মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।
রাজনৈতিক পালাবদলের পরে দলের জনপ্রতিনিধিদের ‘আলোড়িত বিবেকে’র ধাক্কায় নাজেহালতৃণমূল কংগ্রেস!
নতুন সরকারের কাজে ‘ইতিবাচক’ ভূমিকা নিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে প্রশাসনিক বৈঠকে যোগও দিয়েছিলেন। দলের সঙ্গে বুধবার কার্যত সব সম্পর্ক ছিন্ন করলেন বারাসতের তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে থাকা দলের নেতা ও প্রাক্তন মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে তোপ দেগে এ দিনই বিদ্রোহী হয়েছেন কলকাতা পুরসভার দুই পুর-প্রতিনিধি সুশান্ত ঘোষ ও অরূপ চক্রবর্তী। সুশান্ত ১২ নম্বর বরো-র চেয়ারম্যান পদ ও অরূপ অ্যাকাউন্টস কমিটির সদস্যপদ ছেড়েছেন। দু’জনে অবশ্য পুরপ্রতিনিধি থাকছেন।
ক্ষমতা হারানোর পরে কি দলের নিয়ন্ত্রণও হারাচ্ছেন মমতা? ভোটে বিপর্যয়ের পর সংগঠন আর জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে রাখতে গত দু’সপ্তাহে হাফ ডজন বৈঠক করেছেন তিনি। কিন্তু কাজ হচ্ছে না! সকলে না-হলেও পঞ্চায়েত, পুরসভা থেকে শুরু করে সাংসদ পর্যন্ত সব স্তরেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বড় অংশই দলনেত্রীর সেই চেষ্টায় জল ঢেলে চলেছেন। ভোটের একটি পর্যালোচনা বৈঠকে লোকসভায় সংসদীয় দলের পদ হারিয়ে মমতার উপর চটেছিলেন কাকলি। প্রকাশ্যে ক্ষোভের কথা জানিয়ে আনুগত্যের ইতিহাস মনে করিয়ে ছেড়েছিলেন বারাসত সাংগঠনিক জেলার সভাপতি পদ। এ দিন সর্বভারতীয় মহিলা তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ারপার্সনের পদও ছেড়েছেন তিনি।
বরো (১২) চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে ১০৮ নম্বরের পুর-প্রতিনিধি সুশান্ত বলেন, ‘‘ভোটের পরে কর্মীরা বাড়ি ছাড়া হয়ে রয়েছেন। অথচ যাঁরা নেতা, মন্ত্রী হয়ে মমতাদিকে ঘিরে রেখেছিলেন, তাঁদের কারও এখন দেখা নেই। আমার কাজ, ঘরছাড়াদের ফেরানো। তার পরে দেখা যাবে।’’ নাম না-করে প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে নিশানা করে পুর-প্রতিনিধি অরূপের মন্তব্য, ‘‘হেরে যাওয়ার পর থেকে নিয়মিত পার্টি, ওয়ার্ড অফিসে রয়েছি। যাঁরা বড় নেতা-মন্ত্রী ছিলেন, তাঁরা দলের দুঃসময়ে পাশে নেই। মমতাদির ধারে-কাছে যেতে দিতেন না যাঁরা, তাঁরা কর্মীদের পাশে নেই।’’ নেতৃত্বের উদ্দেশে দু’জনেই পরাজয় মেনে নিয়ে ভবিষ্যৎ কর্মসূচি স্থির করার কথা বলেছেন। সুশান্তের অভিযোগ, ‘‘রুবির মোড়ে আমার অফিস ভাঙচুরের সঙ্গে বিজেপির কোনও সম্পর্ক নেই। এই বিষয়ে থানায় অভিযোগ করেছি।’’
কল্যাণীর বৈঠকের পর দিন দলের সঙ্গে সম্পর্ক নির্দিষ্ট করে আরও এক পা এগিয়েছেন কাকলি। তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীকে লেখা চিঠিতে তিনি জানান, দলের কোনও পদে থাকছেন না। লিখেছেন, ‘আমার বিবেক আজ গভীর ভাবে আলোড়িত। রেশন দুর্নীতি, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি-সহ একাধিক আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে’। তিনি জানিয়েছেন, পরামর্শদাতা সংস্থা আই-প্যাক নিয়ে নানা মহল থেকে নানা অভিযোগ উঠেছে। সেগুলোও তাঁকেবিচলিত করেছে।
দলীয় সাংসদের অভিযোগ সম্পর্কে বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘কাকলি এত দিন এ সব কথা বলেননি কেন? সময় তো অনেক ছিল। অনেকেই তো অনেক কথা বলেছেন নানা সময়ে।’’ দুই পুরপ্রতিনিধির পদক্ষেপ সম্পর্কে তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষের মন্তব্য, ‘‘নিশ্চয়ই দলের কিছু বিষয় সমালোচনার যোগ্য। অরূপ, সুশান্ত যা বলেছেন, দল তা নজরে রাখবে।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘খারাপ সময়ে হঠাৎ বিবেকের জ্বলন শুরু হল? দলের কর্মীরা আক্রান্ত, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো উচিত।’’ আর মত বদলের প্রবণতাকে কটাক্ষ করে এ দিন তৃণমূল নেত্রী মমতা লিখেছেন ‘গিরিগিটি’ নামে কবিতা। সেখানে তাঁর বক্তব্য, নিজেদের আর্থিক লেনদেন ও স্বার্থে দলের কর্মীদের সম্মান বিক্রি করা হচ্ছে।