জয়ন্ত সিংহ। —ফাইল চিত্র।
রাজ্য সরকার বোধহয় বিধানসভা নির্বাচনের আগে অপরাধীদের বাইরে ছেড়ে রাখতে চাইছে— আজ সুপ্রিম কোর্ট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার সম্পর্কে এমনই তীব্র কটাক্ষ করল।
দাগি অপরাধী হওয়া সত্ত্বেও ‘আড়িয়াদহ তথা কামারহাটির ত্রাস’ বলে পরিচিত জয়ন্ত সিংহ কলকাতা হাই কোর্টে জামিন পেয়ে গিয়েছিলেন। তার পরেও রাজ্য পুলিশ কোনও পদক্ষেপ করেনি। হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে মামলা করেনি। এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলায় আজ বিচারপতি রাজেশ বিন্দল ও বিচারপতি বিজয় বিষ্ণোইয়ের বেঞ্চ প্রশ্ন তুলেছে, দাগি অপরাধী জামিন পেয়ে গেলেও, কার নির্দেশে জামিন খারিজের জন্য রাজ্য প্রশাসন উচ্চতর আদালতে যায়নি? হলফনামা দিয়ে এই তথ্য জানানোর নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
পশ্চিমবঙ্গে সংগঠিত অপরাধের তদন্ত, তার মামলার উপরে নজরদারি, দ্রুত অপরাধীদের দোষী সাব্যস্ত করা নিয়ে রাজ্য পুলিশ সবেমাত্র গত মাসে নিয়মনীতি বা এসওপি (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিয়োর) তৈরি করেছে দেখেও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা। তাঁদের প্রশ্ন, ‘‘দেশ স্বাধীন হয়েছে কবে! এত দিনে পশ্চিমবঙ্গে সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলার এসওপি তৈরি হল? এত দিন ছিল না কেন?” রাজ্য পুলিশের নতুন ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্ত এই মামলার শুনানিতে অনলাইনে হাজির হয়েছিলেন। বিচারপতিরা তাঁকে বলেন, ‘‘আপনি এই মামলাটি খতিয়ে দেখুন। বিষয়টি যথেষ্ট গুরুতর। সেই দিকে নজর দিন।’’
গত বছরের জুলাইয়ে আড়িয়াদহে ‘কামারহাটির জায়ান্ট’ জয়ন্ত সিংহ ও দলবলের বিরুদ্ধে এক স্থানীয় মহিলা ও তাঁর ছেলেকে রাস্তায় ফেলে মারধরের অভিযোগ উঠেছিল। দক্ষিণেশ্বর থানায় জয়ন্তের বিরুদ্ধে ‘অর্গানাইজড ক্রাইম’ বা সংগঠিত অপরাধের মামলা দায়ের হওয়ার পরে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। অক্টোবরে কলকাতা হাই কোর্ট জয়ন্তের জামিন মঞ্জুর করেছিল। তার বিরোধিতা করে নিগৃহীত অরিত্র ঘোষ সুপ্রিম কোর্টে মামলা করলেও রাজ্য পুলিশ হাত গুটিয়ে বসেছিল বলে অভিযোগ।
রাজ্যের পুলিশ-প্রশাসনের এই নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের তোপের মুখে গত মাসে রাজ্য পুলিশের ভারপ্রাপ্ত ডিজি পীযূষ পাণ্ডে হলফনামা দিয়ে ‘নিঃশর্ত ক্ষমা’ চেয়েছিলেন। সেই সঙ্গে জানিয়েছিলেন, এত দিন সংগঠিত অপরাধ দমনের এসওপি না থাকাতেই গাফিলতি হয়েছে। বেলঘরিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত, ব্যারাকপুর কমিশনারেটের সহকারী কমিশনার ও দক্ষিণেশ্বর থানার ওসি-কে ‘শো-কজ়’ করা হয়েছে।
আজ বিচারপতি রাজেশ বিন্দল রাজ্য সরকারকে প্রশ্ন করেন, ‘‘কে জামিনের রায়ের বিরুদ্ধে মামলা না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন?” রাজ্যের আইনজীবী শাদান ফারাসত বলেন, ‘‘থানার ওসি-র সঙ্গে অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনারকে শো-কজ় করা হয়েছে। হতে পারে, তিনিই নির্দেশ দিয়েছিলেন।’’ বিচারপতি বিন্দল বলেন, ‘‘হতে পারে বললে হবে না। নির্দিষ্ট ভাবে হলফনামা দিয়ে জানাতে হবে, কে নির্দেশ দিয়েছিলেন।’’ ফারাসত বলেন, এখন সংগঠিত অপরাধ দমনের এসওপি তৈরি হয়েছে। সেটা না থাকাতেই সমস্যা হয়েছিল। বিচারপতি বিন্দল বলেন, এত দিন এসওপি ছিল না কেন? ফারাসত বলেন, ‘‘আগেও নিয়ম ছিল।’’ বিচারপতি বলেন, ‘‘এই তো বললেন, ছিল না।’’ ফারাসত বলেন, আগে আইন অনুযায়ী মোকাবিলা হত।
রাজ্যের আইনজীবী জানান, রাজ্যে নির্বাচন ঘোষণার পরে ডিজি বদলে গিয়েছে। নতুন ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্ত অনলাইনে হাজির হয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টে তাঁকে এই মামলা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়ার পরে সিদ্ধিনাথ জানান, তিনি অবশ্যই বিষয়টি দেখবেন। নিগৃহীতের আইনজীবী শাম্ব নন্দী জানান, মে মাসে পরবর্তী শুনানিতেও সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য পুলিশের ডিজি-কে অনলাইনে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।