— প্রতীকী চিত্র।
জেলার হাসপাতাল থেকে রেফার করা হয়েছে কলকাতায়। কিন্তু গভীর রাতে শহরে পৌঁছনোর পরে গুরুতর অসুস্থ রোগীকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আর একটিতে ঘুরছেন পরিজনেরা। কোথাও শয্যা মিলছে না। শেষ পর্যন্ত অ্যাম্বুল্যান্সেই মারা যাচ্ছেনসেই রোগী।
এমন ঘটনা মুদ্রার এক পিঠ। অন্য পিঠে দেখা যাচ্ছে দালাল চক্র। যার খপ্পরে পড়ে বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন রোগীর পরিবার।
রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এ হেন হয়রানি নিত্যকার ঘটনা। রেফার হয়ে আসা রোগী আদৌ শয্যা পাবে কি না, তা নিয়েই থাকে চরম সংশয়। কিন্তু অনেক বছর আগেই স্বাস্থ্য দফতরের দায়িত্ব নেওয়ার পরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেফার নিয়ে কড়া মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন। কথায় কথায় জেলা থেকে শহরে রোগীদের রেফার করা চলবে না বলে কঠোর বার্তা দিয়েছিলেন। জানিয়েছিলেন, রেফার করতে হলে নির্দিষ্ট কারণ দেখাতে হবে। এবং প্রথমে রোগীকে স্থিতিশীল করে, তার পরে যেখানে পাঠানো হচ্ছে সেখানে শয্যা এবং সেই চিকিৎসা আছে কি না, তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কিন্তু বছরের পর বছর ঘুরে আর একটা বিধানসভা ভোটের দুয়ারে এসেও রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা এখনও ‘রেফার রোগ’ মুক্ত হতে পারেনি। পাল্টা যুক্তি হিসেবে শহরের মেডিক্যাল কলেজগুলির দাবি, এত সংখ্যক রোগীকে শয্যা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি সব সময় থাকে না। যুক্তি একেবারে উড়িয়েও দেওয়া যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হল, জেলাতেও এখন ঝাঁ চকচকে মেডিক্যাল কলেজ তৈরি হয়েছে। জেলা হাসপাতাল, স্টেট জেনারেল ও সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালের পরিকাঠামো উন্নয়নে প্রচুর অর্থ খরচ করা হচ্ছে। ২০২৬-’২৭ অর্থবর্ষের অন্তর্বর্তিকালীন বাজেট বিবৃতিতেও দাবি করা হয়েছে, গত অর্থবর্ষে প্রাইমারি হেল্থ সেন্টার থেকে শুরু করে টার্শিয়ারি লেভলের হাসপাতাল পর্যন্ত বর্তমান পরিকাঠামোর সংস্কার ও মানোন্নয়নে ৮১০ কোটি টাকার বেশি খরচে ১,৩৬৫টি প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, এতই যদি পরিকাঠামো উন্নয়ন হয়, তা হলে তার পরেও কেন জেলা থেকে রেফার কমানো যাচ্ছে না? সরকারি চিকিৎসকেরাই দাবি করছেন, ঝাঁ চকচকে বিল্ডিংয়ের ওই সমস্ত হাসপাতালে কোথাও বিভাগ থাকলেও, পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই। কোথাও আবার চিকিৎসক থাকলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব। কোথাও আবার কিছুই নেই। অগত্যা জেলা থেকে রেফার করতে হয় শহরে। স্বাস্থ্য দফতরের অন্দরের খবর, কমবেশি এই সমস্যা সব জেলাতেই রয়েছে। যেমন, কোভিডের সময়ে চন্দননগর মহকুমা হাসপাতালে করোনার চিকিৎসার জন্য চুক্তিভিত্তিক চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে ৩০ শয্যার এইচডিইউ চালু করা হয়েছিল। দেওয়া হয়েছিল প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও। পরবর্তী সময়ে ইমার্জেন্সি কোভিড রেসপন্স প্যাকেজ ২-এর তহবিল থেকে ২৪ শয্যার হাইব্রিড ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিউ তৈরির অনুমোদন পেয়েছিল ওই হাসপাতাল।
যদিও এখনও পর্যন্ত স্থায়ী চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান না পাওয়ায় গত তিন বছর ধরে বন্ধ চন্দননগর মহকুমা হাসপাতালের এইচডিইউ-ই। অগত্যা ভদ্রেশ্বর, মানকুন্ডু ও চন্দননগরের বাসিন্দাদের গুরুতর অসুস্থ হলে রেফার করা হয় চুঁচুড়ার ইমামবাড়া জেলা হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে ২৪ শয্যার সিসিইউ চালু থাকার কথা। কিন্তু পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্সের অভাবে চালু মোটে ১২টি শয্যা। ফলে হুগলি থেকে রেফার হওয়া বেশির ভাগ সঙ্কটজনক রোগীকে আনতে হয় কলকাতায়।
যদিও রোগী হয়রানি বন্ধ করতে রেফার-অডিট চালু করেছে স্বাস্থ্য দফতর। কিন্তু সেখানেও এক শ্রেণির চিকিৎসকের অসাধু আচরণে রেফার বন্ধ হচ্ছে না বলে অভিযোগ চিকিৎসকদেরই। এবং তাঁরা ‘অফিসিয়াল-রেফার’ করছেন না। বদলে, রোগীকে ভর্তি নেওয়ার পরে পরিজনদের উল্টো কথা বোঝাচ্ছেন ওই চিকিৎসক বা তাঁদের সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মীরা। তখন ভয় পেয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য পরিজনেরা ‘ডিসচার্জ অন রিস্ক বন্ড’, অর্থাৎ ‘মেডিক্যাল অ্যাডভাইজ়ের বিপক্ষে গিয়ে নিজের দায়িত্বে রোগীকে নিয়ে চলে যাচ্ছেন’ বলে লিখে দিচ্ছেন। একটি মেডিক্যাল কলেজের এক জন আধিকারিকের কথায়, “এই প্রবণতা মারাত্মক বেড়েছে। যার ফলে অডিটে কিছুই ধরা পড়ছে না।”
শহরের মেডিক্যাল কলেজগুলি সূত্রের খবর, প্রতি সপ্তাহেই শুক্র ও শনিবার সন্ধ্যা থেকে রবিবার রাত পর্যন্ত জেলা থেকে রেফার হয়ে আসা রোগীর সংখ্যা বেশি থাকে। তবে প্রায় কোনও ক্ষেত্রেই আগাম কোনও তথ্য পাঠানো হয় না রেফার করা হাসপাতাল থেকে। শুধু বয়স্ক নয়, রেফারের ভোগান্তি পোহাতে হয় সদ্যোজাতদেরও। যদিও বেশ বছর কয়েক আগে স্বাস্থ্য দফতর এসএনসিইউ (স্পেশাল নিউবর্ন কেয়ার ইউনিট) থেকে রোগী রেফারে নির্দিষ্ট নিয়ম চালু করেছিল। বলা হয়েছিল, রেফার করা হাসপাতালের এসএনসিইউ ইনচার্জ চিকিৎসক আগে অন্য হাসপাতালে কথা বলে শয্যা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করবেন। তার পরে ওই সদ্যোজাতকে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে রেফার করা হবে। কিছু দিন এই নিয়ম চালু থাকলেও, এখন পুরোটাই খাতায়-কলমে, অভিযোগ চিকিৎসকদেরই।
খোদ সরকারি চিকিৎসকেরাই বলছেন, রাজ্যে এ মুহূর্তে ২৪টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে। নতুন করে ৪২টি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, ৭৬টি সিসিইউ তৈরি হয়েছে। মহকুমা, স্টেট জেনারেল, গ্রামীণ হাসপাতালেও শয্যা বাড়াতে নতুন ভবন তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এত কিছু পরেও, আদতে সেখানে কাজের উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে কি না, কিংবা যাঁরা আছেন তাঁদের সদিচ্ছা কতটা, সে বিষয়ে নজরদারির কোনও ব্যবস্থাই নেই স্বাস্থ্য দফতরের। যার সুযোগে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নীচের স্তরে বিভিন্ন বেনিয়ম, দাদাগিরি, দুর্নীতি অব্যাহত। প্রতিনিয়ত যার ফল ভুগতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখনও ‘রেফার-রোগ’ মুক্ত নয় বলে মানছেন স্বাস্থ্যকর্তারাও। স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম বলেন, “সমস্যাটি আমাদের নজরে রয়েছে। তাই, মাঝে মধ্যেই সুপারদের বিষয়টি খতিয়ে দেখার ও নিয়মিত নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়।” সমস্যা কমাতে বিভিন্ন জেলা বা মহকুমা স্তরের হাসপাতালেও পরিকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন কাজ চলছে বা পরিকল্পনা স্তরে রয়েছে বলেও দাবি স্বাস্থ্যকর্তাদের।
(চলবে)