—প্রতীকী চিত্র।
নিপাতে এই দফায় রাজ্যের দু’জন আক্রান্ত। এখনও ভেন্টিলেশনেই রয়েছেন ওই দুই নার্স। উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের এক বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। হাসপাতাল সূত্রে খবর, দু’জনের অবস্থাই অত্যন্ত সঙ্কটজনক। আপাতত ভেন্টিলেশনে রয়েছেন তাঁরা। এর আগে ২০০১ সালে শিলিগুড়ি এবং ২০০৭-এ নদিয়ায় নিপা ভাইরাসে আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে। অর্ধশতাধিকের বেশি মানুষ সে সময় আক্রান্ত হয়েছিলেন। মারাও গিয়েছিলেন অনেকে। শিলিগুড়ির আগে বাংলাদেশেও এই ভাইরাসের সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছিল।
পরিসংখ্যানে নিপা এবং কোভিড
এর আগে করোনা অতিমারি ছড়িয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে দেশ তথা রাজ্যের। সেই অভিজ্ঞতার নিরিখে উঠে আসছে কিছু তথ্য এবং অতীত পরিসংখ্যান। তাতে দেখা যাচ্ছে, বেশ কিছু মিল এবং অমিল রয়েছে দু’টি ভাইরাসে। করোনা ভাইরাস ছড়ায় দ্রুত কিন্তু মৃত্যুর হার অপেক্ষাকৃত কম। অন্য দিকে, নিপা ভাইরাসের সংক্রমণের হার কম হলেও আক্রান্তদের মৃত্যুর হার অনেকটাই বেশি।
২০১৮ সালে কেরলে প্রথম এক জনের দেহে সংক্রমণ ঘটেছিল। পরবর্তী ধাপে ২১ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন। তার পর আক্রান্তের সংখ্যা দুইয়ে নেমে এসেছিল। যা থেকে বোঝা যাচ্ছে, প্রথম সংক্রমণের পরে ধাপে ধাপে হার কমে আসে অনেকটাই। কিন্তু কোভিডের ক্ষেত্রে প্রায় ব্যস্তনুপাতিক হারে প্রথম পর্যায়ে সংক্রমণ ছড়িয়েছিল। প্রতিটি ঢেউয়েই সংক্রমণের হার বেড়েছিল লাফিয়ে লাফিয়ে। করোনা দ্রুত গতিতে ছড়িয়েছিল একের পর এক রাজ্যে।
পরিসংখ্যান বলছে, নিপা অপেক্ষাকৃত ছোট এলাকায় এবং সীমাবদ্ধ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণ ছড়ায়। কোভিড দ্রুত এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্তদের মৃত্যুর হার নিপায় অনেকটাই বেশি। ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত। কোভিডের ক্ষেত্রে ০.৫ শতাংশ থেকে সর্বাধিক ২ শতাংশ (টিকা আবিষ্কারের আগে বিদেশে সর্বাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল)।
ছড়ায় কী ভাবে?
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রধান চিকিৎসক সৌমিত্র রায়ের কথায়, ‘‘কোভিড মূলত মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়। নিপা পশু থেকে মানুষে। পোষা শুয়োর বা গরু-ছাগল বাদুড়ের খাওয়া ফল খেলে তারাও বাহক হয়ে উঠতে পারে।’’ সেই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, দু’টি ভাইরাস সংক্রমণের ঘটনার মূল পার্থক্য মৃত্যুর হারে।
নিপা ছড়ায় মূলত বাদুড় থেকে মানুষে। বাদুড়ের সংস্পর্শে আসা ফল, তাল-খেজুরের রস বা গৃহপালিত পশু এ ক্ষেত্রে বাহকের (মিডিয়াম) কাজ করে। ফলে এ সময় ফল ভাল করে ধুয়ে খাওয়া, গাছ থেকে নামানো খেজুরের রস এড়িয়ে যাওয়া প্রয়োজন। গুড়ের ক্ষেত্রে অবশ্য কোনও অসুবিধা নেই।
চিন থেকে ছড়ানো কোভিডের ক্ষেত্রেও বাদুড়ের নাম উঠে এসেছিল। তবে সে ক্ষেত্রে সংক্রমণ মূলত ঘটেছিল মানুষ থেকে মানুষে। হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘ড্রপলেট’ থেকে। নিপা ভাইরাসের সংক্রমণে ‘বডি ফ্লুইড’ (বমি, প্রস্রাব, রক্তরস)-এর ভূমিকা উঠে এসেছে গবেষণায়।
আক্রান্তের উপসর্গ
নিপার ক্ষেত্রে আক্রান্তের সাধারণ জ্বর, শ্বাসকষ্ট ছাড়াও স্নায়ুর সমস্যা, খিঁচুনি এমনকি এনসেফেলাইটিসও দেখা দিতে পারে। ফলে ভাইরাস প্রতিরোধী ওষুধের চিকিৎসার পাশাপাশি উপসর্গ দেখে পরবর্তী ধাপে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা প্রয়োজন। নিপার ক্ষেত্রে ৪ থেকে ১৪ দিনের মাথায় উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অন্য দিকে, কোভিডের ক্ষেত্রে জ্বর, মাথাব্যথা, গা-ব্যথাতেই উপসর্গ সীমাবদ্ধ।
কী কী সতর্কতা নেওয়া প্রয়োজন
কোভিডের ক্ষেত্রে টিকা থাকলেও নিপা ভাইরাসের কোনও টিকা এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। দু’টির ক্ষেত্রেই আক্রান্তের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা এবং পরীক্ষা করানো জরুরি। সংক্রামক রোগের এক চিকিৎসক জানিয়েছেন, এ সময় তিনটি বিষয়ে নজর দিতে হবে—
১. চিকিৎসকদের খেয়াল রাখতে হবে, শ্বাসকষ্ট এবং এনসেফেলাইটিস একসঙ্গে হচ্ছে কি না
২. আক্রান্তের সংস্পর্শে এলেই দ্রুত পরীক্ষা করাতে হবে এবং উপসর্গ দেখা দিচ্ছে কি না, নজরে রাখতে হবে
৩. বাদুড়ের আধখাওয়া ফল বা শীতের মরসুমের তাজা খেজুরের রস খাওয়া চলবে না
কোভিডের ক্ষেত্রে মাস্ক পরা, দূরত্ব বজায় রাখা, হাত ধোয়া, পরিচ্ছন্নতার উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। নিপার ক্ষেত্রে এগুলির পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তি কার কার সংস্পর্শে এসেছেন, তা নির্ধারণ করে দ্রুত পরীক্ষার প্রয়োজন। এই মডেল ব্যবহার করেই দক্ষিণের রাজ্য কেরল সাফল্য পেয়েছে। বিশেষত, চিকিৎসক এবং চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দেহরসের সংস্পর্শ এড়াতে পিপিই পরা প্রয়োজন। চিকিৎসক সৌমিত্রের কথায়, ‘‘নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ মূলত এলাকাভিত্তিক বলে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা তুলনায় সহজ। কোভিডের ক্ষেত্রে ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়ানো সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই কঠিন।’’