সুপ্রিম কোর্ট। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের বেঞ্চ রিপোর্ট দিয়েছিল, বিচারকেরা নথিযাচাই এবং নিষ্পত্তির কাজ শুরু করলেও তাঁদের সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। এর পরেই পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) নিয়ে মঙ্গলবার জরুরি শুনানিতে বসেছিল দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ। সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে ভিন্রাজ্য থেকেও বিচারক নেওয়ায় ছাড়পত্র দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের হাই কোর্টের অনুমোদনক্রমে ভিন্রাজ্যের বিচারক নিয়োগেও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের নির্দেশ বলছে—
১) ইতিমধ্যে নিযুক্ত বিচারকদের পাশাপাশি, কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি চাইলে সিভিল জজ (সিনিয়র এবং জুনিয়র ডিভিশন) নিয়োগ করতে পারবেন। যাঁদের অন্তত ৩ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাঁদেরও এই কাজে নিয়োগ করতে পারবেন।
২) অতিরিক্ত লোক প্রয়োজন হলে কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিদের কাছে কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের এই কাজে যুক্ত করতে পারবেন। ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা হাই কোর্টকে অনুরোধ দ্রুত ও সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তাঁদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়া, সাম্মানিক নির্বাচন কমিশন বহন করবে।
৩) কমিশনের নির্ধারিত এবং আদালতের আগের নির্দেশ মোতাবেক প্রাসঙ্গিক নথি গ্রহণ করতে হবে। গত ১৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ইলেকট্রনিক বা শারীরিক ভাবে জমা দেওয়া নথিই কেবল বিবেচিত হবে।
৪) সব নথি যথাযথ কি না, তা যাচাই করে বিচারকদের সন্তুষ্ট করার দায়িত্ব সম্পূর্ণ ভাবে ইআরও এবং এইআরও-র।
৫) আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের শেষ দিন। তবে যদি ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ (তথ্যগত অসঙ্গতি) বা ‘আনম্যাপড ক্যাটেগরি’ যাচাই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হয়, তবে কমিশন তালিকা ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করবে।
প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ বসার পরে প্রথমেই শোনা হয় রাজ্যের এসআইআর মামলা। সেখানে উঠে আসে হাই কোর্ট থেকে পাঠানো রিপোর্টের প্রসঙ্গও। প্রধান বিচারপতি কান্ত জানান, হাই কোর্ট থেকে বলা হয়েছে যে এই কাজের জন্য পর্যাপ্ত লোকের অভাব রয়েছে। প্রতি দিন ২৫০টি করে নিষ্পত্তি করলেও, প্রায় ৮০ দিন সময় লাগবে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট চায় সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ হোক। তাই আদালত জানিয়ে দিয়েছে, এই কাজে ভিন্রাজ্য থেকেও বিচারক (এমনকি, অবসরপ্রাপ্ত বিচারক) নেওয়া যাবে।
ওড়িশা এবং ঝাড়খণ্ড হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিদেরও সুপ্রিম কোর্ট অনুরোধ করে, কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির কোনও আবেদন এলে তা সহানুভূতির সঙ্গে ও জরুরি ভিত্তিতে বিবেচনা করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে ভিন্রাজ্য থেকে আসা বিচারকদের পশ্চিমবঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে ভাষাগত সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে রাজ্য। সরকার পক্ষের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও সেই সওয়ালই করেন। তিনি বলেন, “অন্য রাজ্য থেকে বিচারক এলে তাঁরা বাংলা বুঝতে পারবেন না।”
তবে এই সমস্যা সমাধানের কোনও উপায় আপাতত নেই বলেই জানাচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের মন্তব্য, “এই অবস্থায় আমাদের কিছু করার নেই। ইতিহাস বলছে, এক সময় ওই রাজ্যগুলি একই প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ ছিল। তাই স্থানীয় উপভাষা বা ভাষার ধরন থেকে কিছুটা বুঝতে পারবেন।” রাজ্যে এসআইআর-এর কাজে যে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের অভাব রয়েছে, তা সুপ্রিম কোর্টে উঠে আসা পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট। প্রধান বিচারপতি জানান, পশ্চিমবঙ্গে লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি (তথ্যগত অসঙ্গতি) এবং আনম্যাপড তালিকায় রয়েছে প্রায় ৮০ লক্ষ নাম। এর মধ্যে জেলা বিচারক ও অতিরিক্ত জেলা বিচারক পদমর্যাদার প্রায় ২৫০ জন বিচারবিভাগীয় আধিকারিককে প্রায় ৫০ লক্ষ দাবি যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে এই কাজে যে আরও লোকবল প্রয়োজন, তা সুপ্রিম কোর্টের এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট।
তবে কাদের এই কাজে ব্যবহার করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার কলকাতা হাই কোর্টের উপরেই ছেড়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করার কথা কমিশনের। বাকি মাত্র কয়েকটা দিন। সেই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে শনিবারের বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি। ইতিমধ্যে আগামী ৯ মার্চ পর্যন্ত রাজ্যের সমস্ত বিচারকের ছুটিও বাতিল করেছে হাই কোর্ট। কাজ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় কমিশনও। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে কমিশনের আইনজীবী জানান, অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশের কোনও সময়সীমা নেই। মনোনয়ন জমা দেওয়ার পরেও এই তালিকা প্রকাশ করা যেতে পারে। ফলে অতিরিক্ত সময় হাতে থাকছে।
তবে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে, পরে যে তালিকাগুলি প্রকাশিত হবে, সেগুলিকেও ২৮ ফেব্রুয়ারির তালিকা হিসাবেই ধরা হবে। একই সঙ্গে আদালত এ-ও জানিয়েছে, যাচাই প্রক্রিয়া হবে নির্বাচন কমিশনের জারি করা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ীই। ১৪ ফেব্রুয়ারির আগে জমা নথিই যে গ্রহণ করা হবে, তা-ও স্পষ্ট করেছে সুপ্রিম কোর্ট। সুপ্রিম কোর্টে শুনানি শেষ হওয়ার পরে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলও এই নির্দেশকে নিজেদের ‘জয়’ বলেই ব্যাখ্যা করছে। সমাজমাধ্যমে তৃণমূল লিখেছে, “বাংলার মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার যে চক্রান্ত ‘নির্যাতন কমিশন’ শুরু করেছিল, সুপ্রিম কোর্ট তা ব্যর্থ করে স্পষ্ট জানিয়ে দিল যে, মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড, সার্টিফিকেট এবং আধার কার্ডকে পরিচয়পত্র হিসেবে গ্রহণ করতেই হবে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ -এর মধ্যে জমা পড়া এই সমস্ত নথিপত্র বৈধ হিসাবে বিবেচিত হবে।’’