অমিত শাহ। — ফাইল চিত্র।
প্রথমে পশ্চিমবঙ্গ জয়। তার পর ধাপে ধাপে তৃণমূল, শিবসেনা (উদ্ধব)-এর মতো বিরোধী দলের রক্ষণ তছনছ হয়ে গিয়েছে তাঁরই ধুরন্ধর কৌশলে। ওই দুই বিরোধী দলের মতোই কার্যত ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে সমাজবাদী পার্টিও। শেষ পর্যন্ত যে ভাঙন সম্ভব হলে, সংসদে সংবিধান সংশোধনকারী বিল পাশ করাতে গিয়ে আর অস্বস্তিতে পড়তে হবে না শাসক শিবিরকে। রাজনীতিকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বারক্ষমতায় আসা থেকে বিরোধীদের কোমর ভেঙে দেওয়ার পিছনে মূল মাথা যাঁর, তিনি অমিত শাহ। তাঁদের মতে, রাজ্য জয় থেকে বিরোধীদের দুর্বল করা— এই ঘটনাগুলি ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির অভ্যন্তরে অমিত শাহের আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
দলে নিরঙ্কুশ আধিপত্যের লক্ষ্যে সলতে পাকানোর কাজ তিনি শুরু করেছিলেন অনেক দিন ধরেই। গত কয়েক বছরে একের পর এক রাজ্য জয় করেছে বিজেপি, আর নিজের পছন্দমতো ব্যক্তিকে মুখ্যমন্ত্রী করেছেন অমিত শাহ। নির্বাচন কমিশন থেকে তদন্ত সংস্থার কর্তা— সকলেরই নিয়োগের পিছনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রচ্ছন্ন হাত রয়েছে বলেই অভিযোগ করেন বিরোধীরা। ওড়িশা জয়ের পরে তাঁর কাছে শেষ ‘ফ্রন্টিয়ার’ ছিল পশ্চিমবঙ্গ। ২০২১ সালে ব্যর্থ হলেও, এ যাত্রায় বাজিমাৎ করেন তিনি। দু’শোর বেশি আসন জিতে রাজ্যে সরকার গঠন করে বিজেপি।
রাজনীতিকদের মতে, এ বারের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন অমিত শাহের কাছে কার্যত অগ্নিপরীক্ষা’ ছিল। কারণ, ২০২৯ সালের প্রধানমন্ত্রিত্বের লড়াই থেকে নরেন্দ্র মোদী যদি স্বেচ্ছায় সেরে যান, সে ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ জয় দলের শীর্ষ পদের দৌড়ে শাহকে অনেকাংশেই এগিয়ে দেবে। যদি এ যাত্রায় তিনি ব্যর্থ হতেন? আর আগামী দিনে যোগী আদিত্যনাথ যদি তৃতীয় বার উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নির্বাচিত হয়ে আসেন? এই দুই ঘটনা ঘটলে প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড়ে বেশ কয়েক কদম এগিয়ে যেতেন যোগী।
শাহ শুধু পশ্চিমবঙ্গে দলের জয়ের মূল কারিগরই নন, যোগীর রাজ্যে প্রধান বিরোধী দল, অখিলেখের সমাজবাদী পার্টিতে ভাঙন ধরানোর পিছনেও তাঁর মস্তিষ্ক কাজ করছে বলে এর মধ্যেই চর্চা শুরু হয়েছে রাজধানীতে। শিবসেনা (উদ্ধব)-এ ভাঙনের পরে যদি সমাজবাদী পার্টিও ভাঙে, তা হলে লোকসভাতেও শাসক জোট দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনের পথে অনেকটা এগিয়ে যাবে। ফলে সংবিধান সংশোধনী বিলগুলি পাশ করানো সহজ হয়ে যাবে সরকারে পক্ষে।
কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ বলেন, ‘‘গত এপ্রিলে সংবিধান সংশোধনকারী মহিলা সংরক্ষণ বিল পাশ করাতে গিয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যার অভাবে মুখ পুড়েছিল সরকারের। সেই অপমান ভোলেননি শাহ। তাঁর অহংবোধ ধাক্কা খায়।’’ রাজনীতিকদের একাংশ বলছেন, পরপর বিরোধী দলগুলি ভেঙে সরকারের চলার পথ ‘সহজ’ করার মাধ্যমে নিজেকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবেন শাহ। তাঁদের মতে, নিজেকে নরেন্দ্র মোদীর মতো এমন একটি উচ্চতায় নিজেকে নিয়ে যেতে চাইছেন শাহ, যাতে তাঁর নির্বাচন নিয়ে কোনও প্রশ্ন না ওঠে।
এক দিকে অমিত শাহ যখন দলে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছেন, এই আবহে বিজেপির সঙ্গে কাজের সুষ্ঠু সম্পর্ক বজায় রাখতে উদ্যোগী হয়েছে আরএসএস। বিজেপিতে হতে চলা সাংগঠনিক পর্যায়ে কিছু রদবদলের সুযোগে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের কথা ভাবছে সঙ্ঘ। গত সাত বছর ধরে আরএসএস ও বিজেপির মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্বে রয়েছেন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) বি এল সন্তোষ। ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনের কথা ভেবে ওই পদে নতুন মুখ বসাতে চান আরএসএস নেতৃত্ব।
গত সোমবার মন্ত্রিসভা ও দলে গঠনতান্ত্রিক সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহের বাড়িতে বিজেপি ও আরএসএস নেতৃত্বের বৈঠক হয়। পরের দিন, অর্থাৎ মঙ্গলবার ফের আলাদা করে বৈঠকে বসেন আরএসএসের সহকার্যবাহ দত্তাত্রেয় হোসবলে ও দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সুনীল বনসল। সূত্রের মতে, বিজেপির সঙ্গে সুষ্ঠু সমন্বয়ের লক্ষ্যে শাহ-ঘনিষ্ঠ বনসলকে আগামী দিনে সন্তোষের স্থানে বসানোর কথা ভাবা হয়েছে। তবে বিজেপির একটি সূত্রের দাবি, সামনেই উত্তরপ্রদেশ নির্বাচন। প্রথমে কলিঙ্গ ও তার পর বঙ্গের পরে উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যের দায়িত্ব দেওয়ার কথা ভাবা হয়েছে সুনীলকে। সেই পরিস্থিতিতে সুনীলের পরিবর্তে আরএসএস দ্বিতীয় পছন্দ প্রদীপ জোশী। আরএসএসের ওই বর্ষীয়ান নেতা জোশী বর্তমানে সহ-প্রচারপ্রমুখের দায়িত্বে রয়েছেন।