— প্রতীকী চিত্র।
সময়ের মধ্যেই চলে এসেছিল ‘অ্যাপ-বাইক’। রাতের ফাঁকা রাস্তা। চালকের বয়সটা বেশ অল্প। কথা প্রসঙ্গে জানা গেল, চালক ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। কৌতূহল থেকে প্রশ্নটা করতেই জবাব এল—“দাদা বাড়ির চাপ। চেষ্টা করছি। সরকারি চাকরি আর চাঁদ হাতে পাওয়া তো একই ব্যাপার। ভাগ্যিস শহরে আছি, তাই বাইক-ই ভরসা। গ্রামে থাকলে মাটি কাটতে হত হয়তো!”
‘মাটি কাটা’ কথাটা বড্ড পরিচিত লাগছিল। মনে পড়ল, কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে এক বার এমন কোনও একটা মন্তব্য ছিল একশো দিনের কাজের প্রকল্প নিয়ে। অবাক লাগল, সরকারি চাকরি থেকে সরাসরি মাটি কাটা? মাঝে আর কোনও চাকরিবাকরি নেই নাকি? গন্তব্য ততক্ষণে চলে আসায় চালককে সেই প্রশ্ন অবশ্য আর করা হয়নি।
শিল্পের সঙ্গে কর্মসংস্থানের যোগ নিয়ে মতবিরোধ নেই। তেমন উল্লেখযোগ্য লগ্নি হলে, তাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আর্থিক কর্মকাণ্ডের প্রভাব পৌঁছে যায় প্রান্তিক স্তর পর্যন্ত। ফলে নানা আয়ের সুযোগ চলে আসে বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে। আর তা না হলে? গ্রামীণ কর্মসংস্থানের উপরে চাপ বাড়ে। যেটাকে ‘মাটি কাটা’ বলেই হয়তো বোঝাতে পারেন অ্যাপ-বাইকের চালক। এ রাজ্যে যার মূল উৎস, একশো দিনের কাজ।
পশ্চিমবঙ্গে এই একশো দিনের কাজের উপরে মানুষের নির্ভরতা কেমন? সরকারি তথ্যই বলছে, ২০২২ সালে একশো দিনের কাজের প্রকল্পে যত জন যুক্ত ছিলেন, পরবর্তী তিন বছরে সেই সংখ্যা বেড়েছে বেশ কয়েক গুণ। অথচ দুর্নীতির অভিযোগে একশো দিনের কাজের কেন্দ্রীয় বরাদ্দ বন্ধ সাড়ে তিন বছরেরও বেশি। এই নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত জল গড়িয়েছে। শেষে আদালতের নির্দেশ আসার পরপরই এই প্রকল্পকে খোলনলচে বদলে ফেলছে কেন্দ্রীয় সরকার।
এত দীর্ঘ সময়ে একশো দিনের কাজ বন্ধ থাকায় তার ধাক্কা লেগেছে গ্রামীণ কর্মসংস্থানে। বিরোধীদের দাবি, পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যাও এর মধ্যে বেড়েছে তাল মিলিয়ে।
রাজ্য সরকার অবশ্য কর্মশ্রী প্রকল্প এনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। সরকার সূত্রে বলা হয়, রাজ্যের যা আর্থিক সঙ্গতি, তাতে প্রথমে ৫০ দিনের কাজের নিশ্চয়তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পরে অবশ্য তা বাড়িয়ে ৭৫ দিন করা হয়। ২০২২ সালের মাঝামাঝি পঞ্চায়েত দফতরের তথ্য ছিল, একশো দিনের কাজের প্রকল্পে ‘জব-কার্ড’ থাকা প্রায় ৩ লক্ষ ৭০ হাজার শ্রমিককে নতুন প্রকল্পে কাজে লাগানো হয়েছে বিভিন্ন দফতরের মাধ্যমে। এখন সরকারি তথ্য বলছে, ওই প্রকল্পে নথিবদ্ধ শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৫২.১৮ লক্ষ। প্রকল্পটি চালু হওয়ার (২০২৪ সালের ৭ মার্চ গেজেট-বিজ্ঞপ্তি) পর থেকে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৩৬৮৫.৯০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। অর্থাৎ, এ পর্যন্ত এক জন শ্রমিক পেয়েছেন ৭,০৬৪ টাকা। রাজ্য সরকারের ‘এগিয়ে বাংলা’ পোর্টালে কর্মশ্রীর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, “কোনও কাজই ছোট নয়। শ্রমিকের মর্যাদাকে সম্মান দেওয়া প্রয়োজন।”
প্রশ্ন উঠছে, এ রাজ্যে বিনিয়োগ-খরাই কি এত মানুষকে স্বল্প-আয়ের কাজের দিকে ঠেলে দিয়েছে?
১ থেকে ১০০ টাকা—এর মধ্যে যে কোনও অঙ্কের আয়ই কর্মসংস্থানের বৃত্তে আসতে পারে তাত্ত্বিক আলোচনায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেই আয় মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোনও মানুষের স্বাভাবিকচাহিদাগুলি মেটানোর পক্ষে যথেষ্ট কি না, তা দেখা প্রয়োজন। বিরোধীদের অভিযোগ, বাস্তব অর্থে ভাল বেতনের কর্মসংস্থান রাজ্যে যে হচ্ছে না, এটা তারই প্রমাণ। স্বল্প আয়ের সংসারে সরকারি প্রকল্পগুলির উপর বাড়ছে নির্ভরতা। সুযোগের অভাব বড় অংশের মানুষকে তা থেকে মুক্ত হতে দিচ্ছে না। তৃণমূলেরই রাজ্য সরকারি কর্মচারী ফেডারেশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য মনোজ চক্রবর্তীর দাবি, এখন বিভিন্ন সরকারি দফতর মিলিয়ে গোটা রাজ্যে প্রায় ২.৩৪ লক্ষ শূন্য পদ রয়েছে। তাঁর আরও বক্তব্য—১৯৮০ সালে প্রতি এক লক্ষ জনসংখ্যায় নিযুক্ত ছিলেন ৬৬৭ জন সরকারি কর্মচারী। এখন তা কমে হয়েছে ২১৯। অবশ্য, স্বল্প বেতনে আংশিক সময় বা চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের নিয়োগ যে করা হচ্ছে, তা জানাচ্ছেন মনোজ-ই।
২ ডিসেম্বর গত প্রায় ১৫ বছরে রাজ্য সরকারের কাজের মূল্যায়ন-অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সরকারি কাজকর্মের কারণে দারিদ্রসীমার উপরে উঠে এসেছেন প্রায় ১.৭২ কোটি মানুষ। কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ২ কোটির। ৪০% কমেছে বেকারত্বের হার। প্রস্তাবিত ছ’টি আর্থিক করিডরে ২ লক্ষ কোটি বিনিয়োগের সঙ্গে হবে ১ লক্ষ কর্মসংস্থান। কর্মমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে প্রায় ৪২ লক্ষ যুবক-যুবতীকে। কর্মশ্রী প্রকল্পে ৭৫ দিনের কাজ দিচ্ছে সরকার। শ্রমশ্রী প্রকল্পে প্রায় ৩১.৭৭ লক্ষ ফিরে আসা পরিযায়ী শ্রমিককে কাজ দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ২.২১ কোটি উপভোক্তার জন্য লক্ষ্মীর ভান্ডারে এ পর্যন্ত খরচ করা হয়েছে ৭৪ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ৯৫টি প্রকল্প চলছে, যা মানুষকে সরাসরিসাহায্য করছে।
বিরোধীদের পাল্টা অভিযোগ, রাজ্যে শিল্পের যে খরা চলছে, তাতে শিল্পমুখী কারিগরি শিক্ষা নিয়ে স্বল্প বেতনে ভিন্ রাজ্যে পাড়ি দেওয়া ছাড়া খোলা নেই কোনও রাস্তা। সেই চাকরিতে তাঁদের চাহিদা কত দিন থাকবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তেমন বড় বিনিয়োগ বা শিল্প থাকলে তার চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ পেয়ে যুবক-যুবতীরা এ রাজ্যেই ভাল ভাবে কাজ করতে পারতেন। আবার বড় শিল্প প্রধানত হয় গ্রাম-ঘেঁষা এলাকায়। ফলে সেখানকার অর্থনীতি-কর্মসংস্থানও চাঙ্গা হতে পারত। একশো দিনের মতো প্রকল্পে এত চাপ বাড়তও না।
(চলবে)