West Bengal Elections 2026

অসুস্থতা অন্তরায়, নন্দ যদিও বলে চলেছেন ‘সব ঠিক আছে’

গভীর রাত পর্যন্ত মিটিং করে বাড়ি ফিরছেন, পরের দিন আবার সকাল সকাল বেরোনো। কিন্তু কথার মধ্যে সেই যোশ যেন নেই। কেন?

সুস্মিত হালদার
শেষ আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৪০
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

রাত ১১টা। দিনের শেষ খেয়া ছেড়ে গিয়েছে কিছুক্ষণ আগে। নবদ্বীপ থেকে স্বরূপগঞ্জ যেতে ভরসা রিজ়ার্ভ করা নৌকা।

জনা পাঁচেক যাত্রী নিয়ে তেমনই একটা রিজার্ভ নৌকা ছাড়বে ছাড়বে করছে। ছুটতে ছুটতে হাজির এক তৃণমূল নেতা। গলায় তখনও ঝুলছে দলের উত্তরীয়। কোনও মতে নৌকায় উঠে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “আর বলবেন না, খুব চাপ।” মাঝি প্রশ্ন করেন,“আজ যে এত দেরি হল কত্তা?” নেতা উত্তর দেন, “অনেক রাত পর্যন্ত মিটিং করতে হচ্ছে যে।” জানতে চাই, এ বার কী হবে? নেতা বলেন, “যা-ই হোক না কেন, নন্দদা ঠিক বেরিয়ে যাবে।”

নেতার নাম কল্লোল কর। পেশায় শিক্ষক তথা তৃণমূলের নবদ্বীপ ব্লক সভাপতি। প্রার্থীর দৌড়ে নাম ছিল তাঁরও। সে সব ভুলে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছেন গ্রামাঞ্চলের ভোটে তৃণমূলের পাঁচ বারের বিধায়ক পুণ্ডরীকাক্ষ ওরফে নন্দ সাহার জয় মসৃণ করতে। গভীর রাত পর্যন্ত মিটিং করে বাড়ি ফিরছেন, পরের দিন আবার সকাল সকাল বেরোনো। কিন্তু কথার মধ্যে সেই যোশ যেন নেই। কেন?

উত্তর মেলে পরের দিন। মোবাইল ফোনের ও-পার থেকে ব্লকের এক নেতা বললেন, “এ বার বিষয়টা কিন্তু সহজ হবে না। গত বিধানসভা ভোটে আমরা প্রায় ১৫ হাজার ভোটে লিড দিয়েছিলাম। এসআইআরের ধাক্কায় সেটা কমে ১১-১২ হাজারে নেমে আসতে পারে। হারজিত অনেকটাই নির্ভর করছে শহরাঞ্চলের উপর।” সেটা বুঝতে পারছেন বলেই নবদ্বীপকে ‘হেরিটেজ শহর’ হিসাবে গড়ে তোলার বিষয়টিকে হাতিয়ার করছে তৃণমূল। যদিও সে প্রসঙ্গ তুলতেই রে-রে করে ওঠেন বিজেপির বর্ষীয়াণ নেতা তথা প্রার্থীর ইলেকশন এজেন্ট জীবন সেন। তাঁর কটাক্ষ, “কোথায় হেরিটেজ? শহরে কোথাও তেমন কিছু দেখতে পাচ্ছেন? কোনও পরিকাঠামো? মন্দিরে স্টিকার মারলেই হেরিটেজ হয় না!”

রাজনীতির ময়দানে নন্দ সাহার দীর্ঘ দিন ধরে গড়ে ওঠা ভাবমূর্তি যে এখনও ‘ফ্যাক্টর’ সেটা বিলক্ষণ জানেন বিজেপি নেতারা। এ বার তাই তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারের কৌশল বদল করেছে তারা। তাঁকে আক্রমণের পথে না গিয়ে কৌশলে তাঁর অসুস্থতার বিষয়টি সামনে আনছে তারা। সেই সঙ্গে নবদ্বীপের পুরপ্রধান বিমানকৃষ্ণ সাহাকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। বিজেপি প্রার্থী শ্রুতিশেখর গোস্বামী ওরফে রাতুলের কথায়, “অসুস্থ মানুষটার বিরুদ্ধে কী আর বলব! তবে তাঁকে সামনে দাঁড় করিয়ে যারা ভোট চাইছে, তারা এক-একটা লুটেরা। আর নন্দ সাহা ধৃতরাষ্ট্রের মত চোখ বুজে থাকছেন।” তাঁর দাবি, “এ বার মানুষ বিমান সাহার অত্যাচার আর লুটের বিরুদ্ধে ভোট দেবে।”

নবদ্বীপ শহরের অলিগলিতে কান পাতলে অনেকটা এ রকম কথাই শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে যুব সমাজে। পোড়ামাতলায় চায়ের দোকানে বসে বছর পঁয়ত্রিশের এক যুবক দাবি করেন, “বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু করে মতি রায়ের বাঁধ, কোথাও প্রোমোটিং করতে বাদ রাখেননি পুরপ্রধান। কয়েক জন তো আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। এ বার পুরসভা-বিরোধী ভোট হবে। সেটা নন্দ সাহা সেটা কতটা সামাল দিতে পারেন তার উপরেই সব কিছু নির্ভর করছে।” পারবেন কি অসুস্থ নন্দ? বড়ালঘাটের কাছে চায়ের দোকানে কাপে চুমুক দিতে দিতে নন্দ-ঘনিষ্ঠ এক নেতা বলেন,“অসম্ভব নয়, তবে কঠিন। বড়কত্তার সেই ইমেজে কিন্তু এ বার ঘা লেগেছে।”

তৃণমূলরই একটা অংশ এখন শহরে ভোট কমার আশঙ্কা করছেন। তার উপরে আছে এসআইআরে নাম বাদের ধাক্কা। নবদ্বীপ বিধানসভা কেন্দ্রে সব মিলিয়ে ২৪ হাজারের বেশি নাম বাদ গিয়েছে। তার মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশই যে তাঁদের ভোটার, তা জনান্তিকে স্বীকার করছেন তৃণমূল নেতারা। তার উপরে বিজেপি প্রার্থী নবদ্বীপের একটি প্রভাবশালী গোস্বামী বাড়ির সন্তান। ফলে ভক্তকুল তাঁর সঙ্গেই থাকবে বলে আত্মবিশ্বাসী বিজেপি নেতারা। আবার জোয়ানিয়া গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় আদিবাসীদের মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করার সুবাদে সেখানেও যথেষ্ট প্রভাব আছে বিজেপি প্রার্থীর। বাম প্রার্থী স্বর্ণেন্দু সিংহও জোর প্রচার চালাচ্ছেন। অনেকের ধারণা, গত বারের তুলনায় এ বার লালঝান্ডার ভোট কিছুটা হলেও বাড়তে পারে। সেই বাড়তি ভোট কার ঝুলি থেকে বেরোবে তা নিয়েই চর্চা চলছে।

এ দিকে, গত কয়েক বছরে তৃণণূল নিয়ন্ত্রিত নবদ্বীপ পুরসভার অন্দরেও বিভাজন ক্রমশ চওড়া হয়েছে। দলের একাংশের দাবি, কোন্দল ঠেকাতেই এ বার নাকি নন্দ সহাকে ফের প্রার্থী করতে বাধ্য হয়েছে দল। তার পরেও একটি গোষ্ঠী অনেকটাই নিষ্ক্রিয় বলে দলের ভিতরে অভিযোগ রয়েছে।

গত বিধানসভা ভোটে এই কেন্দ্রে তৃণমূল জিতেছিল প্রায় ১৮ হাজার ভোটে। তার মধ্যে শহরে তারা এগিয়ে ছিল মাত্র ২,৭৬৫ ভোটে। ১২টি ওয়ার্ডে পিছিয়ে ছিলেন নন্দ। আবার লোকসভা ভোটে শহরে ১৭টি ওয়ার্ড মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার ভোটে পিছিয়ে ছিল তৃণমূল। এখন আবার পুরসভাকে ঘিরে শহরে দলের অন্দরে আড়াআড়ি বিভাজন, ব্লকেও গোষ্ঠী কোন্দল স্পষ্ট। মোট ১০টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মাত্র তিনটি পুরোপুরি সংখ্যালঘু প্রভাবিত। তবে এমন সব অঙ্ক ভুল প্রমাণ করে এত দিন জিতে এসেছেন নন্দ। কিন্তু এ বার?

রাত প্রায় ৯টা। শহরের ট্রান্সপোর্ট মাঠে সভা করে গাড়িতে উঠছেন তৃণমূল প্রার্থী পুণ্ডরীকাক্ষ সাহা। পরনে দুধ-সাদা পাঞ্জাবি। প্রশ্ন শুনে এক গাল হেসে বলেন, “সব ঠিকই আছে। জিত আমাদেরই হবে।” গাড়ির ইঞ্জিন জেগে ওঠে। দু’জন নন্দকে দু’পাশ থেকে ধরে তুলে দেন গাড়িতে। আলো-অন্ধকার ছুঁয়ে গাড়ি চলে যায়।

আরও পড়ুন