— প্রতীকী চিত্র।
এ রাজ্যের শাসক দলের রাজনৈতিক ‘খেলা হবে’ ভাষ্যের মোকাবিলাতেই কি নিজেদের কৌশল ঘন ঘন বদলাচ্ছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন—চর্চা বিভিন্ন মহলে। তবে কৌশল যা-ই হোক না কেন, চলতি এসআইআরে কমিশনের এত বার কৌশল বদল, ওয়টস্যাপে নির্দেশ পাঠানোর ফলে সমস্যায় পড়ছেন জেলা আধিকারিকদের প্রায় সকলেই। সাধারণ ভোটারদের ভোগান্তিও চরমে উঠেছে। কমিশনের দাবি, পদ্ধতিগত স্বচ্ছতার স্বার্থে যা করার, সেটাই হচ্ছে। কিন্তু সেই দাবি কতটা যুক্তিযুক্ত, ইতিমধ্যেই সেই প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন স্তর থেকে।
জেলা-কর্তাদের একটা বড় অংশের অভিযোগ, এনুমারেশন পর্ব থেকেই ঘন ঘন অবস্থান বদলের সেই ছবি ধরা পড়েছে। কখনও বলা হয়েছিল, ফর্মে ভোটারের ছবি বাধ্যতামূলক, কখনও তা ঐচ্ছিক করে দেওয়া হয়। পরে বলা হয়, বিএলও-কেই ছবি তুলে আপলোড করতে হবে। আবার বলা হয়, প্রবীণ ব্যক্তিদের ছবি তুলতে হবে, পরে তা বদলে হয় ভিডিয়ো-ফুটেজ। এখানেই শেষ নয়। শুনানি শুরুর পরে এক সপ্তাহ বয়স্কদের লাইনে দাঁড় করানো হয়েছে। কোনও কোনও মহল থেকে এমন যুক্তিও দেওয়া হয় যে, ভোটের সময়ে তো তাঁরা লাইন দেন! তা হলে এখন কেন লাইন দিতে পারবেন না? যদিও সামগ্রিক চাপের মুখে পরে পঁচাশি বছর বয়স্কদের জন্য বাড়ি গিয়ে শুনানির নিয়ম চালু করে কমিশন। কিন্তু তার পরেও ষাট, সত্তর, আশি বছরের মানুষদের হয়রানি চলতেই থাকে। তা নিয়ে এখনও স্পষ্ট কোনও বিধি জানায়নি কমিশন।
এনুমারেশন ফর্ম আপলোডের ক্ষেত্রেও বিধি বদলেছে। এই সব ক্ষেত্রে নাজেহাল হয়েছেন বিএলও-রা। আপলোড-পর্বের পরেও তাঁদের অ্যাপে ঘন ঘন বদল করা হয়। ফলে তাঁদের কাজের মেয়াদ দীর্ঘতর হয়। এ ক্ষেত্রেও বিএলও-দের কমিশন হুমকি-হুঁশিয়ারি দিয়েছে বলে বার বার অভিযোগ উঠেছে। জেলযাত্রার হুমকিও দেওয়া হয়েছে একসময়ে। অভিযোগ উঠেছে, এখন শুনানি-পর্বে ইআরও-দের ঘাড়ে সব দায় চাপিয়ে দিতে চাইছে কমিশন। আবার তাঁদের উপরে নজরদারির জন্য দু’হাজার পর্যবেক্ষকও নিয়োগ করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এত বার এত রকম নিয়ম বদল যেখানে, নথি গ্রহণের ক্ষেত্রে যেখানে জটিলতা অব্যাহত, সেখানে পান থেকে চুন খসলে শুধু ইআরও দায়ী হন কী ভাবে?
কাজের ক্ষেত্রে সমস্যা এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, বিএলও-দের একাংশ পথে নেমেছেন। কেউ কেউ কাজ ছাড়তে চাইলে তাঁকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে বলেও কমিশন হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
সার্বিক ভাবে, কমিশনের এই কাজকর্ম নিয়ে ভোটার থেকে আধিকারিক, সব মহলেইক্ষোভ চরমে।
খামখেয়ালিপনার উদাহরণ দিয়ে এক জেলা-কর্তা বলেন, ‘‘আগে বলা হয়েছিল, শুনানির তথ্য পাঠাতে হবে জেলাশাসককে। তিনি পুনর্যাচাই করবেন জমা পড়া নথি। এখন আবার বলা হচ্ছে, প্রতিদিনের পুনর্যাচাই তথ্য যেমন দিতে হবে জেলাশাসককে, তেমনই জানাতে হবে জেলাশাসকের অধীনস্থ আধিকারিকদেরও। সমস্যা হয়েছে, তথ্যগত অসঙ্গতি বা লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি নিয়ে। তাঁদের শুনানি হবে, না কি নথি জমা করতে হবে, তার সুনির্দিষ্ট জবাব এখনও মেলেনি কমিশনের থেকে।’’
তবে আধিকারিকদের একাংশের আবার পাল্টা বক্তব্য, এসআইআরের প্রথম পর্বে জেলায় জেলায় অসাধু হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছিল। শাসকদলের হয়ে বেসরকারি ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাকের হস্তক্ষেপের অভিযোগও ওঠে। ডেটা-এন্ট্রি-অপারেটর রাজ্য নিয়োগ না করায়, সেই জায়গা নেন বেসরকারি কিছু ডেটা-এন্ট্রি-অপারেটর। তাই ভোটার-তথ্য নথিবদ্ধ এবং আপলোডের সময়ে অনেক ধরনের গোলমাল ধরা পড়ে। সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের অনুমান, এই প্রবণতা ঠেকাতেই সম্ভবত কিছু ক্ষেত্রে সম্ভবত কৌশল বদলেছে কমিশন। যদিও প্রশ্ন উঠেছে, শুধু সে জন্যই এত ঘন ঘন নিয়ম বদল কেন? এর ফলে তো সাধারণ মানুষ ভোগান্তির মুখে পড়েছে।
কমিশন সূত্র আবার দাবি করেছে, পরিস্থিতিগত কারণেই নানা সময়ে সিদ্ধান্তের সংশোধন করতে হয়েছে। তাদের যুক্তি— এসআইআর শুরুর আগেই বলে দেওয়া হয়েছিল, ১৩টি তালিকাবদ্ধ নথির বাইরে কোনও কিছু গ্রাহ্য হবে না। তার পরেও তালিকার বাইরে বহু ধরনের নথি তৈরি করে তা শুনানিতে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়। এর পাল্টা যুক্তিতে আবার অনেকে বলছেন, বহু ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া এলাকায় নিরক্ষর মানুষের পক্ষে কমিশনের ওই ১৩টি নথি যথেষ্ট নয়। যে নথি সব থেকে বেশি মানুষের কাছে আছে, সেই আধার কার্ডকে একক ভাবে স্বীকৃতি দেয়নি কমিশন। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী আর্জি না-জানানো পর্যন্ত চা-বাগান এলাকাতেও নথি সংক্রান্ত ছাড় দেওয়া হয়নি। গত কয়েক বছরে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার মতো একাধিক প্রকল্পে বরাদ্দ বন্ধ করেছে কেন্দ্র। অথচ তার সমতুল্য রাজ্যের প্রকল্পগুলির নথিকে মান্যতা দেয়নি কমিশন।
কমিশনের যুক্তি, রাজ্য স্বরাষ্ট্র দফতর নিজেরাই জানিয়েছিল, ডমিসাইল শংসাপত্র অবাঙালিদের একাংশের জন্য। আবার ‘ফ্যামিলি রেজিস্টার’ তৈরির নেপথ্যে সুনির্দিষ্ট সরকারি বিধি এ রাজ্যে না থাকায় তা পশ্চিমবঙ্গের জন্য বৈধ নয়। কিন্তু রাজ্যের নিজস্ব যে সব নথি আমজনতার কাছে থাকতে পারে, সেগুলিকে কেন মান্যতা দেওয়া হচ্ছে না, এর কোনও স্পষ্ট জবাবকমিশন দেয়নি।