেওয়ান বলেন, ‘‘কী ভাবে এই ঘটনা ঘটেছে আমরা খতিয়ে দেখছি। ওই কিশোরীর পরিবার অভিযোগ জানালে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে।’’