পাইপ লাইনের আশেপাশে আগুনের ব্যবহার নিয়ে সতর্ক করা হচ্ছে বুধবার। নিজস্ব চিত্র ।
পেশায় পুরসভার সাফাই কর্মী। রেললাইনের পাশের ঝুপড়িতেই ছিল মানু বিবির সংসার। ভোর রাতে উঠেই বেরিয়ে পড়তেই কাজে। মঙ্গলবারও সাইকেল নিয়ে বেরিয়েছিলেন কাজে। তাঁর চিৎকার শুনেই ঝুপড়ির দরজা-জানালা বন্ধ করে আগুনের স্রোত থেকে বেঁচেছিলেন আশেপাশের বাসিন্দারা। তবে বাঁচতে পারনেনি মানু। সাইকেল নিয়েই ঝলসে যাওয়া অবস্থায় তাঁকে পাওয়া গিয়েছিল পুকুর পাড়ে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরে মারা যান মানু বিবি। হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের ন্যাপথার পাইপলাইনে আগুন লাগে মঙ্গলবার। তাতে ঝলসে গিয়েছে ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের চিরঞ্জীবপুর, ঝিলপাড় ও পরমানন্দপুরের বহু এলাকা। মনুর মতো আহত আরেক যুবক মহিদুল ইসলামের বুধবার কলকাতার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে।
হলদিয়া-তমলুক রাজ্য সড়কের ধার দিয়ে যাওয়া পাঁশকুড়া-হলদিয়া রেললাইনের উত্তর দিকে ছিল শতাধিক ঝুপড়ি। পাশেই শিল্প প্রবেশ রেল স্টেশন। সেটি পরিত্যক্ত। এলাকা ঝোপ ও আগাছায় ভরা। সেই সবুজও ঝলসে গিয়েছে। বুধবার চিরঞ্জীবপুর, ঝিলপাড় ও পরমানন্দপুর জুড়ে ছিল পোড়া গন্ধ আর স্তব্ধতা।
স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, বছর পঁয়তাল্লিশের মানু মহিলা রোজ ভোর সাড়ে চারটায় উঠে রান্না সেরে সাইকেলে কাজে বেরোতেন। মঙ্গলবারও ব্যতিক্রম হয়নি। তবে সে সময়ই আগুনের একটা স্রোত ছুটে এসেছিল। যার একটি ভিডিয়োও (সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার পত্রিকা) সমাজমাধ্যমে ছড়িয়েছে। অনুমান করা হচ্ছে, ন্যাপথা বাষ্পীভূত হয়ে একটি ‘ভেপার ক্লাউড’ তৈরি করেছিল। সেটিই আগুনের স্রোত তৈরি করে।
মানুর পরিবারের এক সদস্য শেখ মুস্তাফা জানান, মানুর চিৎকার শুনে তাঁদের ঘুম ভাঙে। জানলা খুলে দেখেন, দূর থেকে আসছে আগুনের স্রোত। ভয়ে জানলা বন্ধ করে দেন মুস্তাফারা। তবে মানু নিজে ঘরে না ঢুকে চিৎকার করে অন্যদের সতর্ক করতে থাকেন। তখন তিনি ঝলসে যান। আগুনের স্রোত সরে গেলে অন্যরা বেরিয়ে দেখেন, পুকুর পাড়ে ঝলসে পড়ে রয়েছেন মানু। সঙ্গে সাইকেলটিও পুড়ে ছাই।
সুতাহাটার এক যুবকর মহিদুল ইসলামও অগ্নিদগ্ধ হন মঙ্গলবার। এই এলাকায় শ্বশুর বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। বুধবার তিনিও মারা যান। এ দিন তাঁর বাড়িতে অবশ্য কাউকে পাওয়া যায়নি। রেললাইনের ধারে পরমানন্দপুরে কয়েকটি ঝুপড়ি রয়েছে। সেখানে আগুনে পুড়ে যাওয়া একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন পাপ্পু দাস ও সুজিত ঘোষ। ওই বাড়ির বাসিন্দা বুলটি হাজরা ও সঞ্জীব হাজরা কলকাতায় চিকিৎসাধীন। আত্মীয় সুজিত বলেন, ‘‘চারপাশে ঘুরে দেখুন, কিচ্ছু নেই।’’
স্থানীয়দের বক্তব্য, কুয়াশার মতো ভাসমান গ্যাসস্তর জমেছিল। তাতেই এমন আগুনের স্রোত এসেছিল। এই অগ্নিকাণ্ডে একটা প্রশ্ন উঠছে, অতি দাহ্য পেট্রোপণ্যের পাইপলাইনের গা ঘেঁষে কী ভাবে বছরের পর বছর এমন বসবাস গড়ে উঠল? শিল্পাঞ্চলের সুরক্ষা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলে দিয়েছে মঙ্গলবারের এই অগ্নিকাণ্ড।