নিপা সংক্রমণ নিয়ে রিপোর্ট দিল কেন্দ্রীয় সংস্থা। —প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
নিপা আক্রান্ত দুই নার্সের সংক্রমণের উৎস কি নদিয়ার সীমান্ত লাগোয়া গ্রামের এক বিয়েবাড়ি? কেন্দ্রীয় দল ‘ন্যাশনাল জয়েন্ট আউটব্রেক রেসপন্স টিম’ (এনজেওআরটি)-এর প্রাথমিক রিপোর্টে এমনই ইঙ্গিত মিলেছে। দুই আক্রান্তের গতিবিধি ও সংক্রমণের ধারা বিশ্লেষণ করে রিপোর্ট দিয়েছে কেন্দ্রীয় সংস্থা। ঘুগরাগাছি গ্রামের সেই সফর এবং দুই নার্সের টানা দু’দিন একসঙ্গে ‘নাইট ডিউটি’—এই দুই সূত্রকেই আপাতত সংক্রমণের প্রধান যোগসূত্র হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞেরা।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত ১৫ থেকে ১৭ ডিসেম্বরের মধ্যে আক্রান্ত ওই নার্স নদিয়ার ঘুগরাগাছি গ্রামে একটি পারিবারিক বিয়েবাড়িতে গিয়েছিলেন। বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া এই অঞ্চলে খেজুরের রস ও গুড় খাওয়ার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। এই এলাকাটি বাদুড় থেকে মানুষের শরীরে নিপা সংক্রমণের (জুনোটিক স্পিল ওভার) জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। চিকিৎসকেরা মনে করেন, নিপা পশু থেকে মানুষে ছড়ায়। পোষা শুয়োর বা গরু-ছাগল, বাদুড়ের খাওয়া ফল খেলে তারাও বাহক হয়ে উঠতে পারে।
ওই নার্স সরাসরি খেজুর রস খেয়েছিলেন কি না তা স্পষ্ট নয়, তবে তাঁর শরীরে ভাইরাসের প্রাথমিক প্রবেশ ওখান থেকেই হতে পারে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় দল। সেখান থেকে ফেরার পর ২০ এবং ২১ ডিসেম্বর অন্য এক নার্সের সঙ্গে টানা দু’রাত ডিউটি করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ওই নার্সও আক্রান্ত হন। যদিও দু’জনের খুব কাছ থেকে মেলামেশার প্রমাণ মেলেনি, তবু সংক্রমণের ধারাক্রম সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে।
বর্তমানে দুই আক্রান্ত নার্সই বারাসতের হাসপাতালের আইসিইউ-তে ভেন্টিলেশনে রয়েছেন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁদের অবস্থা সঙ্কটজনক। কেন্দ্রীয় রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের ‘গ্লাসগো কোমা স্কেল স্কোর’ ৫-এর নীচে নেমে গিয়েছে, যা গভীর কোমা নির্দেশ করে। সিটি স্ক্যান এবং এমআরআই রিপোর্টে ধরা পড়েছে যে, তাঁদের মস্তিষ্কের ক্ষতি হয়েছে। ব্রেন স্টেম থেকে সেরিবেলাম—সবই ক্ষতিগ্রস্ত। মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে রক্ত সঞ্চালন থমকে যাওয়ার লক্ষণও দেখা গিয়েছে, যা সাধারণত স্ট্রোকের ক্ষেত্রে দেখা যায়।
এদিকে নিপা আতঙ্ক ছড়িয়েছে বর্ধমান ও দক্ষিণ ২৪ পরগনাতেও। কাটোয়ার ওই নার্সের সংস্পর্শে আসা বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের এক হাউসস্টাফ এবং এক নার্সের শরীরে উপসর্গ দেখা দেওয়ায় তাঁদের তড়িঘড়ি বেলেঘাটা আইডি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। এ ছাড়াও বাইপাসের ধারে একটি হাসপাতাল থেকে অ্যাকিউট এনসেফালোপ্যাথি সিনড্রোম আক্রান্ত এক তরুণীকেও নিপা সন্দেহে আইডি-তে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। প্রত্যেকের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে কল্যাণী এইমসের ল্যাবে।
রাজ্য স্বাস্থ্যভবন সূত্রে খবর, এই মুহূর্তে কড়া নজরদারিতে রয়েছেন দুই নার্সের সংস্পর্শে আসা ৮২ জন। শুধুমাত্র বর্ধমানেই ৩৪ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর) থেকে নমুনা সংগ্রহের বিশেষ উপযোগী একটি বাস কলকাতায় পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকলে ওই ভ্রাম্যমাণ ল্যাবরেটরিকে জেলাগুলিতে পাঠানো হবে। কেন্দ্রীয় বিশেষজ্ঞ দলটি বৃহস্পতিবার দফায় দফায় ভার্চুয়াল বৈঠক করে স্বাস্থ্যভবনের আধিকারিকদের সঙ্গে।